প্রশাসন

দীর্ঘ হচ্ছে প্রশাসনে বঞ্চিতদের তালিকা

বর্তমান সরকারের আমলে প্রশাসনে আট দফা পদোন্নতি দেয়া হলেও শুধু রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিতদের তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। কথিত তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নেগেটিভ’ উল্লেখ থাকায় পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকেই বিষণ্নতায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি জোটেনি। গত প্রায় ১০ বছরের বেশির ভাগ সময় তাদের ওএসডি থাকতে হয়েছে অথবা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক লেবেল এঁটে অনেককে বাড়িও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। মনের যাতনা নিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়রদের অধীনে কাজ করছেন অনেকেই। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের এ মর্মপীড়ার কোনো শেষ নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের সিভিল প্রশাসনে বর্তমানে কর্মরত ৫৬৯২ কর্মকর্তার মধ্যে ৪৩৮ জনই ওএসডি হয়ে আছেন। অতীতে কখনো এত অধিকসংখ্যক কর্মকর্তা ওএসডি হননি। পদোন্নতিতে বৈষম্যের কারণে বঞ্চিত অনেকেই চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। সামাজিকভাবে তারা যেমন হেয় হচ্ছেন ঠিক তেমনি তাদের কর্মস্পৃহাও নষ্ট হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর সচিব পদে ৭৬ জন, অতিরিক্ত সচিব ৬৩১, যুগ্ম সচিব ৬১৩, উপসচিব ১৭৫৫, সিনিয়র সহকারী সচিব ১৪৬৩ এবং সহকারী সচিব পদে ১১৫৪ জন কর্মরত রয়েছেন। আট দফা পদোন্নতির সময় বিভিন্ন ব্যাচ পর্যায়ক্রমে ধরা হলেও কর্মকর্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। অঘোষিতভাবে ‘ভিন্নমতের’ বলে বঞ্চিত রাখার নীতির কারণে সৎ, যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই গত ১০ বছরে কোনো পদোন্নতি পাননি। দেশে ক্যাডার সার্ভিস এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা নিয়োগের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাবলিক সার্ভিস কমিশন। গত সপ্তাহে পিএসসি ৩৯তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করেছে। ৪০তম বিসিএসের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকেই যখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন বর্তমান প্রতিযোগীদের বেশির ভাগেরই তখন জন্মও হয়নি। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছেলের বয়সীদের সামনে এমন বঞ্চনার রেকর্ড অতীতে নেই বলে একজন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা জানান।

সূত্র জানায়, এক দিকে বর্তমান সরকার যখন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ঘোষণা এবং দফায় দফায় পদোন্নতি দিচ্ছে তার পাশাপাশি বঞ্চিতদের ভিড়ও বাড়ছে। বর্তমানে সচিব পদে একজন, অতিরিক্ত সচিব ৩৭ জন, যুগ্ম সচিব ৭০, উপসচিব ১২৯, সিনিয়র সহকারী সচিব ১৭০ এবং সহকারী সচিব পদে কর্মরত ৩৬ জন কর্মকর্তা ওএসডি অবস্থায় রয়েছেন। প্রশাসনে বর্তমানে উচ্চ পর্যায়ে ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তাদের সংখ্যা প্রায় সমাপ্তির পথে। ’৮৪ থেকে ২৫তম বিসিএস কর্মকর্তারা একাধিকবার পদোন্নতিও পেয়েছেন। এমনো দেখা গেছে, ’৮৯-৯২ সালে নিয়োগকৃত দশম, একাদশ, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ বিসিএসের কর্মকর্তাও বঞ্চিত রয়েছেন। ’৮৫-৮৬ ব্যাচ কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকজন এখনো উপসচিব রয়ে গেছেন। অথচ মাঠ প্রশাসনে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সুনাম কুড়িয়েছেন। শুধু কথিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘নেগেটিভ’ আসায় তাদেরকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়নি।

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের কয়েকজন আলাপকালে জানান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সততা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমলাতন্ত্রেরই একটি শক্তিশালী চক্রের কারণে শেষ পর্যন্ত পারেননি। বিএনপি-জামায়াত তকমা দিয়ে অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকেই প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। একাদশ ও অষ্টাদশ বিসিএসের একাধিক কর্মকর্তা আলাপকালে বলেন, ‘এখন আর ভাবি না। সবই গা সওয়া হয়ে গেছে।’

এ দিকে সিভিল প্রশাসনে কর্মরতদের জন্য একটি ‘ক্যারিয়ার প্ল্যানিং পলিসি’র খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চূড়ান্ত করার জন্য তা শিক্ষাসচিবের কাছে রাখা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে এই ক্যারিয়ার প্ল্যানিং পলিসি তৈরির কাজ শুরু হয়। চাকরি জীবনের বিভিন্ন বিষয় এই পলিসি পেপারে তুলে ধরা হয়েছে। এটি একটি ক্যারিয়ার গাইড লাইন। কিন্তু এই পলিসিতে কোনো কর্মকর্তা চাকরি জীবনে ২০ বছরে পদোন্নতি না পেলে তিনি স্থায়ীভাবে সুপারসিডেড বলে বিবেচিত হবেন। এরপর ২১ বছরে তিনি অবসরের আবেদন করতে পারবেন এবং তা গৃহীত হলে পরবর্তী পদোন্নতি দিয়ে তাকে অবসরে পাঠানো হবে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এই পলিসি গাইড কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে হবে না। সমগ্র চাকরি জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকরি জীবনের সঠিক পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া পদোন্নতি দেয়া যায় না। কর্মকর্তাদের জন্য একটি ক্যারিয়ার প্ল্যানিং হলে তা পুরো চাকরিসংক্রান্ত হতে হবে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি না দেয়া কিংবা বসিয়ে রাখা উচিত নয়। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং অপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সা’দত হোসেন বলেন, সিভিল সার্ভিস আইনে যেটা থাকবে সেটাই ধর্তব্য হবে। তা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ পলিসি পেপার না দেখে মন্তব্য করা সঠিক হবে না।

আরো সংবাদ