ইসলামী দিগন্ত

ইসলামীকরণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি


উম্মাহর জীবনের গোড়ার দিকে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক চাপের ফলে শিক্ষিত মুসলমানেরা দু’টি বিষয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিল : প্রথমত, সত্যের বস্তুগত বৈশিষ্ট্য ও বিশ্বজনীন আইন। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি ও সমাজ এসব সত্য ও বিশ্বজনীন আইনকে ব্যবহার করে তাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নেয়। এভাবে শিক্ষিত মুসলমানেরা পাশ্চাত্য ও বিজ্ঞানের সব কিছুকে বস্তুগত ও নিরপেক্ষ ধারণা করে গ্রহণ করে। তবে সত্য কথা এ যে, অন্যান্য জাতি ও সভ্যতার মতো পাশ্চাত্য সভ্যতাও তার নিজের বিশ্বাস, মনস্তাত্ত্বিক উপাদান এবং ঐতিহাসিক উপাদান দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। পাশ্চাত্য যখন আবিষ্কার করল যে, তাদের আসমানি কিতাবের উৎসগুলো বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তখন আসমানি কিতাবের উৎসগুলোর ওপর অনাস্থার সৃষ্টি হলো এবং তা তাদের সভ্যতার উন্নয়ন ও বিকাশের ওপর প্রভাব বিস্তার করল। এভাবে মানবজাতির বস্তুগত প্রয়োজন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যে, ব্যক্তি ও তার প্রয়োজন এক ধরনের পবিত্রতা অর্জন করল। এ পথেই তার সব আধ্যাত্মিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। এ কারণে দেখা যায় এক দিকে পাশ্চাত্য সমাজে জনগণের বৈষয়িক কল্যাণ ও আরাম আয়েশের প্রচুর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, অন্য দিকে পাশ্চাত্য সমাজ মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা ও সামাজিক বিবাদ বিসম্বাদে জর্জরিত হয়ে পড়েছে, যা সর্বক্ষণ সমাজকে অস্থিতিশীল রাখছে এবং তাকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছে। সুতরাং মুসলমানদের জন্য উপলব্ধি করা খুবই প্রয়োজন যে, পাশ্চার্তের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব কিছুই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বস্তুগত নয়। সমাজ বিজ্ঞানের বিষয়গুলো কিভাবে উপলক্ষ সম্পর্কীয় তা উপলব্ধি করা কষ্টকর না হলে বিজ্ঞান বাস্তবিকই যে পৃথক ধরনের তা বুঝতে পারা কষ্টকর হওয়া উচিত নয়। কোনো পার্থক্য থেকে থাকলে তা হবে শুধু মাত্রার। বাস্তবিক বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা বিশৃঙ্খলভাবে হয় না। অপর পক্ষে এগুলো মানবীয় লক্ষ্য ও আধ্যাত্মিক বিবেচনাপ্রসূত। এগুলো পাশ্চাত্য ধাঁচের মনের সৃষ্টি ও নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সঙ্কল্পবদ্ধ। বিদেশী সভ্যতার সব বিজ্ঞানকে এ প্রেক্ষাপট থেকে দেখা প্রয়োজন।
বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে সত্যিকারভাবে বলতে গেলে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ ইসলামী চিন্তাধারা প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্পর্কিত অধ্যয়নে শুধু সীমিত যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হয় না বরং এর সাথে ওহির ব্যাপক ও বিশ্বনবীর জ্ঞানকে সমন্বিত করে অগ্রসর হয় যাতে জ্ঞান-বিজ্ঞান সত্যিকার রূপ নিয়ে উপস্থাপিত হয় এবং মানবজাতির পার্থিব ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজন উভয়টাই পূরণ হয়।
সাধারণভাবে জ্ঞানের এবং বিশেষভাবে বিজ্ঞানের ইসলামীকরণ বলতে এটি বোঝার কোনো প্রয়োজন নেই যে, বিজ্ঞানের বস্তুগত ও পেশাদারি বিষয়গুলো পৃথক হবে। বরং এর তাৎপর্য হচ্ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রচেষ্টায় দিকনির্দেশনা দেয়া, যাতে এগুলো সত্যিকার অর্থে মানবজাতির সর্বোত্তম স্বার্থে পরিচালিত হয়। এভাবে ইসলামীকরণের অর্থ হলো সঠিক নির্দেশনা, সঠিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং সঠিক দর্শন। এভাবেই ইসলামী জ্ঞান প্রকৃতিগতভাবে সংস্কারমূলক, গঠনমূলক, নৈতিক, সঠিকভাবে পরিচালিত এবং তাওহিদি।
ইসলামীকরণের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, তাকে মানবজাতির কাছে এমন এক চিত্র তুলে ধরতে হবে যাতে পৃথিবীর সংস্কার ও গঠনমূলক হিফাজত বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পরিপূর্ণ করার জন্য বিজ্ঞানকে মানবজাতি ও খেলাফতের সেবায় নিয়োগ করা যায়। এটি বাস্তবিকই বিস্ময়কর যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার ছায়াতলে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ অথবা দ্রুত ক্ষেপণযোগ্য ও অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন মারাত্মক মারণাস্ত্র উৎপাদন ছাড়া মানবজাতির জন্য মহত্তর বা বৃহত্তর কিছু নেই। (এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় যাদের কাছে সর্বাধিক পরিমাণ মারণাস্ত্র, ক্ষমতা ও সম্পদ আছে সত্য সবসময় তাদের সাথেই থাকবে।) নিশ্চিতভাবেই বর্তমান পরিস্থিতি মানবজাতির ফিতরাতের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। বস্তুত মানবজাতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে যেখানে তার ভবিষ্যতের জন্য খোদায়ী নির্দেশনা আগের তুলনায় আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ইসলামের সর্বাত্মক দর্শনের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এবং যেখানে গঠনমূলক ও সংস্কারধর্মী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যা হোক, এটি জীবন্ত এক উদারহণ।
অনুবাদ : ডা: উম্মে কাউসার হক

আরো সংবাদ