১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সমুদ্রের জল থেকে তৈরি হবে জ্বালানি

সমুদ্রের জল থেকে তৈরি হবে জ্বালানি - সংগৃহীত

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্রেগ রাউ বলছেন, পেট্রল-ডিজেল সহ খনিজ তেলের বিকল্প জ্বালানি রয়েছে হাতের নাগালেই৷ শুধু একটু পরিশ্রম করলেই তা মিলবে৷ সমুদ্রের জল থেকেই তৈরি হতে পারে বিকল্প জ্বালানি৷ 

গ্রেগ বলছেন, সমুদ্রের জলের অণুগুলি ভেঙে তৈরি করতে হবে হাইড্রোজেন গ্যাস৷ এর জন্য ব্যবহার করতে হবে ইলেকট্রোলাইসিস পদ্ধতি৷ জলের তড়িদায়ন হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব৷ 

হাইড্রোঅক্সাইড আয়ন ও হাইড্রোজেন আয়নগুলিকে আলাদা করতে পারা যাবে ইলেকট্রোলাইসিসের মধ্যে দিয়ে৷ এই হাইড্রোঅক্সাইড বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করবে৷ তৈরি করবে বায়ো কার্বোনেট৷ তারপর সেখান থেকেই তৈরি করা যাবে বিশেষ জ্বালানি৷

এই বায়ো কার্বেনেট কোনোভাবেই সমুদ্রের ইকো সিস্টেমকে দূষিত করবে না৷ সমীক্ষা বলছে, সৌর বিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তি দিয়ে তৈরি বিদ্যুৎ যেভাবে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে, তেমনই এই সমুদ্রের জল থেকে তৈরি জ্বালানি নতুন দিশা দেখাবে বিশ্বকে৷  

এই জ্বালানিকে বলা হচ্ছে হাইড্রোজেন ফুয়েল৷ এর খরচও অনেক কম বলে জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা৷ এতে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা৷

এর আগে, আয়ারল্যান্ডে একটি ইউরোপীয় গবেষণা প্রকল্পে সাগরের জলের নীচে সি-উইড বা অ্যালজি থেকে জ্বালানি উৎপাদনের নমুনা দেওয়া হয়৷ গবেষকরা ঐ সামুদ্রিক শ্যাওলা থেকে যে তেল বার করেছেন, তা বায়োফুয়েল তৈরিতে কাজে লাগানো যায়৷  

বিজ্ঞানীরা জানান সি-উইডের চাষ করতে কোনো সার লাগে না, চাষের জমি লাগে না৷ কিন্তু মাটিতে যে সব ফসলের চাষ হয়, সেখানে জমি নিয়ে টানাটানি৷ এছাড়া সি-উইড খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে, ছ’মাসেই পুরো গজিয়ে যায়৷ কিছু ধরণের অ্যালজি অর্থাৎ সামুদ্রিক শ্যাওলায় শর্করা আছে, যা বায়োএথানল তৈরিতে ব্যবহার করা যায়৷ অপর কিছু অ্যালজিতে তেল আছে, যা বায়োডিজেলে পরিণত করা যায়৷

গবেষকরা এ ধরনের জ্বালানিকে ব্যবসায়িক দিক থেকে ব্যবহারযোগ্য করতে সচেষ্ট – তাঁরা প্রধানত অ্যালজির বাড় ও অ্যালজিতে তেলের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন৷ গবেষক জুলি ম্যাগওয়ার বলেন, গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, এই শ্যাওলায় মাটিতে চাষ করা ফসলের চেয়ে ৭ থেকে ৩১ গুণ বেশি তেল থাকবে৷  

ট্যাংকার নয়, জ্বালানি পাইপলাইনে পরিবহন

ট্যাংকারের পরিবর্তে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল পরিবহন করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এবং কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাসের মোট ৩০৫ দশমিক ২৩৪ কিলোমিটার ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। কারণ পরিবহন ব্যবস্থায় বিপুল জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে। এই প্রকল্পে দুই ধরনের পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনে ব্যয় কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইনে সরবরাহের প্রক্রিয়া করতে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নেই এই পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৮৬৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা। চলতি বছর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন পেলে আগামী ২০২০ সালের জুনে সমাপ্ত করা সম্ভব হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের বার্ষিক চাহিদা হলো প্রায় ৫৫ লাখ মেট্রিকটন। বর্তমানে দেশে বিদ্যমান গ্যাস সঙ্কটের কারণে পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২০২১ সালের পর দেশের পুরনো বিভিন্ন ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন কমতে থাকবে।

দেশে আর কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ঢাকা এবং তার আশপাশ এলাকায় জ্বালানি তেলের বর্তমান চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন, যা ঢাকায় অবস্থিত গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোগুলোর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। চাঁদপুরে অবস্থিত তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর তিনটি ডিপোতে জ্বালানি তেলের বর্তমান চাহিদা প্রায় ১ দশমিক ৫৫ লাখ টন। চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনা থেকে কোস্টাল ট্যাংকারযোগে বর্তমানে গোদনাইল, ফতুল্লা ও চাঁদপুরে জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। 

এ ছাড়া ঢাকায় অবস্থিত বিপণন কোম্পানিগুলোর গোদনাইল বা ফতুল্লা ডিপো থেকে শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকারযোগে উত্তরবঙ্গে অবস্থিত বাঘাবাড়ি, চিলমারী ও সাচনা বাজার ডিপোতে পাঠানো হয়। আর এই ডিপোগুলোর বর্তমান বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার টন। বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থায় ট্যাংকারযোগে এই বিপুল জ্বালানি তেল যথাসময়ে চট্টগ্রাম থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিবহনে সরকারকে বিপুল পরিবহন খরচ করতে হয়। পাশাপাশি নদীপথে ট্যাংকারযোগে জ্বালানি তেল পরিবহনে পরিবেশগত প্রভাবও রয়েছে। 

জানা গেছে, বর্তমানে নদীপথে প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। আর এই বিপুল জ্বালানি তেল বহনের জন্য কোম্পানিগুলোর পরিবহন বহরে প্রায় ২ শ’টি কোস্টাল ট্যাংকার রয়েছে। অন্য দিকে, ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে কোস্টাল ট্যাংকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। এতে করে ডিপোতে লোডিং বা আনলোডিং অবকাঠামো দ্বারা পরিচালনকার্যক্রম গ্রহণ করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

পাশাপাশি নদীগুলোর দিন দিন নাব্যতা কমে যাচ্ছে। ফলে কোস্টাল ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে চাহিদার সাথে দ্রুততর সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। 
পাইপলাইন নির্মাণ প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইল পর্যন্ত ২৩৭ দশমিক ৭১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের লাইন, গোদনাইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত ৮ দশমিক ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ১০ ইঞ্চি ব্যাসের লাইন এবং কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৫৯ দশমিক ২৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬ ইঞ্চি ব্যাসের ভু-গর্ভস্থ পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। আর এইচডিডি পদ্ধতিতে ২২টি নদী এবং কেইজড ক্রসিং পদ্ধতিতে ৪৬টি রাস্তা ও ১২টি রেলক্রসিং অতিক্রম করতে হবে পাইপলাইনকে। নির্মাণ করতে হবে পাঁচটি সেকশনাল লাইজিং ভালভ স্টেশন। 

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি উইং থেকে বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ৪৪.৫০ শতাংশ। জমি অধিগ্রহণ একটি জটিল প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ সময়ের বিষয়। প্রকল্পের মেয়াদে জমি অধিগ্রহণ শেষে পুরো কাজটি সম্পন্ন হবে কি না সেটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জমি অধিগ্রহণ ও লাইন নির্মাণ দুটি আলাদা প্রকল্প করার জন্য কমিশন থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও ডিজাইন সম্পন্ন করার পর নতুন প্রকল্পটি প্রস্তাব করা যেতে পারে।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma