১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

গাদ্দাফি পরিবারের ভাগ্য রহস্যাবৃত

গাদ্দাফি পরিবারের ভাগ্য রহস্যাবৃত - সংগৃহীত

লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিদ্রোহীরা। আর তার মৃত্যুর ৭ বছর পরও তার পরিবারের ভাগ্য আজও রহস্যাবৃত। সম্প্রতি তার ছেলে হ্যানিবলের ওপর লেবানন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর ফলে তিনি আগামী এক বছর লেবানন ছেড়ে যেতে পারবেন না। 

অনেকে বলছেন, হ্যানিবলকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত। আবার অনেকে বলছেন, তার বাবার অপরাধের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া ঠিক হবে না। অনেকে আবার এই বিষয়ে লিবিয়ার কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চাইছেন এবং লোকের সামনে সত্য তুলে ধরতে বলছেন।

বিদ্রোহীদের বিপ্লবের সময়ই গাদ্দাফির ৯ সন্তানের তিনজনকে হত্যা করা হয়। সেসময় তার ছেলে মুতাসিম বিল্লাহকেও হত্যা করা হয় যিনি দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। বাকী ৬ জনকে বেঁচে আছেন। তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন।

আল সাদি ত্রিপলির কারাগারে বন্দী আছেন। হ্যানিবল আছেন লেবাননে। আর সাইফ আল ইসলাম আছেন অজ্ঞাত স্থানে। গাদ্দফির স্ত্রী সাফিয়া ফারকাশ তার মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে আলজেরিয়ায় আছেন। অন্যদিকে গাদ্দাফির প্রথম স্ত্রী ফাতিহার ছেলে চলে গেছেন ওমানে। গাদ্দাফির পালিতা মেয়ে হানা ১৯৮৬ সালে ত্রিপলিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক বোমা হামলায় মাত্র ৪ বছর বয়সে নিহত হয়।

লেবাননের এক বিচারক গাদ্দাফির পঞ্চম ছেলে হ্যানিবলের ওপর লেবানন ত্যাগের  নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন এক বছরের জন্য। হুসেইন হেবেইশ নামের এক লেবাননি নাগরিক তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠন তৈরি, অপহরণ এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছেন। সোমবার লেবাননের পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টার এই খবর দিয়েছে।

গত ১২ জুলাই বিচারক রিতা ঘান্টৌস রায় দেন হ্যানিবল আগামী এক বছর দেশ ত্যাগ করতে পারবেন না। মামলার অভিযোগে হুসেইন হেবাইশ বলেন, ২০১৬ সালে লিবিয়া সফরে যান তিনি। আর সেই সময়েই তাকে অপহরণ করে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। যারা হ্যানিবলের প্রতি অনুগত। অপহরণের পর তারা হুসেইনের মুক্তির বিনিময়ে হ্যানিবলের মুক্তি দাবি করেন লেবানন সরকারের কাছে।

হ্যানিবল এখন লেবাননের বিচার বিভাগকে অপমানের দায়েও দেড় বছরের জেল খাটছেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে লেবানন কর্তৃপক্ষ তাকে শিয়া ইমাম মুসা আল সদরের গুম হওয়ার মামলায় আটকে রেখেছেন। ইমাম মুসা আল সদর ১৯৭৮ সালে দুই সঙ্গী সহ লিবিয়া সফরে গিয়েছিলেন গাদ্দাফির আমন্ত্রণে।

লিবিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আল-আবানি বলেন, বাবার অপরাধের জন্য হ্যানিবলকে দোষারোপ করাটা ‘অন্যায় এবং বিতর্কমূলক হবে’। তিনি বলেন, কী করে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপরাধের জন্য একজন ব্যক্তিতে শাস্তি দেওয়া যায়? আর তাছাড়া হ্যানিবল তখন বয়সে একজন শিশু ছিল।

আল সাদি আছেন লিবিয়ার কারাগারে। লিবিয়ার জনগণও গাদ্দাফির পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যত নিয়ে এবং দেশে অবস্থান করা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। অনেক গোত্র এবং রাজনৈতিক দল আছে যারা চায় গাদ্দাফির সন্তানরা লিবিয়ায় ফিরে আসুক এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে অন্তুর্ভুক্ত হউক।

লিবিয়ার অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যারা চায় না গাদ্দাফির পারিবার লিবিয়ায় ফিরুক। গাদ্দাফির পরিবারের ভবিষ্যত নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কেননা সাইফ আল ইসলাম নিখোঁজ আছেন। আর তার বোন আয়েশা লিবিয়ার বাইরে চলে গেছেন। আর অপর ভাই আল সাদি আছেন কারাগারে।

গাদ্দাফির ৭ম ছেলে খামিস যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। কিন্তু লিবিয়ায় বিপ্লব শুরু হওয়ার পর ফিরে এসেছিলেন। এবং ২০১১ সালের আগস্টে নিহত হন। গাদ্দাফির ৬ষ্ঠ ছেলে সাইফ আল-আরবও ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল মিউনিখ থেকে ফিরে আসার পর নিহত হন।

২০১৭ সালের ১১ জুন লিবিয়ার জিনতান শহরের নিয়ন্ত্রণকারী গেষ্ঠী আবু বকর আল-সিদ্দিক ব্রিগেডের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে সাইফ আল ইসলামকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাকে লিবিয়ার অন্তবর্তীকালীন সরকারের অনুরোধে মুক্তি দেওয়া হয় বলে জানায় ওই ব্রিগেড।

তবে নিজেদেরকে সাইফ আল ইসলামের ঘনিষ্ঠ  দাবিকারী এমন অনেকে আছেন যারা তার পক্ষ থেকে লিবিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করছেন। এবং নানা সময়ে তার পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতি প্রচার করেন। তারা বলছেন, সাইফ আল ইসলাম আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী।

২০১৫ সালে লিবিয়ার বিচার বিভাগ সাইফ আল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের বিপ্লব সহিংস কায়দায় দমনের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও সাইফ আল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে। তার বাবা গাদ্দাফির শাসনকালে সে ওইসব অপরাধ করেছে বলে অভিযোগ।

লিবিয়ার রাজনীতিবিদ সুলেমান আল-বায়ুদি লেবাননে হ্যানিবলের গ্রেপ্তার ও তার অবস্থার ব্যাপারে লিবিয়ার সরকারের কোনো ভুমিকা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি লিবিয়ান কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানতে চেয়েছেন। এবং একজন লিবিয়ান নাগরিক হিসেবে তার পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন আয়েশার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে তার ওপর ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল। গত বছরের মার্চে আয়েশার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ আদালত। আর তার মা সাফিয়ার ওপর জারি করা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়।

লিবিয়া আক্রমণ ও গাদ্দাফির পতন
মঈনুল আলম

ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সের ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির অতি সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলো কতগুলো মিথ্যা অজুহাতে লিবিয়া আক্রমণ করে গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে, দেশটিকে ধ্বংস করেছে এবং জঙ্গিবাদকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে লিবিয়া দেশটিকে ধ্বংস করার পেছনে পাশ্চাত্যের মূল মতলব কী ছিল?

ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিটির প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, মূল মতলব ছিল ফ্রান্সের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি! ২০১১ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের উপদেষ্টা এবং গোয়েন্দা বিষয়াদির বিশ্লেষক সিডনি ব্লুমেনথল ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সাথে তার বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে জানান : লিবিয়ার তেল উৎপাদনের বেশির ভাগ ফ্রান্সের অধিকারে নেয়া, উত্তর আফ্রিকায় ফরাসি প্রভাব বৃদ্ধি করা, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী সারকোজির আধিপত্য বৃদ্ধি, ফরাসি সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ও আধিপত্য বাড়ছে বিশ্বের চোখে এমন একটি চেহারা তুলে ধরা এবং আফ্রিকার ফরাসি ভাষী দেশগুলোতে ফ্রান্সের প্রভাব কমানোর জন্য গাদ্দাফির পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করাÑ এসব ছিল লিবিয়া অভিযানের মূল মতলব। 

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার গারিকাই চেঙ্গু প্রণীত এবং ‘গ্লোবাল রিসার্চ’ পরিবেশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর চোখে সম্ভবত গাদ্দাফির সবচেয়ে ‘গুরুতর অপরাধ’ ছিল তিনি তার দেশের সম্পদকে বিদেশী পুঁজির উপরে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন এবং প্রকৃতভাবেই আফ্রিকান যুক্তরাষ্ট্র (ইউনাইটেড স্টেট্স অব আফ্রিকা) গড়ে তুলতে চাচ্ছিলেন। তার পরিকল্পিত আফ্রিকান আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড) এবং আফ্রিকান সেন্ট্রাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য গাদ্দাফি লিবিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের যে ৩০ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে রেখেছিলেন, ২০১১ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট ওবামা তা বাজেয়াপ্ত করেন।

১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিটির এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১১ সালে লিবিয়াতে সামরিক হস্তক্ষেপ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা ছিল ভ্রমাত্মক। সেই ভুল সিদ্ধান্তই উত্তর আফ্রিকাতে ‘ইসলামি জঙ্গিবাদের’ উত্থানে সহায়তা করেছে। 

রিপোর্টে লিবিয়াতে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার নামের অভিযানে লিবিয়ার শাসককে (গাদ্দাফি) পরিবর্তনের কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা এবং লিবিয়ার শাসনকর্তা একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটানোর পর সে দেশের ভবিষ্যৎ শাসন কিভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে দীর্ঘকাল ধরে যথোপযুক্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এবং তার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কঠোর সমালোচনা করা হয়। 

২০১১ সালে গাদ্দাফিবিরোধীদের নিয়ন্ত্রিত ঘন জনবসতিপূর্ণ শহর বেনগাজির ওপর গাদ্দাফির সেনারা অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছে এবং সেই হুমকি নিরসনের জন্য ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক যৌথ সামরিক অভিযান ২০১১ সালের মার্চে দফায় দফায় গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিমান আক্রমণ শুরু করে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিটির চেয়ারম্যান (কনজার্ভেটিভ দলীয় সংসদ সদস্য) ক্রিসপিন ব্লান্ট বলেন, ‘লিবিয়াতে যুক্তরাজ্যের অভিযান একটি ভ্রমপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত যার বিরূপ পরিণাম এখন পর্যন্ত সবাইকে ভোগাচ্ছে।’ তিনি বলেন, কমিটির সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণে দেখা যায় বেসামরিক নাগরিকের ওপর (গাদ্দাফির) আক্রমণের যে হুমকিকে অজুহাত করে পাশ্চাত্যের সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সে হুমকির তথ্য ছিল অতিরঞ্জিত।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সামরিক হস্তক্ষেপের অভিযানের ফলে উত্তর আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়া সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে গেছে এবং তার কিছু অংশে ‘ইসলামিক স্টেট’ জঙ্গিদের একটি নতুন শক্তিশালী দুর্গ গড়ে উঠেছে, যদিও সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের আধিপত্যের এলাকা কমে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল রিসার্চ কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাশ্চাত্যের সামরিক অভিযানে লিবিয়াতে বেপরোয়া বোমাবর্ষণ এবং ধ্বংস তাণ্ডবে একপর্যায়ে গাদ্দাফি ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের সামরিক জোট সামরিক অভিযানের মাধ্যমে গাদ্দাফিকে অপসারণের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। 

ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গাদ্দাফিকে যখন হত্যা করা হয় তখন তিনি সম্ভবত দেশত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন।  ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি এবং মার্চেই গাদ্দাফি সম্ভবত লিবিয়া ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পথ খুঁজছিলেন।
২০১১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সংসদ সদস্য লর্ড হেগ সাংবাদিকদের বলেন, তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে যে মুয়াম্মার গাদ্দাফি লিবিয়া ত্যাগ করে ভেনিজুয়েলায় (দক্ষিণ আমেরিকা) রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়ার প্রস্তুতিতে রয়েছেন।

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবাসী


আরো সংবাদ