অবকাশ

আমার মধ্যদুপুর

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য মাইনেতে চাকরি করা বাবা এবারো আমাকে ঈদে জামা দিতে পারেননি বলে এক অস্থির ব্যথায় আমি যখন পুরনো জামা গায়ে দিয়ে ঈদের নামাজ পড়ে এসে গঞ্জের কংক্রিট পথে এলোমেলো হাঁটছি, জয় তখন অনুনয় করে বললÑ ‘তোর কাল আমাদের বাড়িতে দাওয়াত। আসিস।’ ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসি ছড়িয়ে বললাম, ‘আচ্ছা আসব।’ জয় আমার বন্ধু। আমরা একসাথে পড়ি। ওরা বেশ প্রভাবশালী। জমিজমা আর গাড়িবাড়ির অভাব নেই। ঘরে ঢাললে বাইরে পড়েÑ এমন দশা।
২.
আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন। দুপুরে জয়দের বাড়ি এসে দেখি এখানে বিশাল আয়োজন। জয়ের বাবা তার অফিসের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান বাড়িতেই করছেন। গণ্যমান্য লোকের ভিড়ে জয়ের নেমন্তন্ন দেয়া এই আমাকে বড্ড বেমানান লাগছিল। অফিসার, বসসহ অফিসের পদস্থ কর্মকর্তাদের ভিড়ে এই আমি খুবই নগণ্য। সবার গায়ে কী দামি দামি পোশাক! পারফিউমের সুঘ্রাণে সারা বাড়ি ভেসে যাচ্ছে। আমার গায়ে অতি সাধারণ একটি শার্ট। তাও বগলের তলা ছেঁড়া।
আমি এসেছি দেখে জয় খুব খুশি। হেসে বললÑ ‘এসেছিস, ভালো হয়েছে।’ আমার সাথে গল্প জমিয়ে তোলার আগেই কে যেন জয়কে ডেকে ভেতরে নিয়ে গেল। আমি দাঁড়িয়ে থাকি উঠোনের পাশে।
জয়দের প্রকাণ্ড উঠোনজুড়ে রঙিন কাপড়ের প্যান্ডেল সাজানো। প্যান্ডেলের ভেতরে চেয়ার টেবিল বিছানো পরিপাটি করে। এখানে ভোজের আয়োজন। উন্নত সব খাবারের সাথে পোলওর সুঘ্রাণ নাকে এলো। ইশ, কত দিন এসব খাই না! আজ খাবো পেট পুরে। মুরগির রোস্ট, খাসির গোশত, মাছের টুকরো, গোশতের কাবাব কোনোটাই বাদ যাবে না। খাওয়ার শেষে যদি দই দেয়, সবটুকু খেয়ে নেবো। দই বড় ভালোবাসি। এসব ভাবতে ভাবতে আমার জিভে জল। ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান এত সুন্দর হয়, জানতাম না।
পড়ন্ত দুপুর। দলে দলে অতিথিরা আসছেন। ভোজের জন্য সবাইকে প্যান্ডেলের ভেতরে ডাকা হচ্ছে। ক্ষুধায় পেট খাঁ খাঁ করছে। গিয়ে বসলাম চেয়ারে। একটু পর সামনে আসবে মুখরোচক সব খাবার। শহরের নামকরা রেস্টুরেন্ট থেকে জয়ের বাবা বাবুর্চি ভাড়া করে এনেছেন। তারা দক্ষ হাতে রান্না করেছে। এদের রান্নার হাত নাকি বিখ্যাত!
একজন বাবুর্চি এসে বললেন, ‘এই ছেলে, তুমি উঠে একটু অন্য চেয়ারে গিয়ে বসো। এখানে স্যারের (জয়ের বাবা) বন্ধুর ছেলে বসবে।’ বাবুর্চির কথায় আমি লজ্জা পেলাম। উঠে গিয়ে বসলাম অন্য চেয়ারে। নাকে তখনো লাগছে উন্নত খাবারের সুঘ্রাণ।
এবারো কপাল মন্দ। আরেকজন বাবুর্চি এসে বললেন, ‘এখন মেহমানরা খাবেন। তুমি পরের আসরে বসো।’ প্যান্ডেল থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। পেটে বড় ক্ষুধা। পরের আসরেও আমার জায়গা হলো না। জয়ের বাবার এত এত মেহমান যে ওরা চেয়ার দখল করে বসে গেছে। আমি বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দেখছি ওরা মহা উৎসবে খাবার মুখে দিচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে যেন আমার পেটের ক্ষুধা বাড়তে লাগল।
৩.
দ্বিতীয় আসরের খাওয়া শেষ হতেই জানা গেল সব খাবার ফুরিয়ে গেছে। আর কোনো আসর খেতে বসবে না। যারা মেহমান হয়ে এসেছেন এখানে, সবাই পেট পুরে খেয়েছেন কেবল আমি ছাড়া।
একজন বাবুর্চি ধমকের সুরে আমাকে বললেন, ‘তোমাকে অনেকক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি। যাও চলে যাও। তোমার শার্টের বগল ছেঁড়া কেন! এখানে কোনো ভিক্ষুককে ঢুকতে দেয়া হয়নি, তুমি কী করে ঢুকলে?’ আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি বাবুর্চির দিকে। উনি আমাকে ভিক্ষুক ভাবছেন কেন?
দূর থেকে জয়কে দেখা যাচ্ছে। ওরা বাবার বিত্তবান কলিগদের সন্তানদের সাথে আড্ডা আর ছবি তুলতে তুলতে জয় হয়তো এতক্ষণে আমার কথা ভুলেই গেছে। আচ্ছা ওকে ডাকব? না থাক। ও ছবি তুলছে। ডিস্টার্ব করব না। বেরিয়ে এলাম জয়দের বাড়ি থেকে। মধ্যদুপুরের কড়া রোদ মাথায় নিয়ে বাড়ি চলছি।
পেটে ক্ষুধার জ্বালা।
আশপাশে কোনো নলকূপ থাকলে ভালো হতো। নলকূপ চেপে একমুঠো পানি খেয়ে তৃষ্ণা মেটাতে মন চাইছে। আজ এত গরম পড়ছে। গরম পড়লে নাকি বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। অথচ আকাশে কোনো মেঘ নেই। এক পশলা বৃষ্টি এসে শীতল করে দিয়ে যেত যদি এই মধ্যদুপুর। হঠাৎ মনে হলো কে যেন আমার নাম ধরে পেছন থেকে ডাকছে। জয়ের গলার মতো। জয় নয় তো! পিছু ফিরে দেখি কেউ নেই। ভুল শুনেছি হয়তো। রোদ্দুরের এই মধ্যদুপুরে কে আসবে এমন নির্জন রাস্তায়!
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

আরো সংবাদ