১৯ আগস্ট ২০১৯

রক্তের চাহিদা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ

-

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে যান মগবাজারের বাসিন্দা ওবায়েদুর রহমান। সেখানে শয্যা খালি না থাকায় পরবর্তী সময়ে একে একে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ আরো কয়েকটি হাসপাতালে মেয়েকে ভর্তির চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথাও শয্যা খালি না থাকায় শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাপত্র নিয়েই বাসায় ফিরতে বাধ্য হন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজন নিয়ে অনেককেই এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে এখন। রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগীর ভিড় আগে থেকেই। শয্যা খালি না থাকায় ওয়ার্ডের বাইরে, বারান্দায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে সেখানে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে সে সুযোগ নেই। প্রতিদিন অনেক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তির জন্য এলেও শয্যা খালি না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এবার ডেঙ্গু জ্বরে বেশি খারাপ অবস্থায় পড়েছে শিশুরা। তিন দিন টানা জ্বরে আক্রান্ত যাত্রাবাড়ীর শিশু সাইমকে গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান তার বাবা। সেখানে ভর্তির পর থেকেই স্যালাইন দেয়া হচ্ছে সাইমকে। ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে চলে যাওয়ায় শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
ঢামেক হাসপাতালে প্রতি ঘণ্টায় ১০-১২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। মেডিসিন ওয়ার্ডে দায়িত্বরত একাধিক চিকিৎসক জানান, গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি হতে আসা রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি। একেবারে খারাপ অবস্থায় আসছে অনেক রোগী। শুধু ঢামেক হাসপাতাল নয়, গত কয়েক দিন ধরে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির এ চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
রক্তের চাহিদা বেড়েছে
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নানা ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না অনেকেই। এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বহু মানুষের মধ্যে। রক্তের চাহিদা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। প্রাথমিকভাবে রক্তের চাহিদা সামাল দেয়া যাচ্ছে। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, সমস্যা হবে দেড়-দুই সপ্তাহ পর। ঈদুল আজহার ছুটিতে অনেকেই ঢাকা ছাড়বে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ থাকবে। সেই সময় ব্লাড ডোনার সঙ্কট দেখা দিতে পারে।
উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে ব্লাড ডোনারের সঙ্কট হয় না। তাদের যোগাযোগ বেশি। কিন্তু সমস্যা হয় নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে। ঢাকায় রেড ক্রিসেন্টের মোহাম্মদপুর ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের রক্তকেন্দ্রে এবার রক্তের চাহিদা অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। গত এক মাসে এ দুই কেন্দ্র থেকে এক হাজার ১০০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয়েছে। আগে প্রতি মাসে ২০০ ব্যাগের মতো রক্ত সরবরাহ করা হতো। এখন অতিরিক্ত চাহিদার ৯০ শতাংশ রক্ত ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে ঈদের সময় ঢাকায় রক্তের ডোনার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কারণ ওই সময় তো অনেকেই ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় চলে যাবে। এবার ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে আগামী ৮ আগস্ট থেকে। ৯ ও ১০ আগস্ট শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। ছুটি শেষ হতে পারে জাতীয় শোক দিবস ও পরের শুক্র-শনিবারের পর ১৮ আগস্টে। অর্থাৎ ১০ দিন রাজধানী অনেকটা ফাঁকা থাকবে। আর যারা থাকবে তারাও থাকবে ঈদের আমেজে। সাধারণত এ ধরনের ছুটির সময় রাজধানীতে শুধু ডেঙ্গু নয়, অন্যান্য রোগের চিকিৎসা পাওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু নিয়ে এবার আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জ্বর হলেই ডেঙ্গু আক্রান্ত কি না তা নিয়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকছে কি না অনেক ক্ষেত্রে তা দেখার কেউ নেই। এ জন্য সরকারের রেফারেন্স ল্যাব স্থাপন করা দরকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, হঠাৎ করে এডিস মশা বেড়ে যাওয়ার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু হঠাৎ করেই বেশি হওয়ার কারণ, এডিস মশা বেশি বেড়ে গেছে। যদি এডিস মশা কম হতো, মানুষ মশার কামড় কম খেত, তাহলে ডেঙ্গু কম হতো। এ মশাগুলো অনেক হেলদি ও সফিস্টিকেটেড, তারা বাসাবাড়িতে বেশি থাকে। এডিস মশার প্রডাকশন অনেক বেশি। যেভাবে রোহিঙ্গা পপুলেশন আমাদের দেশে এসে বেড়েছে, সেভাবেই এ মসকিউটো পপুলেশনও বেড়েছে। এখন আমরা রোহিঙ্গা পপুলেশন কমাতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি, আমরা এটিও মোকাবেলা করতে পারব।
মশা ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত
বনানীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকালে অপরিচ্ছন্নতা ও তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকায় চারটি ভবনে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার ভয়াবহ বংশবিস্তার ঠেকাতে এবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। গত বৃহস্পতিবার এমন একটি আদালত রাজধানীর বনানী এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারটি ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে মোট আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করেছে। অপরিচ্ছন্নতাসহ একনাগাড়ে তিন দিন পানি জমে থাকায় জরিমানা গুনতে হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে।

ডা: এ বি এম আব্দুল্লাহর পরামর্শ
ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগী ও এ রোগে মৃতের সরকারি আর বেসরকারি সংখ্যায় বিস্তর ফারাক। হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগী নিয়ে হিমশিম অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ ডেঙ্গু বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতিদিনই বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এডিস মশার বিস্তার ঘটার কারণে এমনটি হচ্ছে। যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে ডেঙ্গুজ্বরের রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকবে আগামী শীতকাল পর্যন্ত। শীতকালে এডিস মশা থাকে না। সাধারণত সেসময় ডেঙ্গুজ্বর হয় না। মূল সমস্যা হচ্ছে মশার সংখ্যা বাড়ছে।
ডেঙ্গু মোকাবেলায় সিটি করপোরেশন প্রস্তুত ছিল না। আবার মশা মারার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। ওষুধ কার্যকর না হওয়ার মশা মরছে না। এ ছাড়াও সিটি করপোরেশনগুলো যেভাবে ওষুধ ছিটাচ্ছে সেভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ করপোরেশনের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। দু’টি করপোরেশন যদি একসাথে কাজ না করে তাহলে ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
এ জন্য জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। জ্বর হলে ডাক্তার দেখাতেই হবে। অন্তত ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করে নিতে হবে। জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। এমনকি ডেঙ্গু হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। গত কয়েকদিনে কয়েকজন যে মারা গেলেন তারা তাদের জ্বরকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর মনে করেছিলেন। তাই ঘরে বসে ছিলেন। হঠাৎ করে শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় আর সামাল দিতে পারেননি।
ডেঙ্গু জ্বরের সময় ভীষণ ব্যথা হয় বলে অনেকে বিভিন্ন রকমের ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে থাকেন। নিয়ম হচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। তা না হলে পরিস্থিতি বিপদজনক হতে পারে। জ্বর হলে কী ধরনের খাবার খাবেন, সে বিষয়েও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করা যাবে না।
ঘরের বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সিটি করপোরেশনের কাজ। আর ঘরের ভেতরের মশা নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজের ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিজেকেই করতে হবে। ঘরে বা ছাদে রাখা গাছের টব, এসির নিচে, ফ্রিজের নিচে তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি জমা পানি রাখা যাবে না।

 


আরো সংবাদ

bedava internet