১৬ অক্টোবর ২০১৯

চালকের হাতে মৃত্যুর স্টিয়ারিং

-

প্রতিদিনই জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে সড়কে নামতে হয় নগরবাসীকে। প্রয়োজনের তাগিদে বের হলেই দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটে গণপরিবহনের চাপায় কিংবা ধাক্কায়। পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা, পুলিশ কর্মকর্তা ও গাড়ি মালিকদের দাপটে রাজধানীতে চালক-হেলপাররা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছে না। বিপজ্জনক ওভারটেকিং ও যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস নিয়ে তারা মরণ ঝুঁকির পাল্লাপাল্লিতেও লিপ্ত হচ্ছে অহরহ। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যাত্রী ও পথচারীরাও প্রাণ হারাচ্ছে গাড়ির চাপায়। রাজধানী জুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বদলি চালক। লিখেছেন সুমনা শারমিন

রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান কারণ যাত্রীর জন্য গণপরিবহনের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, বিদ্যমান ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা ও যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রীয় উঠানো, সড়কে অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি (স্টিয়ারিং) ও চলাচলে অযোগ্য (ফিটনেসবিহীন) লক্কড়ঝক্কর গণপরিবহনের রাজত্ব। প্রতিবার দুর্ঘটনার পর সমালোচনা শুরু হয়, দেয়া হয় নানা আশ্বাস। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় হয় জড়িতদের ধরতে। কিন্তু ফেরে না গণপরিবহনের শৃঙ্খলা। বন্ধ হয় না বাসে বাসে রেষারেষির প্রবণতা। কারণ চালকদের বেপরোয়া মনোভাব বন্ধ হচ্ছে না। ফলে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ পথচারীও যাত্রীরা।
ঢাকায় বাস চালাচ্ছে কারা
রাজধানীতে দিন-চুক্তির চালকরা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে গাড়ি তুলে দিচ্ছে ‘বদলি’ চালকের হাতে। খোদ পরিবহন নেতারা বলছেন, ঢাকায় এখন যেসব কোম্পানির বাস চলছে, সেগুলোর ওপর মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেই। বিভিন্ন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা। তারাই ঢাকায় চুক্তিতে গাড়ি চালানোর প্রথা টিকিয়ে রেখেছে এবং ‘বদলি চালক’ ব্যবস্থাকেও সাধারণ নিয়মে পরিণত করেছে। আর এর ফলেই বাড়ছে দূর্ঘটনা।
ট্রাস্ট সার্ভিসের বেপরোয়া বাস গত ২৭ আগস্ট বাংলামোটরের ফুটপাথে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা কৃষ্ণা রায়কে চাপা দিয়েছে, সেটা চালাচ্ছিল একজন ‘বদলি’ চালক। পুলিশের কাছে ধরা পড়া চালক মোরশেদ স্বীকার করেছে মূল চালকের পরিবর্তে ‘বদলি’ হিসেবে গাড়িটি নিয়েছিলেন। ওই দিনই প্রথম বাসের স্টিয়ারিং ধরার অভিজ্ঞতা ছিল তার।
গত ৬ সেপ্টেম্বর উত্তরায় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের যে বেপরোয়া বাস সঙ্গীতশিল্পী পারভেজ রবকে ফুটপাথ ঘেঁষে চাপা দিয়ে হত্যা করে, সে বাসটিও চালাচ্ছিল ‘বদলি’ চালক। একই দিন মহাখালীতে ‘ক্যান্টনমেন্ট মিনি সার্ভিসের’ বেপরোয়া বাস বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ফুটপাথে তুলে হত্যা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ফারহা নাজকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ওই বাসটি চালাচ্ছিল ১৫-১৬ বছরের এক কিশোর।
৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে চেয়ারম্যানবাড়ি ক্রসিংয়ের কাছে ক্যান্টনমেন্ট মিনি সার্ভিসের বাস একটি সিএনজি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। এ বাসটিও চালাচ্ছিল ১৪-১৫ বছরের এক কিশোর। এর আগে গত ১৯ মার্চ রাজধানীর নদ্দায় সুপ্রভাত পরিবহনের যে বাসটি জেব্রা ক্রসিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরারকে চাপা দিয়েছিল, সে বাসটিও চালাচ্ছিল ‘বদলি’ চালক এবং বাসমালিকের নির্দেশেই ‘বদলি’ হিসেবে বাসে উঠেছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলি জানিয়েছেন, রাজধানীতে ‘বদলি চালকে’র দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার ঘটনা সত্য। এটা তারা অস্বীকার করেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাজধানীতে এখন যেসব কোম্পানির বাস চলছে, সেগুলোর ওপর বৈধ মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব কোম্পানি ফ্রি স্টাইলে লাভজনক রুট বরাদ্দ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলোই বেশি লাভের আশায় কম পয়সায় অনভিজ্ঞ, অপরিণত চালকের হাতে গাড়ি তুলে দিচ্ছে। তাদের উদাসীনতার কারণেই মূল চালকের বদলে ‘বদলি চালক’ গাড়ি চালানোর সুযোগ পাচ্ছে।

নাম ও রঙ পরিবর্তন করে চলছেই গাড়ি
বর্তমানে রাজধানীতে গণপরিবহন চলে নানা কোম্পানির নামে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার সিটি সার্ভিসে এখন রুটসংখ্যা ২৮৯। মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী ১৭৬টি রুটে নিয়মিত বাস চলছে। বাকিগুলোতে কখনো বাস চলে, কখনো চলে না। প্রতি রুটে একটি, কোনো কোনো রুটে একটির বেশি পরিবহন কোম্পানির বাস চলছে। কোম্পানি শুধু রুট বরাদ্দ নেয়। আর কোম্পানির ব্যানারে প্রকৃতপক্ষে বাস চালান ব্যক্তিমালিকরাই। কোম্পানির ব্যানার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট রুটে গাড়ি চালানোর জন্য তারা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কমিটিকে দিনে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেন। এ টাকার পরিমাণ কোম্পানি ভেদে বাসপ্রতি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা। কোম্পানি গাড়ির জ্বালানি খরচ, মেরামত, যন্ত্রাংশ ক্রয় কিংবা দুর্ঘটনার কোনো দায় নেয় না। তারা শুধু ব্যানার ব্যবহারের জন্য ফি নেয়।
গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের মরণ দৌড়ের প্রতিযোগিতার শিকার হয়ে শহীদ রজিম উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হলে পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হন শুধু বাসের ব্যক্তিমালিক। একইভাবে নদ্দায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হওয়ার পর সুপ্রভাত পরিবহনের সংশ্লিষ্ট বাসের ব্যক্তিমালিককেই ধরা হয়। মূল কোম্পানির কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। প্রকৃতপক্ষে ঢাকার বাস সার্ভিস কোম্পানিগুলো শুধু একটি ব্যানার, যাদের কাজ হচ্ছে কোম্পানির নামে রুট ব্যবসা করা। এমনকি এসব কোম্পানির অধীনে চলা বেশির ভাগ বাসেরও সংশ্লিষ্ট রুটের রুট পারমিট থাকে না। এ কারণে যে ব্যক্তিমালিকরা কোম্পানির অধীনে বাস চালান, তারা দিন চুক্তিতেই বাস চালান। মালিকরা একজন চালকের হাতে দিন চুক্তি হিসেবে বাস তুলে দেন। অর্থাৎ, দিনে একজন মালিককে বাসচালক নির্দিষ্ট অঙ্কের একটা টাকা দেবেন। বর্তমানে দুই হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকায় দিন চুক্তি হয়। এই চুক্তি নিয়ে চালকরা আবার ‘বদলি চালকে’র সাথে ‘ট্রিপ চুক্তি’ করেন। ‘বদলি’ চালকদের বৈধ লাইসেন্স থাকে না, বয়স কম ও অনভিজ্ঞ। এ কারণে তারা ট্রিপপ্রতি ‘২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০’ টাকা পায়। এই ট্রিপ চুক্তির ‘বদলি চালক’দের হাতেই এখন রাজধানীর বাস সার্ভিসের স্টিয়ারিং।
২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের পর রাজধানীতে এই ‘দিন চুক্তি’র বাস চালানো বন্ধ করার ঘোষণা এসেছিল পরিবহন নেতাদের কাছ থেকে। কিন্তু এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum