অর্থনীতি

ই-কমার্সে বদলে যাচ্ছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য

বাংলাদেশে ই-কমার্সের এক নম্বর জায়গাটি এরই মধ্যে চীনের আলিবাবা'র দখলে। বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনও। আর সম্প্রতি এই বাজারে ঢুকেছে পূর্ব ইউরোপের আরেকটি বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউভি।

বড় বড় বিদেশি কোম্পানিগুলো কেন হঠাৎ এতটা আগ্রহী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ নিয়ে? বাংলাদেশে ই-কমার্সের অবস্থা আসলে কী?

বাংলাদেশে ই-কমার্সের অবস্থা কি?

বাংলাদেশে ই-কমার্স বাড়ছে খুবই দ্রুত। গত তিন বছর ধরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় একশো ভাগ। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছে এই খাত।

ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের হিসেব অনুযায়ী এই খাতে মাসে এখন প্রায় সাতশো কোটি টাকা লেন-দেন হচ্ছে। অর্থাৎ বার্ষিক লেন-দেন এখন আট হাজার কোটি টাকার বেশি।

একশো ভাগ প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে সামনের বছর এটি হবে ১৬ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা।

ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট রেজোয়ানুল হক জামি বলেন, বাংলাদেশে এই মূহুর্তে সাড়ে সাতশোর মতো প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত।

ই-কমার্সে কী ধরণের পণ্য বা সেবার লেন-দেন হচ্ছে

সব ধরণেই পণ্যই এখন বাংলাদেশে অনলাইনে কেনা-বেচা হয়। এর মধ্যে পচনশীল দ্রব্য- ফলমূল শাকসব্জি যেমন আছে, তেমনি কাপড়-চোপড় ইলেকট্রনিক দ্রব্যও আছে।

তবে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ই-কমার্স এখনো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। অনলাইনে অর্ডার দেয়া গেলেও এখনো নগদ অর্থেই লেন-দেন বেশি। এটাকে বলা হয় ক্যাশ অন ডেলিভারি।

অর্ডার অনলাইনে দেয়া হলেও কল সেন্টার থেকে ফোন করে সেটি আবার নিশ্চিত করা হয়। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্য কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দিয়ে ক্যাশ টাকায় পেমেন্ট নিয়ে আসে। কাজেই পূর্ণাঙ্গ ই-কমার্স বাংলাদেশে এখনো সেভাবে চালু হয়নি।

ইক্যাবের রেজোয়ানুল হক জামি বলেন, একারণে বাংলাদেশে ই কমার্স এখনো অন্য ব্যবসার তুলনায় খুব সস্তায় সেবা দিতে পারছে না। তাদের ব্যবসার খরচ এখনো সেভাবে কমিয়ে আনা যায়নি। কিন্তু তারপরও এর যে গ্রোথ হচ্ছে, তার কারণ বড় বড় শহরে বাইরে গিয়ে কেনা-কাটার যে ঝক্কি, তার চেয়ে বাসায় বসে অনলাইনে কেনা-কাটার স্বাচ্ছন্দ্যটা পছন্দ করছেন অনেকে।

বাংলাদেশে ই-কমার্সের বড় প্রতিষ্ঠান কারা

এই মূহুর্তে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে দারাজ। চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা এটা কিনে নিয়েছে। দারাজ শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠান।

ই-কমার্সে এর পরে যারা আছে তারা সবাই বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। যেমন আজকের ডিল, বাগডুম, প্রিয় শপ, রকমারি, পিকাবু এবং অথবা।

পূর্ব ইউরোপের একটি বড় ই কমার্স কোম্পানি সম্প্রতি বাংলাদেশে ঢুকেছে। এর নাম কুভি। এরা বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।

আমাজন বাংলাদেশে আসার জন্য বেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সরাসরি হয়তো বাংলাদেশের বাজারে এখনই ঢুকছে না।

ই ক্যাবের রেজোয়ানুল হক জামি জানান, আমাজন বাংলাদেশে গার্মেন্টস সেক্টরে যারা উৎপাদক আছেন, তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ করতে চাচ্ছেন। যার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ থেকেই তাদের প্রোডাক্ট সোর্সিং করতে চায়।

বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই ওয়াল মার্টের সোর্সিং অফিস আছে। এ ছাড়াও চীনে আলিবাবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী টেনসেন্ট, তারাও আগ্রহী বাংলাদেশ নিয়ে।

তারা বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের মার্কেট যাচাই করছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান কবে আসবে, কিভাবে আসবে, এখনো জানা যাচ্ছে না।

ই-কমার্সের প্রসারে প্রধান বাধাগুলো কী?

মূলত তিনটি সমস্যার কথা বলছেন রেজোয়ানুল হক জামি।

প্রথমত, এখনো পর্যন্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারছেন না মানুষ।

দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ সম্প্রতি চেষ্টা শুরু করেছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তারা সারা বাংলাদেশে ই-কমার্স ডেলিভারির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।

আরেকটি বড় সমস্যা যেটি, তা হলো, কোন নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট সিস্টেমও নেই। বড় বড় শহরগুলোতে সীমিত পরিসরে ই-কমার্স চালু করা গেলেও দেশের ৭০ ভাগ গ্রামীণ মানুষ এর আওতার বাইরে।

গ্রামীণ মানুষকে তাহলে কিভাবে ই-কমার্সের আওতায় আনা সম্ভব

বাংলাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে যে ডিজিটাল সেন্টারগুলো আছে, তার মাধ্যমে ই-কমার্সকে সেখানে পৌঁছে দেয়ার একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

ইক্যাবের রেজোয়ানুল হক জামি বলেন, এই উদ্যোগটির নাম একশপ। ইতোমধ্যে ছয়শ ইউনিয়নে এটি চালু করা হয়েছে।

একশপ একটি অনলাইন লজিস্টিক এবং মার্কেটিং নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে বিক্রেতাদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়া হয়।

বাংলাদেশের সব বড় ই-কমার্স প্লাটফর্ম এর সঙ্গে যুক্ত। এটির মাধ্যমে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেতা-বিক্রেতারাও অনলাইনে ব্যবসায়িক লেন-দেনের জন্য যুক্ত হতে পারবেন।

 

পেমেন্ট বাধা দূর হলে এগিয়ে যাবে ই-কমার্স
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এবং সফটওয়্যার শপ লিমিটেডের (এসএসএল) যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত চালনায় ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের ভূমিকা’ শীর্ষক নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে সেমিনারে আমন্ত্রিত বক্তারা দেশের ই-কমার্স খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

বক্তারা জানান, বাংলাদেশের ই-কমার্সের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা পেমেন্ট। পেমেন্ট বাধা দূর হলে এগিয়ে যাবে দেশের ই-কমার্স। সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ই-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট শমী কায়সার। উদ্বোধনী বক্তব্যের পর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনাসভা। যেখানে বক্তারা বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের বাধা দূরীকরণে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।

বক্তারা দেশের ই-কমার্স খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন এবং ই-কমার্স খাতকে এগিয়ে নিতে ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সেমিনারটি স্পন্সর করে ডিজিটাল পেমেন্টে বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ভিসা। ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে ই-ক্যাব, এসএসএল ও ভিসা একত্রে কাজ করছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, অংশীদারদের মধ্যে নীতিনির্ধারণী বৈঠক আয়োজন এবং জনসাধারণের মধ্যে ই-কমার্স খাতের প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং দেশব্যাপী ই-কমার্স ব্যবসাকে ছড়িয়ে দেয়া। এসএসএল ওয়্যারলেস, বাংলাদেশে ফিনটেকের অন্যতম পথিকৃৎ, যা দেশের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ অনলাইন পেমেন্ট সংযোগকারী প্লাটফর্ম নিয়ে এসেছে। ‘এসএসএল কমার্স’ ব্র্যান্ড নামে পরিচিত এই প্লাটফর্মে রয়েছে বাংলাদেশের ১৫০০-এর বেশি ই-কমার্স ব্যবসায়। 

আরো সংবাদ