প্রশাসন

তড়িঘড়ি করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেয়ার উদ্যোগ

অনেকটা তড়িঘড়ি করে রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে পুনর্বাসন করতে চায় সরকার। অন্ততপক্ষে ‘টোকেন’ হিসেবে কিছু রোহিঙ্গাকে চলতি বছরের মধ্যে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য দ্রুত এই দুর্গম চরে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভাসানচরের উন্নয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ভাসানচর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এখন এ অর্থের পুরোটা নৌবাহিনীর কাছে দেয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার আশ্রয়ণ প্রকল্প ৩-এর পরিচালক মো: আহসান কিবরিয়া সিদ্দিকী স্বারিত এক চিঠির মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ অর্থ চেয়েছে প্রধানমন্ত্রী অফিসের আওতায় থাকা বাংলাদেশের নৌবাহিনী। আশ্রয়ণ ৩ প্রকল্পের মাধ্যমে ভাসানচরের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে নৌবাহিনী। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাজেট বরাদ্দের অর্থের তিন কিস্তির টাকা উত্তোলনের জন্য আমাদের কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। কিন্তু শেষ কিস্তির অর্থ উত্তোলন করতে হলে অবশ্যই আমাদের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। ভাসানচরে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পুরো অর্থ কাজে লাগতে পারে। এ জন্যই মনে হয় তারা বাজেটে বরাদ্দ পুরো অর্থ একেবারে নিতে চাইছে। এ বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। 

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার থেকে পালিয়া আসা প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার মধ্যে অন্ততপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য ভাসানচরে বসবাসকারীদের অস্থায়ী আবাসন গড়ে তুলতে গত বছর একনেক বৈঠকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার ল্য ঠিক হয়েছে। এর আগে ভাসানচরের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে ৬০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। 
এই প্রকল্পের আওতায় ভাসানচর ভাঙন প্রতিরোধসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে নৌবাহিনী রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলবে। সেখানে ১২০টি গুচ্ছগ্রামে ১৪৪০ ব্যারাক হাউজ এবং ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

ভাসানচরে বসবাসকারীদের আয়ের পথ সৃষ্টি করতে ছোট দোকান, বিক্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি মহিষ, হাঁস-মুরগি পালন, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছচাষ, কুটিরশিল্পসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হবে।

এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ মন্ত্রণালয় ও মিল্ক ভিটাকে নির্দেশ দেয়া হয়। এ কাজে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি এনজিওকে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, কমিশনার এবং জেলা প্রশাসক কক্সবাজারকে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ২০০৬ সালেই বঙ্গোপসাগরে ভাসানচর দ্বীপটির উৎপত্তি। ২০১৫ সালের প্রথমে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের এই পরিকল্পনার কথা উঠলে এ নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরাও ওই দ্বীপে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় মারাত্মক প্রাণহানির আশঙ্কাও জানানো হয় তাদের প থেকে। অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও সরকারের এই ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করা হয়। গত বছরের ৬ নভেম্বর এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছিল। সারসংেেপ তিনি লিখেছেন, ‘এই উদ্যোগটি এখন বাদ দেয়া যথাযথ হবে। যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠাতে সরকার তৎপর এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, সেখানে ভাসানচরে তাদের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কোনো ইঙ্গিতই দেয়া উচিত নয়। এ কাজটি এই মওসুমে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সুতরাং এ জন্য কোনো বরাদ্দ আপাতত দেয়া যাবে না।’ 

প্রথম ধাপে পুনর্বাসনের এই পরিকল্পনা বাদ দেয়া হলেও গত বছরের আগস্টে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর আবারো এটি হাতে নেয়া হয়। প্রকল্প অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে ১২০টি গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হবে। তাতে পুনর্বাসন করা হবে এক লাখ তিন হাজার ২০০ রোহিঙ্গাকে। 

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত ও সহিংসতা শুরু হয়। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ লাখ মানুষ। জানুয়ারিতে সম্পাদিত ঢাকা-নেপিডো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের পাঠানো প্রথম ৮ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা নিয়েই শুরু হয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। জাতিসঙ্ঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বলছে রাখাইন এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক ও নিরাপদ হতে হবে। তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে নিরাপদে।

আরো সংবাদ