১৬ অক্টোবর ২০১৯

অভিযুক্ত কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতি-পদায়ন

অভিযুক্ত কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতি-পদায়ন - ছবি : সংগৃহীত

প্রতিনিয়তই আসছে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ। মাঠপ্রশাসন থেকে আসা এসব অভিযোগ মন্ত্রিপরিষদ শাখা হয়ে যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এরপর অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশ সেখানেই চাপা পড়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ কিছু কিছু দফতরের চাপে হাতেগোনা কিছু অভিযোগ তদন্তের নির্দেশনা দিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা। একের পর এক অপরাধে জড়াচ্ছেন তারা। গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণসহ এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও খুব কম ক্ষেত্রেই শাস্তি পাচ্ছেন তারা।

মাঠপ্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ডিসি, ইউএনও ও এসিল্যান্ডের নামে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিনিয়তই নানান অভিযোগ আসছে। কিছু কিছু অপরাধের ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হলে ওএসডি করার মাধ্যমে আইওয়াশ করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ তদন্তও করছেন নিজ ক্যাডারেরই সিনিয়র কর্মকর্তারা। ফলে নানান কৌশলে অভিযুক্ত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে বছরের পর বছর। বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত অব্যাহত থাকলেও তদবিরের মাধ্যমে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করার ঘটনাও ঘটছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ১০ বছরে প্রশাসনের দুই হাজার ৭৪৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগ তদন্ত করে মাত্র ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এর আগেসহ এ নিয়ে ৪৪০টি বিভাগীয় মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে ৬৭ জন কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড, ১২৬ জন কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড, ২০৩ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৪টি বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে নাটোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলামুর রহমানের বিরুদ্ধে তার দফতরেরই একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ওই নারী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযোগ, ডিসি তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কুপ্রস্তাব ও রাতে সার্কিট হাউজে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। কুপ্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় তাকে দাফতরিকভাবে হয়রানি করা হয়। এর প্রতিকার চেয়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ ওই ম্যাজিস্ট্রেট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। যৌন হয়রানির অভিযোগের পর গোলামুরকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হয়। আর নারী কর্মকর্তাকে খুলনা বিভাগে বদলি করা হয়। অভিযোগের সব ধরনের প্রমাণ থাকার পরেও ওএসডি হওয়া এই কর্মকর্তাকে কিছু দিনের মধ্যেই জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন করা হয়। বর্তমানে তিনি জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।
তার এই পদায়নকে অনৈতিক কাজের পুরস্কার মনে করছেন খোদ তার সহকর্মীরা। তারা বলছেন, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সহকর্মীর এমন অভিযোগের পরেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং দেয়া হলে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাবে। একই চিত্র দেখা যায় অভিযুক্ত অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও।

২০১৪ সালে রূপগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আবু জাফর রাশেদ। দুই মেয়েসহ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সেখানে কর্মরত থাকাকালে অপর এক বিবাহিত নারীর সাথে তিনি অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্ত্রী এর প্রতিবাদ করলে তার ওপর অমানসিক শারীরিক নির্যাতন করতে থাকেন তিনি। ওই বছরের ১৩ মার্চ দুই মেয়েসহ স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তিনি। এটি সহ্য করতে না পেরে ৩০ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী। ওই বছরের ১৪ অক্টোবর একই অভিযোগ করেন অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ওই নারীর স্বামীও। এ সময় ৮ এপ্রিল আবু জাফর রাশেদকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ১৫ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অভিযুক্তের স্ত্রী এবং অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো নারীর স্বামীর পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করার পরেও অভিযুক্ত আবু জাফর রাশেদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর গত বছরের ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) পদে পদোন্নতি পান তিনি।
গত ২৫ জুলাই রাতে একজন ভিআইপির গাড়ির জন্য প্রায় ৩ ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকায় আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সে কিশোর তিতাসের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। মাদারীপুরের জেলা প্রশাসকের বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে ওই ভিআইপির (সরকারের এটুআই প্রকল্পের স্পেশালিস্ট যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডল) জন্য ফেরিটি আটকে রাখা হয়। কিশোর তিতাসের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিআইপি কর্তৃক প্রদত্ত লোকেশন সঠিক ছিল না। ভিআইপি রওনা দেয়ার সময় থেকে ঘাট পর্যন্ত আসতে যে সময় লাগার কথা তার চেয়ে বেশি বিলম্বে ঘাটে পৌঁছেন। ভিআইপি তার দেয়া লোকেশন অনুযায়ী সঠিক সময়ে ঘাটে পৌঁছলে অনেক আগেই ফেরি ঘাট ছেড়ে যেত। এতে মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি হয়ত নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হতো।

এর উল্টো প্রতিবেদন দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি। তাদের প্রতিবেদনে মাদারীপুর কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় সেই যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডল ও মাদারীপুর জেলার ডিসিরও কোনো দায় খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি হাইকোর্টের বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: রেজাউল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি এ প্রতিবেদন জমা দেন। তদন্ত দলের অন্য দুই সদস্য হলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আ: সাত্তার শেখ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব তোফায়েল ইসলাম।

এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিচ্যুত করার বিধান রয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মচারী আপিল ও শৃঙ্খলা বিধিতেও এসব ঘটনায় গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরিচ্যুতির কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তাকেই এমন শাস্তি দেয়ার নজির নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। জনপ্রশাসনে এসব গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ‘ওএসডি’। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলি ইমাম মজুমদার বলেন, কর্মকর্তাদের অসদাচরণে ওএসডি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে এটি আইনগত কোনো শাস্তি নয়। তদন্তের পর অভিযুক্ত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার না হওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্যায়ের অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া উচিত। এটি না হলে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওই কাজে উৎসাহিত করা হয়। এ জন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তা তদন্ত করা উচিত।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum