২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অন্ধ ভিক্ষুকদের পথ দেখানো অপহৃত শিশুর কাহিনী

অন্ধ ভিক্ষুককে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্যামুয়েল, শিল্পীর তুলিতে - সংগৃহীত

স্যামুয়েল আব্দুল রহিমকে যেদিন অপহরণ করা হয়েছিল সেদিনের কোনো কিছুই তার মনে নেই। সেসময় তার বয়স ছিল সাত বছর। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় কানো শহরে তার নিজের বাড়ি থেকে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল।

স্যামুয়েলের পরিবার ছিল অনেক বড়- তার পিতার চার স্ত্রীর ঘরে ছিল ১৭টি সন্তান। কিন্তু স্যামুয়েল সেদিন তাদের আয়ার সাথে ছিল একা। তার পরিবারকে বলা হয়েছিল যে, সে বাড়ির বাইরে গেছে সাইকেল চালাতে। কিন্তু তার পরের ছয় বছর সে আর বাড়িতে ফিরেনি। তার সাথে পরিবারের আর কারো দেখাও হয়নি।

শিশুর খোঁজে

"তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে হেন কিছু নেই যা আমরা করিনি," বলেন স্যামুয়েলের বড় বোন ফিরদৌসি ওকেজি। সে সময় ফিরদৌসির বয়স ছিল ২১। তার ভাই যখন নিখোঁজ হয়ে গেলো তখন তাকে এবিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে ফোন করতেন, তখন তার ভাই স্যামুয়েল দৌড়ে ফোনের কাছে চলে যেত। তার সাথে ফোনে কথা বলতে খুব পছন্দ করতো স্যামুয়েল।

কিন্তু দেখা গেল তিনি যখন বাড়িতে ফোন করছেন তখন আর তার ভাই ফোন ধরছে না। বাড়ির অন্যান্যরা ফোন ধরতে লাগলো। তখনই ফিরদৌসির সন্দেহ হয়েছিল যে কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে সেটা জানতে ফিরদৌসি একদিন দুপুরবেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে বাড়িতে গেলেন। সেসময় বাড়িতে ছিলেন তার পিতা যিনি একজন স্থপতি এবং হোটেল মালিক।

তিনি আর ঘটনাটি তার মেয়ের কাছে গোপন রাখতে পারলেন না। সবকিছু খুলে বলতে হলো তাকে: কয়েক মাস হলো তার প্রিয় ছোট ভাইটার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

"আমার পিতার অভিযোগের পর প্রথম দিকে বাড়ির আয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তদন্তের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়," বলেন ফিরদৌসি।

স্যামুয়েলের এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর যতদিন সম্ভব তার মায়ের কাছ থেকেও গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। স্যামুয়েলের পিতার সাথে তার মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তিনি থাকেন অন্য একটি শহরে। মা-ও তার খোঁজ নিতে বাড়িতে ফোন করতেন। স্যামুয়েলের বাড়িতে না থাকার ব্যাপারে প্রত্যেকবারই তাকে ভিন্ন অজুহাত দেয়া হয়েছে।

বোন ফিরদৌসির সাথে স্যামুয়েল

 

শেষ পর্যন্ত স্যামুয়েলের এক মামাকে দায়িত্ব দেয়া হলো তার মাকে সবকিছু খুলে বলতে।

পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি স্যামুয়েলের খোঁজে তার পরিবার থেকেও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। ছোট ছোট দল গঠন করা হলো - যাদের কাজ ছিল রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে স্যামুয়েলকে খুঁজে বের করা।

তারা এলাকার বন-জঙ্গল এমনকি খানাখন্দও খুঁজে দেখল, যদি সে ওখানে পড়ে গিয়ে থাকে, কিম্বা কেউ তাকে মেরে সেখানে ফেলে দিয়ে থাকতে পারে।

স্যামুয়েলের খোঁজে তারা মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সাথেও আলোচনা করলো। তারপর একসময় তার পিতা সবাইকে অনুরোধ করলো 'তাদের ভাই মারা গেছে' এই সত্যটা মেনে নিতে। কারণ তাকে খুঁজে বের করার জন্য যা কিছু করার দরকার তার সবই তারা করেছে।

সেই চিৎকার

কিন্তু ফিরদৌসি তার ভাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা বাদ দিতে রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার থিসিস তিনি তার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে উৎসর্গ করলেন। স্নাতক ডিগ্রি গ্রহণ করার এক বছর পর কাজের সন্ধানে তিনি চলে যান দক্ষিণের লাগোস শহরে।

ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেন। নিয়মিত যেতে লাগলেন নাইজেরিয়ার ওগুন রাজ্যের গির্জা উইনারস চ্যাপেলে। এই গির্জায় প্রত্যেক ডিসেম্বর মাসে পাঁচদিনের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সারাবিশ্ব থেকে এর সদস্যরা সেখানে যোগ দিতেন।

এই অনুষ্ঠানটি পরিচিত শিলো নামে। এতে যারা যোগ দেন তারা চাইলে সেখানে তাদের পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফ্রি স্ট্যান্ড বসাতে পারেন।

ফিরদৌসির তখনও চাকরি হয়নি। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসের ওই অনুষ্ঠানে তিনিও একটি স্ট্যান্ড বসাতে চাইলেন। তাতে তার মায়ের তৈরি করা কিছু কাপড়ের বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেন তিনি।

ওরকম একটি ফ্রি স্ট্যান্ড বানাতে চেয়ারে বসে একজন কাঠমিস্ত্রির জন্যে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ঘুমে তার মাথাটা প্রায় ঢলে পড়েছিল তখন। কিছু একটার আওয়াজে জেগে উঠলেন তিনি। দেখলেন একজন ভিক্ষুক আল্লাহর নাম করে তার কাছে ভিক্ষা চাইছেন। ফিরদৌসি তখন চোখ তুলে তাকালেন।

তিনি দেখলেন ওই ভিক্ষুক একজন বালকের কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বালকটির পরনে ছিন্ন বস্ত্র। তাকে দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠলেন ফিরদৌসি - মুখ বসে যাওয়া বালকটি আর কেউ নয়, তারই হারিয়ে যাওয়া ছোট ভাই।

অপহরণ

স্যামুয়েলের এখন বয়স ৩০ বছর। তাকে তার পরিবার থেকে কিভাবে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে তার কিছুই মনে নেই। "আমার শুধু ট্রেনে করে কোথাও যাওয়ার কথা মনে পড়ে।"

তাকে একজন মহিলার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার ছিল একটা হাত। লাগোসের এক শহরতলিতে থাকতেন ওই মহিলা। ওই এলাকাতে বহু প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক বসবাস করতো। ওই মহিলা স্যামুয়েলকে ভাড়া করেছিল অন্ধ ভিক্ষুকদের পথ-নির্দেশক হিসেবে। এজন্যে তাকে দেয়া হতো দিনে ৫০০ নাইরা বা পাঁচ ডলার।

একজন অন্ধ ভিক্ষুকের একটি বালকের কাঁধ বা হাত ধরে চলাফেরা করার দৃশ্য নাইজেরিয়ার রাস্তাঘাটে খুবই স্বাভাবিক একটি দৃশ্য। বিশেষ করে সেসব রাস্তায় যেখানে প্রচুর গাড়ি চলে। তারা গাড়ির জানালায় টোকা মেরে মেরে ভিক্ষে করে। অথবা তাদেরকে মসজিদ কিম্বা গির্জার আশেপাশে ভিক্ষা করতেও দেখা যায়।

স্যামুয়েল জানান পরে আরো পাঁচজন বালক ওই মহিলার সাথে যোগ দিয়েছিল যাদেরকেও ভাড়া দেয়া হতো অন্ধ ভিক্ষুকদের কাছে।

স্যামুয়েলের মনে হতো তাকে এমন কিছু দেয়া হয়েছে বা এমন কিছু একটা করা হয়েছে যার ফলে ওই সময়ের কথা সে কিছুই মনে করতে পারছে না। সে সময় তার পরিবারের সদস্যদের কথাও তার মনে পড়েনি।

"আমি ঠিক জানি না সেসময় আমার মধ্যে আবেগ বলে কিছু ছিল কিনা। আমি শুধু জানতাম যে একজন ভিক্ষুককে সাথে নিয়ে আমাকে বাইরে বের হতে হবে। অর্থ জোগাড় করতে হবে, খাবার খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। তারপরের দিনও আমার ঠিক ওই একই কাজ ছিল," বলেন তিনি।

দাসত্বের জীবন

ভিন্ন ভিন্ন ভিক্ষুক তাকে ভাড়া করতো। কেউ ভাড়া করতো এক সপ্তাহের জন্যে আবার কেউ হয়তো এক মাসের জন্যেও। দিনের শেষে বালক স্যামুয়েল ভিক্ষুকের সাথেই রাস্তার কোনো একপাশে ঘুমিয়ে পড়তো। ওর কাজে খুশি হলে ভিক্ষুকরা তাকে হয়তো আরো কিছুদিনের জন্যে আবার ভাড়া করতো।

"আমার জীবন ছিল একজন দাসের মতো। আমি কোথাও যেতে পারতাম না। কিছু করতে পারতাম না। আমাকে থাকতো হতো তাদের আশেপাশেই।"

তাকে সবসময় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। ফলে তার কিছু বন্ধুও হয়েছিল, যারা ছিল ওই ভিক্ষুকদেরই ছেলে মেয়ে। কখনও কখনও তারা একসাথে খেলাধুলাও করতো। কখনও কখনও লোকেরা তাকে খাবার খেতে দিত। না হলে তারা রেস্তোরাঁর আশেপাশে ঘুরঘুর করতো এবং ফেলে দেয়া খাবার ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খেত।

"আমি সবসময় ক্ষুধার্ত থাকতাম। কিন্তু দিনের বেলা যখন কাজে থাকতাম তখন খাওয়ার জন্য কোনো ফুসরত ছিল না। লোকেরা যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে চলে যেত তেমনি ওই ভিক্ষুকরাও সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাকে নিয়ে ভিক্ষা করতে বের হয়ে পড়তো।"

স্যামুয়েল আব্দুল রহিম

 

দিনের পর দিন সে এই কাজটাই করেছে। লাগোসের এমন কোনো রাস্তা বাকি নেই যে রাস্তা ধরে সে হাঁটেনি। ভিক্ষুকদের ডান হাত কাঁধে নিয়ে সে চষে বেড়াত শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

কখনও কখনও তারা পাশের শহরেও চলে যেত। সীমান্ত পার হলেই আরেকটি দেশ বেনিন।

কখনও যদি ভিক্ষুকরা খবর পেতেন যে কোথাও বড় রকমের দান খয়রাতের ঘটনা আছে তখন তারা স্যামুয়েলকে বললে স্যামুয়েল তাদের নিয়ে বাসে করে অনেক দূরেও চলে যেত।

"অন্ধ মানুষ খুব স্পর্শকাতর হয়। তাদের শ্রবণশক্তি খুব প্রখর থাকে। কোনো শব্দ হলেই তারা টের পেয়ে যায়। কখনও কখনও তারা আমার কাঁধ টিপে বলতো: ওখানে তো একজন আছে। তুই কেন ওই লোকটার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছিস?"

"তারা চেষ্টা করতো যতটা সম্ভব অর্থ রোজগার করতে।"

অলৌকিক ঘটনা

২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। স্যামুয়েল সেসময় যে ভিক্ষুককে নিয়ে রাস্তায় বের হতো, তিনি উইনার চ্যাপেল গির্জার অনুষ্ঠানটির কথা শুনেছিলেন। ওখানেই তার বোনের সাথে দেখা হয়েছিল।

ফিরদৌসি তখন চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বোনকে দেখার পর একটা শব্দও করতে পারেনি স্যামুয়েল। এতদিন পর এভাবে হারিয়ে যাওয়া ভাইকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ফিরদৌসি।

"প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল তাকে আমি চিনি। কোন না কোনভাবে তিনি আমার পরিচিত," বলেন স্যামুয়েল।

কিন্তু এর মধ্যেই সেখানে লোকজন জড়ো হয়ে গেল। গির্জার কর্মকর্তারাও এসে হাজির হলেন। জ্ঞান ফিরে এলো ফিরদৌসির। সব ঘটনা শুনে গির্জার লোকেরা একে এক অলৌকিক ঘটনা বলে ঘোষণা করলেন।

তারা সবাই মিলে স্যামুয়েলকে গির্জার এক কোণায় নিয়ে গেলেন। পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেন তার শরীর। নতুন কাপড় দিলেন পরার জন্য। তারপর তাকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলো।

মঞ্চের সামনে তখন ৫০ হাজার মানুষ। ফিরদৌসির হাতে তখন একটা মাইক্রোফোন তুলে দেয়া হলো।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বর্ণনা করলেন এই কিছুক্ষণ আগে তিনি কীভাবে তার এতদিনের হারানো ভাইকে ফিরে পেয়েছেন। সেখানে উপস্থিত সবাই তখন আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠেছিল।

গির্জার প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড ওয়েডেপো তখন স্যামুয়েলকে ধরে তার জন্যে প্রার্থনা করেন।

ওই রাতে তারা গির্জার সামনে রাখা একটি গাড়ির ভেতরেই ঘুমিয়েছিলেন। কারণ ফিরদৌসি যেখানে থাকেন সেই জায়গাটা গির্জা থেকে অনেক দূরে।

ফিরদৌসির মনে আছে ওই রাতে বারবার তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। এবং প্রতিবারই তিনি তার ভাইকে স্পর্শ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে বালকটি আসলেই তার ভাই।

উদ্ধার

স্যামুয়েলের সাথে আরো যারা ছিল তাদেরকে উদ্ধার করার জন্যে সেদিন কিছু না করায় এখন অনুশোচনা হয় ফিরদৌসির। আসলে ছয় বছর পর ভাইকে পেয়ে তিনি আবেগে এতোটাই ভেসে গিয়েছিলেন যে তখন অন্যদের জন্যে কিছু করার কথা তার মনেই পড়েনি।

কিন্তু স্যামুয়েল জানান, তাকে উদ্ধার করার সামান্য আগে ওই মহিলার কাছে আরো একজন বালক হাজির হয়েছিল।

তিনি বলেন, প্রথম দিকে বাচ্চাটি শুধু কাঁদতো। কিছু খেতে দিলেও খেত না। তারপর কোনো এক সময় সে একেবারে বোবা হয়ে যায়। কোনো কথা বলতো না। স্যামুয়েলের ধারণা ওই ছেলেটিকে চুপ করিয়ে দেয়ার জন্যেও হয়তো কিছু একটা করা হয়েছিল।

"উন্নত দেশে এরকম ঘটনা ঘটলে আপনি পুলিশের কাছে যাবেন। কিন্তু এখানে পুলিশ আপনার কাছে অর্থ দাবি করবে। কিন্তু আমার তো কোনো চাকরি ছিল না," বলেন ফিরদৌসি।

কিন্তু এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। ছয় বছর নিখোঁজ থাকার পর উদ্ধার হওয়া ১৬ বছর বয়সী ভাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেও তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

সে আর তার বাবার কাছে ফিরে যায়নি। বরং তারপর থেকে সে বড় হয়েছে তার বোনের কাছেই। তার সারা শরীরে ফুসকুড়ি পড়ে গিয়েছিল। গা থেকে আসতো দুর্গন্ধও। স্যামুয়েলের ডান কাঁধটা এক বছরেরও বেশি সময়ের জন্য একপাশে ঝুলে থাকতো।

তারপর এক্স-রে করা হলো, ফিজিওথেরাপি দেয়া হলো। ডাক্তাররা বললো, বছরের পর বছর ভিক্ষুকদের হাতের চাপের কারণে তার কাঁধটা একদিকে বাঁকা হয়ে গিয়েছিল।

স্যামুয়েলকে যখন তার মা প্রথম দেখলেন তখন তিনিও তার ছেলেকে চিনতে পারেননি। তার একটি হাত উঠিয়ে একটা জন্মদাগ দেখার পরেই মা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে হ্যাঁ, সে তারই সন্তান স্যামুয়েল।

শিক্ষা

টানা ছয় বছর ধরে পড়াশোনা না করায় স্যামুয়েল কিছুই পড়তে পারতো না। ফলে বোন ফিরদৌসি তার জন্যে স্কুল খুঁজতে শুরু করলো। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন তিনি। সবাই বলতে লাগলেন প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার আর বয়স নেই স্যামুয়েলের।

ফিরদৌসি যখন আশা ছেড়ে দেবেন ঠিক তখনই তার সাথে একজন স্কুল মালিকের দেখা হলো। সেদিন গির্জার ওই অনুষ্ঠানে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। ওই মহিলা তখন স্যামুয়েলকে স্কুলে ভর্তি করাতে রাজি হলেন। তার জন্যে স্কুলের বাইরে বাড়তি কিছু পড়াশোনারও ব্যবস্থার করলেন ফিরদৌসি।

মাত্র তিন মাসের মধ্যেই স্যামুয়েল ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোরে উঠে গেল। এক বছরের মধ্যে সে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ভর্তি পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হলো। এর মাত্র তিন বছর পর সে বসে পড়লো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি ভর্তি হয়ে গেলেন জারিয়ার আহমাদু বেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে।

কিন্তু তার মেধাই তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ালো। বন্ধ হয়ে গেল তার পড়াশোনা। কারণ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের অ্যাসাইনমেন্ট লিখে দেয়ার জন্যে ধরতো স্যামুয়েলকে। পরীক্ষায় আরেক ছাত্রের জন্য উত্তর লিখে দেয়ায় তাকে যখন বহিষ্কার করা হলো তখন তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।

ক্ষোভ নেই

বর্তমানে স্যামুয়েল একটি নির্মাণ কোম্পানির সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন।

"কোনদিন আমি যদি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হতে পারি তাহলে আমি আবার পড়ালেখা শুরু করবো," বলেন তিনি। তার ইচ্ছা তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করবেন।

স্যামুয়েলের জীবনে যা ঘটেছে তার জন্যে খারাপ কিছু মনে হয় না তার। তিনি মনে করেন তার ওই দিনগুলিই তার জীবন গড়ে তুলেছে, তাকে শিখিয়েছে অন্যদের প্রতি বিনয়ী হতে। ওই ছয় বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জেনেছেন ভিক্ষুক ও গাইডরা কতোটা ক্ষুধার্ত থাকেন। আর সেকারণে তিনি তাদেরকে কখনো অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন না।

"বরং আমি তাদেরকে খাবার কিনে দেই। কারণ তখনই আমি বুঝেছিলাম অর্থের চেয়ে আমাদের জন্যে খাবার কতোটা জরুরী ছিল। কারণ ভিক্ষুকদেরকে যে অর্থ দেয়া হতো সেটা কখনোই আমার কাছে এসে পৌঁছাতো না।"

স্যামুয়েল তার জীবনের এই গল্প এখন সবাইকে জানাতে চান কারণ তিনি মনে করেন এর ফলে লোকেরা হয়তো ভিক্ষুক ও তাদের শিশু গাইডদের প্রতি আরো বেশি সহানুভূতিশীল হবেন। সূত্র : বিবিসি।


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat Paykasa buy Instagram likes Paykwik Hesaplı Krediler Hızlı Krediler paykwik bozdurma tubidy