০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির রেকর্ড

-

শুধু জুলাই মাসে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেয়া তথ্যানুসারে, গত মাসে ১৪ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়। এর আগে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি ছিল ২০১৮ সালে। তখন পুরো বছরে ১০ হাজার ১৪৮ জন ভর্তি হয়েছিল। এডিস মশাবাহী এই ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ সাধারণত বছরের মে-জুন থেকে শুরু হয়। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা দেয়। কিন্তু এবার কেবল জুলাই মাসেই ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, মশা নিয়ন্ত্রণ না হলে আগামী দুই মাসে পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর রাজধানীর মাত্র ৩৫টি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য প্রকাশ করছে। কিন্তু ঢাকা শহরের বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এখন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। এ রকম প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় সাড়ে তিন শ’। রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে এনএস১ পরীক্ষার রি-এজেন্ট সঙ্কট দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। রি-এজেন্ট কিনতে কোথাও কোথাও দাম বাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে।
আগস্ট মাসের গত চার দিনে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ৯৬৭ জন। গত ১ আগস্ট সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৭০ জন, অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন ৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। চলতি বছর এক দিনে এটি সর্বোচ্চসংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ভর্তির নতুন রেকর্ড।
রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বিরাজমান আবহাওয়া যেমন কখনো প্রখর রোদ, আবার কখনো বা থেমে থেমে বৃষ্টি। এতে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার জন্ম বেশি হচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু মশা নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণে মশার ওষুধ ছিটানোসহ ডেঙ্গু সম্পর্কিত নানা সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। হাসপাতলে ডেঙ্গু সন্দেহে জ্বর নিয়ে প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু ভিড় করছে।
এদিকে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু টেস্ট বিনামূল্যে এবং বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার ফি বেঁধে দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তাই সামান্য জ্বর হলেও ডেঙ্গু সন্দেহে সবাই রক্ত পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের কাছে ছুটছেন। ক্রমাগত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলো রোগী সামাল দিতে পারছে না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ত পরীক্ষার জন্য শত শত মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। রক্ত পরীক্ষার পর ডেঙ্গু পজেটিভ হলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার স্বজনরা হাসপাতালে ভর্তির প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালান। খুব বেশি সিরিয়াস না হলে হাসপাতালগুলো আপাতত রোগী ভর্তি করছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদফতর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় গাইডলাইন তৈরি করেছে। সেই গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসকরা রোগী ভর্তি করছেন। যার ভর্তির প্রয়োজন নেই তাকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র লিখে বিদায় করছেন।

লম্বা জামা ও মোজা পরার পরামর্শ
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে নগরবাসীকে লম্বা জামা ও মোজা পরার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। গত রোববার ডিএসসিসির নগর ভবনের নিচতলায় ব্যাংক ফ্লোরে ‘কোরবানির বর্জ্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মসজিদের ইমামদের মাঝে স্প্রে বিতরণ’ অনুষ্ঠানে মেয়র এ পরামর্শ দেন। অবশ্য নগরবাসীর উদ্দেশে তিনি যখন এই পরামর্শ দিচ্ছিলেন তখন তার গায়ে ছিল পোলো শার্ট।
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির মেয়র বলেন, ‘আমাদের নাগরিক সবাই কমবেশি সচেতন। মসজিদে মুসল্লিরা যখন নামাজ পড়তে আসেন, কমবেশি অনেকেই আজকাল পায়জামার সাথে মোজা পরে আসেন। এটা হচ্ছে সচেতনতার লক্ষণ। আমরা যদি লম্বা পাঞ্জাবি পরি, পায়জামা পরি, পায়জামার সাথে একটা মোজা পরি। তাহলে আমরা নিরাপদে থাকতে পারব।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই যে সামান্য সচেতনতা, এটা আমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। বাসায় যে থাকবে, আমাদের সন্তান, তাদেরও বলব লম্বা জামা পরে থাকতে। একটু পা ঢেকে রাখতে। এভাবে ছোট ছোট সচেতনতা আমাদের এই শহরের মানুষের জীবনকে নিরাপদ করতে পারে। এটা আপনারা দয়া করে বলবেন।’

মানহীন মশার ওষুধ সরবরাহে সিন্ডিকেট
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সিটি করপোরেশনকে মশার ওষুধ সরবরাহ করে আসছিল লিমিট এগ্রো প্রডাক্ট। কিন্তু সরবরাহকৃত ওষুধ মানে উত্তীর্ণ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে কাজ দেয়া হয় পাকিস্তানভিত্তিক মশার ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নোকনকে। ওই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মশার ওষুধ সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে এবার সরাসরি আমদানির ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো: আতিকুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে মশার ওষুধ সরবরাহ করত এসিআই। ২০০০ সালের পর ওষুধ সরবরাহকারী হিসেবে দরপত্র জমা দেয় লিমিট এগ্রো প্রডাক্ট। এসিআইয়ের সরবরাহ করা ওষুধের থেকে অর্ধেক দামে দরপত্র জমা দিয়ে কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর টানা ১৮ বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই মশার ওষুধ সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সালে লিমিট এগ্রো প্রডাক্টের সরবরাহ করা ওষুধের মান পরীক্ষা করা হয়। মানে উত্তীর্ণ হতে না পারায় ওই বছরই কালো তালিকাভুক্ত করা হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। এরপর ওষুধ সরবরাহের কাজ পায় পাকিস্তানভিত্তিক নোকন। সম্প্রতি নোকনের সরবরাহ করা মশা মারার ওষুধের তিনটি নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে শতভাগ কার্যকারিতা পাওয়া গেলেও মশার যে প্রজাতির ওপর তা পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটি ডেঙ্গুর বাহক নয়।
ডিএনসিসি মেয়র মো: আতিকুল ইসলাম বলেন, দেশী-বিদেশী দুটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মশা মারার ওষুধ সরবরাহ করে আসছিল। তবে এসব ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সরবরাহকারীদের সেই সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া হয়েছে। এখন থেকে ডিএনসিসি সরাসরি ওষুধ আমদানি করতে পারবে।
মশা মারার ওষুধের কার্যকারিতার পাশাপাশি মশক নিধনকর্মীদের বিষয়েও নজরদারি চালু করা হচ্ছে বলে জানান মেয়র। তিনি বলেন, মশক নিধনকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মনিটরিং করার জন্য জিপিএস ট্র্যাকারের সাহায্য নেয়া হবে। পাশাপাশি এখন থেকে ডেঙ্গু গবেষণা কেন্দ্র চালু করার বিষয়েও তাগিদ দেন তিনি।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গু টেস্ট নয়
রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে জ্বরে আক্রান্ত সব রোগীকে ঢালাওভাবে ডেঙ্গু (এনএস-১) টেস্ট না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ঢালাওভাবে সব রোগীর এ পরীক্ষা করার ফলে ডেঙ্গু টেস্ট কিটের অপচয় হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এনএস-১ টেস্ট না করার জন্য হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কনফারেন্স কক্ষে গত রোববার স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে আয়োজিত নিয়মিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় রাজধানী ঢাকায় ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ মোকাবেলার লক্ষ্যে এ সভা হয়। সভায় এডিস মশার উৎসস্থল ধ্বংসের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়।
আলোচকেরা বলেন, ঢাকা শহরে সর্বশেষ মশক সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু বিস্তারের সহায়ক ব্রটো ইন্ডেক্সি (বিআই) ২০ এর ওপরে আছে। যেহেতু মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করে, সেহেতু যে এলাকায় বিআই কম সে এলাকায় মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে।

ঢাবিতে কিটের অভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রথম দুই দিনে ৩১৮ জন শিক্ষার্থীর রক্ত পরীক্ষা করে ২১ জনের ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা সারওয়ার জাহান গত রোববার জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে ডেঙ্গু নির্ণয় কার্যক্রম শুরু হয় গত বুধবার। ওই দিন ১৬৮ জন শিক্ষার্থীর রক্ত পরীক্ষা করে ১৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার ১৫০ শিক্ষার্থীর রক্তের নমুনা নেয়া হয়। দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষায় আট শিক্ষার্থীর ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়েছে। মাঝে শুক্র ও শনিবার ছুটির দিন থাকায় ওই কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট সঙ্কটের কারণে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ ছিল। পরীক্ষায় সহযোগিতাকারী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান তাদের কিট সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেখান থেকে তারা কিট পাননি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টসের (বিএসিবি) যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। হ


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik