স্বাস্থ্য

কসমেটিক সার্জারির নানা কথা

কসমেটিক সার্জারি বা প্লাস্টিক সার্জারি প্রকৃত অর্থে কী, এ নিয়ে অনেকের নানা ভুল ধারণা আছে। প্লাস্টিক সার্জারি নামটা এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ প্লাস্টিকস থেকে। এর অর্থ, আকার ও আকৃতির পরিবর্তন আনা।
লিখেছেন অধ্যাপক ডা: সাঈদ আহমেদ সিদ্দিকী

কসমেটিক সার্জারি বা প্লাস্টিক সার্জারিতে পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি অঙ্গ বা ‘টিস্যুর’ আকৃতির পরিবর্তন করা হয়, তাই এ ধরনের সার্জারিকে রিকনসট্রাকটিভ সার্জারিও বলা হয়ে থাকে।
‘প্লাস্টিক সার্জারি’ দ্বারা বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসা করা হয়। যেমন-
১. জন্মগত ত্রুটি - কাটাঠোঁট, কাটাতালু, বাড়তি আঙুল, জোড়া আঙুল, মুখমণ্ডলের বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি, ইত্যাদি।
২. আঘাতজনিত রোগ - দুর্ঘটনা বা আঘাতের পর শরীরের যেকোনো স্থানের পুনর্গঠন।
৩. ক্যান্সার বা টিউমার অপসারণের পর সেই স্থানের পুনর্গঠন।
৪. বেডসোরের চিকিৎসা।
৫. পুড়ে যাওয়া রোগীর চিকিৎসা।
৬. হাতের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ।
৭. কসমেটিক সার্জারি সৌন্দর্য বৃদ্ধির সার্জারি।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ‘প্লাস্টিক সার্জারি’ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন হয়। কসমেটিক সার্জারিও এর অন্তর্ভুক্ত। কোনো ব্যক্তির মুখমণ্ডল অথবা ফিগার সুন্দর করার জন্য যেকোনো প্লাস্টিক সার্জারিকেই আমরা কসমেটিক সার্জারি বলি। এই নামকরণটিও এসেছে আরেকটি গ্রিক শব্দ ‘কসমেটিকস’ থেকে যার মানে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। আজকাল কসমেটিক সার্জারিকে এইসথেটিকও বলা হয়।
কসমেটিক সার্জারির ইতিহাস
হাজার হাজার বছর ধরেই মানুষ সৌন্দর্যের পূজারি। সুন্দর হওয়ার ও থাকার জন্য মানুষ কত কিছুই না করেছে ও এখনো করছে। সাত হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরে গ্রামবাসীর চোখের পাতায় রঙ ব্যবহার হতো। এ থেকেই কসমেটিক সার্জারির উৎপত্তি।

২৫০০ বছর আগে মিশরে প্রথম ডার্মাব্রেশন (উধৎসধনৎধংরড়হ) পদ্ধতি চালু হয়। এতে বিভিন্ন ধরনের পাথর ঘষে ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ানো হতো। ২০০০ বছর আগে এই উপমহাদেশেই নাকের প্লাস্টিক সার্জারি করা হতো। দুই শ’ বছরেরও আগে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে স্তনে চর্বি প্রতিস্থাপন করে এর আকৃতি সুন্দর করার চেষ্টা করা হতো। ১৯৬৩ সালে ক্লোনিন ও গেরো প্রথম সিলিকন ইমপ্লান্ট ব্যবহার করে স্তনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। লাইপোসাকশন (বাড়তি মেদ বের করা) প্রথম চালু করেন ইলুজ নামে এক ফরাসি ডাক্তার ১৯৭৭ সালে। এই তালিকার আসলে কোনো শেষ নেই।

কসমেটিক সার্জারি কী কী ধরনের হতে পারে? শরীরের বিভিন্ন স্থানের ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত কসমেটিক সার্জারিগুলোকে চার ভাগে সাজানো যেতে পারে।

১. মুখমণ্ডলের কসমেটিক সার্জারি :
হ রাইনেপ্লাস্টি
হ নাকের সৌন্দর্য
হ ফেসলিফট
হ কুঁচকে যাওয়া ত্বকের জন্য
হ থ্রেড ফেসলিফট
হ বিনা অপারেশনে কুঁচকে যাওয়া

ত্বকের জন্য সর্বাধুনিক চিকিৎসা।
হ ব্লিফারোপ্লাস্টিক
হ চোখের পাতার জন্য
(ব্যাগি আইস)
হ ডার্মাব্রেশন ও মাইক্রোডার্মা ব্রেশন
হ ব্রণ, মুখের দাগ ও সূক্ষ্ম

বলিরেখার জন্য
হ চোয়াল ও চিবুকের জন্য
হ অবাঞ্চিত তিল অপসারণ
হ ফটোথেরাপি
হ ব্রণ চিকিৎসার জন্য

২. স্তনের কসমেটিক সার্জারি :
হ অগমেন্টেশন ম্যামোপ্লাস্টি
হ ছোট স্তনকে সিলিকন ব্রেস্ট

ইমপ্লান্টের মাধ্যমে বড় করা।
হ রিডাকশন ম্যামোপ্লাস্টি
হ অস্বাভাবিক বড় স্তনকে ছোট করে দেহের সাথে মানানসই আকার দেয়া।
হ ম্যাস্টোপেক্সি
হ ঝুলে যাওয়া স্তনকে সঠিক স্থানে

‘আপলিফট’ করা।
৩. পেটের জন্য :
হ লাইপোসাকশন
হ ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পেটের বাড়তি মেদ বের করে ফিগার সুন্দর করা। এই পদ্ধতিতে ঊরু, নিতম্ব, হাত, গলা ও পুরুষ স্তনের আকৃতিও ঠিক করে নেয়া যায়।
হ অ্যাবডোমিনোপ্লাস্টি
হ ঝুলে পড়া পেটের ত্বক ও বাড়তি মেদ কেটে ফেলে পুনর্গঠনের মাধ্যমে পেটের আকার সুন্দর করে দেয়া।
৪. অন্যান্য
হ ব্রাকিওপ্লাস্টি
হ মোটা ও ঝুলে যাওয়া হাতের

পুনর্গঠনের সার্জারি ঊরুর প্লাস্টিক সার্জারি।
হ থাইলিফট
হ ঊরুর প্লাস্টিক সার্জারি।
৫. হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট
হ টাক মাথায় প্রাকৃতিক ও স্থায়ী চুল লাগানো।

লেখক : প্লাস্টিক সার্জন, কসমেটিক সার্জারি সেন্টার লি., শংকর প্লাজা (পঞ্চম তলা), ৭২, সাত মসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা।
ফোন : ০১৭১১-০৪৩৪৩৫

আরো পড়ুন :
মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ব্যায়াম
ডা: জিল্লুর কামাল

নিয়মিত ব্যায়াম করতে অনেক ধরনের শারীরিক রোগ যেমন- হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র, হাড়ের বিভিন্ন প্রকার রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়- এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আপনি জানেন কি নিয়মিত ব্যায়াম করা আপনার মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করে?

বিষণ্নতা চিকিৎসার জন্য বিষণ্নতা বিরোধী ওষুধ ও সাইকো থেরাপি ব্যবহৃত হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। সম্প্রতি বিষণ্নতা ও শারীরিক ব্যায়ামের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে ৮০টি গবেষণার ফলাফল একত্রিত করে দেখা গেছে যে, প্রচলিত ওষুধ ও শারীরিক ব্যায়ামের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে ৮০টি গবেষণার ফলাফল একত্রিত করে দেখা গেছে যে, প্রচলিত ওষুধ ও সাটকো থেরাপির পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়াম ও বিষণ্নতা চিকিৎসায় কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে :
স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ক্ষেত্রে বিষণ্নতা উপসর্গ বিলোপের ক্ষেত্রে শারীরিক ব্যায়াম একটি কার্যকর পদ্ধতি।

গবেষণার অন্তর্ভুক্ত সবার ক্ষেত্রে বিষণ্নতা বিলোপের জন্য শারীরিক ব্যায়াম কার্যকর হতে এবং ব্যায়াম শুরুর আগে যাদের শারীরিক অসুস্থতা ছিল তারা শারীরিক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে বেশি উপকৃত হয়েছে।
সব বয়সের ব্যক্তির জন্য শারীরিক ব্যায়াম উপকারী হলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপকারিতা বাড়তে দেখা গেছে। অর্থাৎ বিষণ্নতা বিলোপের ক্ষেত্রে যাদের বয়স বেশি তারা শারীরিক ব্যায়াম থেকে বেশি উপকার পান।
নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই শারীরিক ব্যায়াম সমান উপকারী।
হাঁটা বা জগিং করা বা অন্য যেকোনো ধরনের অ্যারোবিক বা অ্যানোরোবিক ব্যায়াম বিষণ্নতার উপসর্গ প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ব্যায়াম করার দিনের পরিমাণ যত বাড়তে থাকে বিষণ্নতার উপসর্গ তত কমতে থাকে।
বিষণ্নতা বিলোপে শারীরিক ব্যায়ামের কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর অন্যান্য মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে শারীরিক ব্যায়ামের উপযোগিতা নিয়ে অনেক গবেষণা করা হয়েছে। এসব গবেষণা থেকে দেখা যায়, দুশ্চিন্তগ্রস্ততা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, মাদকাসক্তি চিকিৎসা এবং অন্যান্য মানসিক রোগে আক্রান্তদের বুদ্ধি ও মনন বজায় রাখার ক্ষেত্রে শারীরিক ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
আপনি যদি বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ততায় ভুগে থাকেন এবং শারীরিক ব্যায়াম করার কথা ভেবে থাকেন তবে আপনার জন্য প্রয়োজনীয় উপদেশ হচ্ছে :

আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে ব্যায়াম শুরুর ব্যাপারে আপনার স্বাস্থ্যের সামর্থ্য নির্ণয় করুন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম শুরু করুন।
কোন নির্দিষ্ট ব্যায়াম আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী হবে তা আগেভাগে বলা যায় না। তাই হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা যোগব্যায়াম যেটাই আপনি পছন্দ করেন সেটা থেকে শুরু করুন। একের পর এক পরখ করে দেখুন।

মাঠে বা ব্যায়ামাগারে ব্যায়াম করতে গেলে অনেক লোকের সাথে আপনার পরিচয় ঘটবে। এতে আপনার সামাজিক আচরণ বিকশিত হবে। বিষণ্নতায় মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যায়াম করতে গিয়ে সেসব সামাজিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
ব্যায়ামের ফলে আপনার মনের যতটুকু উন্নতি হয় ততটুকুকে অবলম্বন করে আশাবাদী হয়ে উঠুন। বিষণœতা আপনাকে ছাড়বেই।

লেখক : মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, চেম্বার : সুখী মন, ১৭/৮ পরীবাগ, ঢাকা।
ফোন : ০১৭১১৮১৯৫৩৭

আরো সংবাদ