ইসলামী দিগন্ত

কোরবানি একটি ইবাদত

মানব ইতিহাসের প্রথম থেকেই কোরবানি করার বিধান ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা আল মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আর এই বিধানটি প্রত্যেক জাতির জন্য প্রযোজ্য ছিল। আল্লাহ সুবাহানু তায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির এই বিধান করে দিয়েছি’ (সূরা হাজ্জ : ৩৪)। যা আমাদের জন্যও পালনের নির্দেশ এসেছে। (ভবিষ্যৎ মানুষদের জন্য এ বিধান জারি রেখে) তার স্মরণে আমি অব্যাহত রেখে দিয়েছি’ ; (সূরা সাফফাত : ১০৮)। অর্থাৎ পশু কোরবানির বিধানটি ইবরাহিম আ:-এর পরবর্তী মানুষের জন্যও চালু রাখা হয়েছে। যা পালন করা আমাদের জন্য ওয়াজিব। (সূরা কাওসারের দ্বিতীয় নম্বর আয়াতে) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর স্মরণ বা ইবাদতের দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে তুমি সালাত পড়ো এবং (তাঁর নামে) কোরবানি করো’। এবং অন্য সূরার আয়াতে বলেন, ‘(হে রাসূল সা:) তুমি বলে দাও, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছু সারা জাহানের রব মহান আল্লাহর জন্য’ (সূরা আনআম : ১৬২)। নিঃসন্দেহে কোরবানি একটি ইবাদত, যার একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই রকম প্রত্যেক ইবাদত কবুলের প্রথম শর্ত হলো, ইবাদতে ইখলাস থাকা।
এই দিনের শিা হচ্ছে- বিশেষ কিছু ইবাদত করা। এ ছাড়া, আত্মত্যাগ এবং নিজের আনন্দে, খাদ্যে আত্মীয়, গরিব-দুখীদের শরিক করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কী করে আত্মত্যাগ করেছিলেন। আমাদের উদ্বুদ্ধ করে নিজেদের আনন্দ, খানাপিনা আত্মীয়-পরিজন এবং গরিব-দুখীদের সাথে ভাগ করে নিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে ওই সবের গোশত এবং রক্ত পৌঁছে না বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভিরুতা)। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এ জন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎ কর্মপরায়ণদেরকে (সূরা হাজ্জ : ৩৭)। গোসল করা, ঈদের সালাত পড়া, এর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার, সুন্দর পোশাক পরিধান করা। তাকবির পাঠ করা, কোরবানির পশু জবাই করা এবং এর গোশত আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা।
১. তাকবির পাঠ করা : আরাফার দিনের ফজর থেকে শুরু করে জিলহজ মাসের ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত তাকবির বলা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো নির্দিষ্ট দিনসমূহে’ (সূরা বাকারা : ২০৩)। তাকবির বলার নিয়মÑ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
২. গোসল করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া : ঈদের দিন সকালে গোসল করে পবিত্র হয়ে (পুরুষদের জন্য) সুগন্ধি মাখা ও সবার সুন্দর পোশাক পরা সুন্নত। মহিলাদের উচিত পবিত্রতা অর্জন, উত্তম পোশাক ও সাজগোজের সাথে সাথে তাদের পর্দার ব্যাপারেও সচেতন থাকা।
৩. ঈদগাহে সালাত পড়া : ঈদগাহে সালাত আদায় করা সুন্নত। কারণ, রাসূলুল্লাহ সা: ঈদগাহে সালাত পড়েছেন। তবে বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে মসজিদে পড়া বৈধ।
৪. জামাতের সাথে ঈদের সালাত আদায় করা এবং খুতবা শোনা : ইবনে তাইমিয়াসহ অনেক গবেষক আলেমদের মতে, ঈদের সালাত জামাতে পড়া ওয়াজিব। এই মর্মে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতএব তোমরা রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড়ো এবং কোরবানি করো’ (সূরা কাউসার: ২)। সুতরাং ওজর ছাড়া তা বাদ দেয়া যাবে না। পুরুষদের সাথে নারীরাও ঈদের সালাতে হাজির হবে। এমনকি ঋতুবতী ও কুমারী মেয়েরাও। তবে ঋতুবতী নারী শুধু খুতবা শুনবে, ঈদের সালাত থেকে বিরত থাকবে।
৫. রাস্তা পরিবর্তন করা : এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অপর রাস্তা দিয়ে ঈদগাহ থেকে প্রত্যাবর্তন মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সা: এমনটি করতেন।
৬. কোরবানি করা : এই দিনে ঈদের সালাতের পর কোরবানি করা। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈদের আগে জবাই করল, তার উচিত তদস্থলে আরেকটি কোরবানি করা। আর যে এখনো কোরবানি করেনি, তার উচিত এখন কোরবানি করা’ (বুখারি ও মুসলিম)। কোরবানি পরবর্তী আরো তিন দিন কোরবানি করার সময় থাকে। যথা : যেহেতু রাসূলূল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তাশরিকের প্রতিটি দিনই হলো কোরবানির দিন’ (সিলসিলা সহিহাহ :২৪৬৭)।
৭. গোস্ত বিতরণ ও সংরণ : কোরবানি করা এবং কোরবানির গোশত বিতরণ করা ভিন্ন দুটি আমল। দুটি আমলের সাওয়াবও আলাদা। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু জবাইয়ের মাধ্যমেই এই কোরবানির ওয়াজিব আমলটি আদায় হয়ে যায়। আর এর গোশত বণ্টনের বিষয়টি তেমন নয়, কিছুটা ঐচ্ছিক। তবে গোশত বণ্টনের শরিয়তে নির্দেশনা দেয়া আছে। তা হলো সে নিজ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে খাবে এবং পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, যারা কোরবানির সামর্থ্য রাখে না তাদেরও দান করবে।
৮. কোরবানির গোশত আহার করা : ঈদুল আজহার দিন রাসূলূল্লাহ সা: ঈদগাহ থেকে ফিরে আসার আগে খাবার গ্রহণ করতেন না। বরং তিনি কোরবানি করার পর তার গোশত খেতেন (যাদুল মায়াদ : ১/৪৪১)।
৯. ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা : পরস্পরে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত। সুতরাং আমাদের এই দিনে আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশী (বিধর্মী হলে নিয়ত থাকাÑ ইসলামের সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং দাওয়াহ) এবং বন্ধুদের সম্ভাষণ জানানো উচিত।
১০. তাওবাহ, দোয়া ও জিকির : এই দিনটি কিছুতেই হেলায় না কাটিয়ে তাওবাহ, ইস্তিগফার, তাজবিহ- তাহলিল করা এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনাÑ তিনি যেন আমাদেরকে এমন উত্তম আমল করার তাওফিক দান করেন, যাতে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। তিনি যেন আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন এবং ওই সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা এই দিনগুলো অর্থাৎ জিলহজের মাসের প্রথম ১০ দিনে শুধু তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নেক আমলে সচেষ্ট হয়।
লেখক : প্রবাসী, লস এঞ্জেলেস; ইউএসএ

আরো সংবাদ