অপরাধ

দুই মাসেও শিশু নিনাদ হত্যা রহস্যের কূলকিনারা হয়নি

রাজধানীর বনশ্রীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী সাফওয়ান আল নিনাদ (৮) হত্যাকাণ্ডের রহস্যের কোনো কূলকিনারা হয়নি দুই মাসেও। ঘটনার পনেরো দিনের মাথায় খিলগাঁও থানা থেকে এই হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি-পূর্ব) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে এই মামলায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। 

এ দিকে খুনিরা চিহ্নিত না হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার। হত্যাকাণ্ডটি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে নিনাদের পরিবারের পক্ষ থেকে। তাদের অভিযোগ, নিনাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন ডিবিসহ তদন্ত সংস্থাগুলো। কিন্তু ঘটনার পর থেকে নিনাদের পরিবার যাদের সন্দেহভাজন হিসেবে নাম উল্লেখ করে আসছে তাদের কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদ করেনি ডিবি পুলিশ। 

বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে ঈদের আগের রাতে (১৫ জুন) নিখোঁজ হয় শিশু নিনাদ। খিলগাঁও থানায় জিডিও করা হয়। ঈদের দিন দুপুরে বাড়ির পাশে একটি খোলা জায়গায় পণ্য-বহনকারী ঢাকনাওয়ালা রিকশাভ্যান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিনাদের বাবা স্বপন বেপারী অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে খিলগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। 
নিনাদকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পলিথিন দিয়ে ফাঁস দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের গলার সম্মুখ অংশে অর্ধ চন্দ্রাকৃতির কালশিটে দাগ রয়েছে। ডান কাঁধের পেছন দিকে হালকা কালো রঙের দাগ।

নিনাদ তার মা সোনিয়া বেগম ও বাবা স্বপন বেপারীর সাথে নানীর বাড়ি ২১৫/৫ মেরাদিয়া ভূঁইয়াপাড়ায় বসবাস করত। নিনাদের নানী ছালেহা বেগমের সাথে তার ভাইদের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। মা ছালেহা বেগম ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমিতে ঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছেন ১৯৯৭ সাল থেকে। 

হত্যাকাণ্ডটি নিনাদের নানীবাড়ির খুব কাছেই। নিনাদের গায়ে ছিল লাল রঙের হাতাকাটা টি-শার্ট, পরনে হাফ প্যান্ট। মোবাইল ফোনে ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, ভ্যানের ভেতরে পলিথিন দিয়ে তার গলা বেঁধে রাখা হয়েছিল ওপরের আংটা বা রডের সাথে। এক পা ছিল মোড়ানো। অন্য পায়ে এক পাটি নাইকি স্যান্ডেল। 

ধারণা করা হচ্ছে, লাশ গুম করার পরিকল্পনা ছিল খুনিদের। লাশটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য ভ্যানের ভেতরে রাখা হয়েছিল। ঈদের দিন দুপুরে একটি শিশু খেলার সময় ভ্যানের ভাঙা অংশ দিয়ে নিনাদের হাত দেখতে পায়। এরপর খিলগাঁও থানা পুলিশ এসে নিনাদের লাশ উদ্ধার করে। ভ্যানগুলোর মালিক নাজিম উদ্দিন। তিনি ডেনিস ও কোকোলা কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর। যে ভ্যানটি ভেতর থেকে নিনাদের লাশ উদ্ধার করা হয় সেটি জব্দ করা হয়েছে। সেই ভ্যানটি কে বা কারা ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে নিনাদের পরিবার। তবে ভ্যানটির মালিক নাজিম উদ্দিন ভ্যানটি আর ফেরত চান না। কে বা কারা ভ্যানটি ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে তা তিনি অবহিত নন।

ছেলে হারানোর বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছেন নিনাদের মা-বাবা ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা। হত্যার কোনো কূলকিনারা বা খুনি চিহ্নিত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন নিনাদের বাবা মামলার বাদি স্বপন বেপারী। তিনি বলেন, সম্ভাব্য সব রকম তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জহিরুল ইসলামের স্ত্রী রানী ও তার দুই মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে বারবার অনুনয়-বিনয় করেছেন। জহিরুল ইসলামের স্ত্রী রানী ও তার দুই মেয়েকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত রহস্যজনক কারণে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। 

নিনাদের মামা এন এম শাহিন বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর ক্লু পাচ্ছিলেন না তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। আমরা শুরু থেকেই সম্ভাব্য সব রকম তথ্য দিয়ে তাদের সহযোগিতা করে আসছি। শুনেছি একজনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আরো যারা সন্দেহভাজন রয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। 
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমান জানান, মামলার তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে এখনো তেমন ক্লু পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তবে সে হত্যাকাণ্ডের বিষয় স্বীকার করেনি।

নিনাদের স্বজনদের পাশাপাশি এলাকাবাসী এখনো এই শিশুর মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন। তারা খুনিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছে ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। নিনাদ এই স্কুলের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল।

আরো সংবাদ