২২ জুন ২০১৮

কোদাল আর বেলচা নিয়ে স্বজনদের লাশ খোঁজেন তিনি

যে জায়গাটিতে বসে আছেন গার্সিয়া, সেখানেই ছিলো তাদের বাড়ি - ছবি : সংগ্রহ

রোজ সকালে একটি কোদাল ও বেলচা নিয়ে নিয়ে ধ্বংসস্তুপের কাছে যান গার্সিয়া। যেখানটাতে তাদের বাড়ি ছিলো সেখানকার ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে একাই খোঁজেন আপনজনদের লাশ। বেশ কয়েক শ’ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাস্বেবক ও উদ্ধারকারী দল কাজ করছে ওই এলাকাটিতে। তারা খুঁজছে নিখোঁজ লোকদের। তাবে পাগলপ্রায় গার্সিয়া তাদের অপেক্ষায় থাকতে রাজি নন। নিজেই খুঁজছেন হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের। গুয়েতেমালায় গত সপ্তাহের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে পরিবারের পঞ্চাশজনকে হারিয়ে পথে পথে লাশ খুজে ফিরছেন ইউফেমিয়া
গার্সিয়া নামের এক নারী। এটি তারই সেই বিয়োগাত্মক গল্প।

ওই ঘটনায় অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে। আরো অন্তত দুইশো জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে, যারা লাভার নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগ্নেয়গিরির কাছেই বাড়ি ছিলো গার্সিয়ার। লাভা আর ছাই উড়ে এসে পড়ে তাদের বাড়ির ওপর। ওই ঘটনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের পরিবারটিই। বৃহত্তর পরিবারের পঞ্চাশ স্বজন নিহত হয়েছে সেদিন। তাদের মধ্যে ছিলো গার্সিয়ার সন্তান, নাতি-নাতনি। আরো আছে গার্সিয়ার নয় ভাইবোন ও তাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানেরার এবং তার মা। এখনো ধ্বংস্তুপে
নিহতদের লাশ খুঁজে ফিরছেন তিনি।

বর্তমানে একটি অস্থায়ী তাবুতে থাকছেন ৪৮ বছরের গার্সিয়া। তবে তার বেশির ভাগ সময়ই কাটে স্বজনদের লাশের খোঁজে। গার্সিয়া বলেন, ‘পরিবারে সদস্যদের খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি থামবো না। তাদেরকে আমি ধর্মমতে সমাহিত করতে চাই’। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশাল যৌথ পরিবার নিয়ে ওই এলাকাটিতে বাস করতেন পেশায় ফল বিক্রেতা গার্সিয়া। কিন্তু এবারের অগ্ন্যুৎপাত তার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে গার্সিয়া বলেন, আমি তখন দোকানে ডিম কিনতে গিয়েছিলাম। তখন দেখলাম কিভাবে আগ্নেয়গিরির  লাভা ও ছাই এসে পড়ছে গ্রামের ওপর।
গার্সিয়া চিৎকার করে সবাইকে বাড়ির বাইরে আসতে বলেন, কিন্তু সবাই তার কথা শোনেনি। তার ৭৫ বছর বয়সী মা অন্যদের বলেছেন, তার পক্ষে দৌড়ে বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি ইশ্বরের ওপর ভরসা করে বাড়িতেই অবস্থান করেন। বাইরে থাকার কারনেই বেঁচে গেছেন  গার্সিয়া। বাড়িতে সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সেদিন দুপুরের খাবারের পরই পার্শ্ববর্তী শহরে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিলো তাদের।

সেই ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে গার্সিয়া বলেন, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ছোটেন তিনি। পেছন তাকিয়ে দেখেন বাড়ির ছাদে আছড়ে পড়েছে লাভা। সে সময় বাড়ির ভেতরেই ছিলো তার ২১ বছর বয়সী ছেলে জাইম। এরপরের দৃশ্য ছিলো আরো ভয়াবহ। গার্সিয়ার ২৩ বছর  বয়সী মেয়ে ভিলমা লিলিয়ানা দৌড়ে বাড়ির বাইরে আসে; কিন্তু তার গায়ের ওপর আছড়ে পড়ে একগাদা লাভা আর ছাই। চেয়ে চেয়ে  মেয়ের মৃত্যু দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিলো না গার্সিয়ার। আরেক কন্যা শেইনি রোসমেরি(২৮) তার শিশুকন্যাকে নিয়ে ছিলো বাড়িতেই। বেড়াতে এসেছিলো তার এক বোন ও ভগ্নিপতি, তারাও চাপা পড়েছেন বাড়ির ভেতর।

পরিবারে আর কোন সদস্য বেঁচে নেই, তাই কিভাবে পরিবর্তী দিনগুলো কাটবে তা ভাবতে পারছেন না গার্সিয়া। তবে তার কাছে এখন  সবচেয়ে বড় বিষয় নিখোঁজ স্বজনদের অনুসন্ধান।
পরিবারের নিহত সদস্যদের একটি তালিকা রয়েছে তার হাতে। সেখানে লেখা তিন সন্তান, মা, নাতি, নয় ভাই-বোন, তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ  পরিবারের সব নিহত সদস্যদের নাম।

পূর্বেকার খবর : জ্বলন্ত লাভার স্রোতে ভয়াবহ উত্তাপ : প্রাণহানি বেড়ে ৯৯, নিখোঁজ ২০০
গুয়াতেমালার ভয়ঙ্কর ফুয়েগো আগ্নেয়গিরি থেকে বুধবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সেখান থেকে অনবরত গলিত পদার্থ ও ছাই ভস্ম নির্গত হওয়ায় নতুন করে অগ্ন্যুৎপাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে আগের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ১৯৭ জন। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। রোববারের অগ্ন্যুৎপাতে গুয়াতেমালার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম ছাই ভস্মে ঢাকা পড়েছে।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে ন্যাশনাল ফরেনসিক সায়েন্স এজেন্সি জানায়, অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় নিহত ৯৯ জনের লাশ মর্গে রাখা হয়েছে। আগ্নেয়গিরির লাভায় শরীর পুড়ে যাওয়ায় নিহতদের শনাক্ত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মৃত ৯৯ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৮ জনের লাশ সনাক্ত করা গেছে। অস্থায়ী মর্গ এবং ছাইয়ে ঢাকা রাস্তার মধ্যে নিখোঁজদের মরিয়া হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন স্বজনরা।

আগ্নেয়গিরির লাভায় ভয়াবহ উত্তাপ এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেয় ন্যাশনাল ডিজাস্টার এজেন্সি। লোকজনকেও উপদ্রুত এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

অস্কার শাভেজ নামের এক ব্যক্তি বাবাকে নিয়ে তার ভাই-ভাবী ও ভাতিজাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। রবিবার অগ্ন্যুৎপাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। অশ্রুসিক্ত অস্কার শাভেজ বলেন, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সব জায়গায় খোঁজা হয়েছে তাদের। কিন্তু কোথাও খোঁজ মেলেনি।

মধ্য আমেরিকান দেশ গুয়াতেমালায় ৩৪টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এরমধ্যে ফুয়েগো একটি। স্প্যানিশ ভাষায় ‘ফুয়েগো’ শব্দের অর্থ ‘আগুন’। রবিবার (৩ জুন) থেকে গুয়াতেমালার ফুয়েগো আগ্নেয়গিরিটি থেকে এই বছরেই দ্বিতীয়বারের মতো অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। চার দশকের মধ্যে গুয়াতেমালায় এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত।

আগ্নেয়গিরি থেকে গল গল করে বেরিয়ে আসছে জ্বলন্ত লাভা স্রোত। বেরিয়ে আসছে ছাই। লাভার স্রোত গড়িয়ে গিয়েছে অন্তত ৮ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। গুয়াতেমালার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (কনরেড) জানিয়েছে, উত্তপ্ত লাভার একেকটি স্রোত গ্রামের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে ভিতরে থাকা লোকজনকে দগ্ধ করেছে। ছাইয়ের কারণে গুয়াতেমালা সিটির লা অরোরা বিমানবন্দর বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

আগ্নেয়গিরিটি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে এসকিন্টলা শহরে একটি অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে নিখোঁজদের স্বজনদের ভিড়। প্রিয়জনকে মরিয়া হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা। মর্গে ছেলেকে খুঁজতে এসেছেন ৪৬ বছর বয়সী ফ্রান্সিসকো কিচে। ঝালাইয়ের কাজ করেন তিনি। সন্তানকে শনাক্ত করতে নিজের রক্তের নমুনা জমা দিয়েছেন ফ্রান্সিসকো। সন্তানের পরিণতি কী হয়েছে তা আগেই জানা হয়ে গেছে তার। পুত্র আর পুত্রবধূকে খুঁজতে পরিবারসহ এখানে এসেছেন তারা।

ফ্রান্সিসকো জানান, ঘটনার দিন ছেলের বাড়ির দেয়ালের ফুটো দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছিলেন, তার লাশ পড়ে আছে। তার আশঙ্কা, পুত্রবধূও আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভায় ঝলসে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে ফ্রান্সিসকো বলেন, ‘আমরা এলাকা ছেড়ে আসার সময় পেয়েছিলাম। ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু ছেলে আর তার স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছি আমি। আমার ছেলের বয়স মাত্র ২২ বছর। তার স্ত্রীও একই বয়সী। সে সন্তান-সম্ভবা ছিল।

ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত ও আবহাওয়াবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইনসিভুমেহ’র পরিচালক এডি স্যানশেজ জানান, সোমবার সন্ধ্যা থেকে অগ্ন্যুৎপাতের তীব্রতা কমতে শুরু করেছে। পরবর্তী কয়েকদিনে তা আরও কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আগ্নেয়গিরির দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী একটি নতুন অগ্ন্যুৎপাতে গরম গ্যাস এবং গলিত শিলা ওঠায় মঙ্গলবার উদ্ধারকাজ বন্ধ ছিল। অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় প্রায় ১৭ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজার জনকে অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়েছে। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আকাশের তিন হাজার ৭৬৩ মিটার উঁচুতে ছাইমেঘ, উত্তপ্ত কাদামাটি ও পাথরকণা ছড়িয়ে পড়ে। উত্তপ্ত কাদামাটির নিচ থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। পার্বত্য দক্ষিণাঞ্চলে উদ্ধার কার্যক্রম শুরুর পর মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।

গুয়াতেমালার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার কর্মকর্তা সার্গিও কাবানাস বলেন, ‘এখনও বহু লোক নিখোঁজ রয়েছেন। তবে আমরা তাদের সঠিক সংখ্যা জানি না।’

উত্তপ্ত লাভা এত দ্রুত ওই পার্বত্য পাদদেশের বাসিন্দাদের কাছে চলে আসে যে ঘটনার আকস্মিকতায় তারা স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। অনেককে তাদের বাড়ি ও এর আশপাশে মৃত পাওয়া গেছে। কাবানাস বলেন, দ্রুতগতিতে আসা উত্তপ্ত গলিত লাভা থেকে যারা পালিয়ে যেতে পারেননি তারা মারা গেছেন। দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা লাভা তাদের গ্রাস করে। উত্তরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু রয়েছে।

সান মিগুয়েল লস লোটেস গ্রামের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে কয়েকটি দগ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। গ্রামটিতে উদ্ধারকর্মী, সেনা ও পুলিশ সদস্যরা জীবিতদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছেন। উত্তপ্ত কাদা ও ছাইয়ের মধ্যে বহু মৃত কুকুর, মুরগি ও হাঁস রয়েছে। এগুলো থেকে এখনো ধোঁয়া উড়ছে।


আরো সংবাদ