১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কর্মকর্তাদের নৈতিক কেলেঙ্কারিতে বিব্রত জনপ্রশাসন

-

দেশে যৌন নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। নিজের সহকর্মী অথবা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অন্য নারীদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছেন তারা। এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এসব ঘটনায় উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও জড়িত। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ছাড়াও যৌন হয়রানির প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলার ঘটনাও ঘটেছে। কর্মকর্তাদের এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত খোদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই। 

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ দুঃখজনক; যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসুক না কেন তার তদন্ত হচ্ছে এবং দোষী হলে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। 
ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে প্রায় এক বছর ধরে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করে আসছিলেন উপসচিব এ কে এম রেজাউল করিম রতন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয়। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে প্রিন্সিপাল থাকা অবস্থায় এক ছাত্রীকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে কৌশলে কোমল পানীয় খাইয়ে অচেতন করে ধর্ষণ করেন এ কে এম রেজাউল করিম রতন। এ সময় ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করেন তিনি। পরে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টানা প্রায় এক বছর ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন তিনি। ২০১৮ সালে পদোন্নতি পেয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হন তিনি। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর করা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। 

গত ২৪ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেয়া অভিযোগে ওই ছাত্রী জানান, গত ২ জুন বিকেলে ধানমন্ডির ৮ নম্বর ব্রিজ এলাকায় ওই উপসচিব তার গাড়ি দিয়ে তাকে ধাক্কা দেন। পরে তিনি গাড়ি থেকে নেমে ওই ছাত্রীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং মারধর করলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা ওই উপসচিবকে আটক করে পুলিশে দেন। পরে ওই ছাত্রী বাদি হয়ে আরো একটি মামলা দায়ের করেন। এর পরও প্রতিদিনই তিনি ওই ছাত্রীকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন। 
এর আগে গত বছরের ২৪ অক্টোবর নাটোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলামুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগী নারী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযোগ, ডিসি তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কুপ্রস্তাব ও রাতে সার্কিট হাউজে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। কুপ্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় তাকে দাফতরিকভাবে হয়রানি করেন। এর প্রতিকার চেয়ে ওই ম্যাজিস্ট্রেট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে ডিসি গোলামুর রহমান ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে তার কার্যালয়ের ওই নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে সম্প্রতি ফেসবুক মেসেঞ্জার ও মোবাইল ফোনে কুপ্রস্তাব দেন। এ অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ডিসি বিভিন্নভাবে ওই ম্যাজিস্ট্রেটকে হয়রানি করেন। পরে ভুক্তভোগী ওই নারী ম্যাজিস্ট্রেট লিখিতভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবগত করেন। এর ফলে মন্ত্রণালয় তাকে অন্যত্র বদলি করে। 
এ দিকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর ২৬ নভেম্বর মোহাম্মদ গোলামুর রহমানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

এরপর সম্প্রতি জামালপুর জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরকে একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে তার অফিসের একজন নারী কর্মচারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা যায়। তবে ঘটনা অস্বীকার ও ভিডিওটি সাজানো বলে দাবি করেছেন ডিসি। 
গত বৃহস্পতিবার রাতে খন্দকার সোহেল আহমেদ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ডিসির আপত্তিকর ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। 

তবে গত শুক্রবার সকাল থেকে ওই আইডিতে ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর মধ্যেই ফেসবুক মেসেঞ্জারে ভাইরাল হয়ে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে ধারণ করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ও ৩ আগস্টের। এরপর গত শনিবার আরো ২৫ মিনিটের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর সার্কিট হাউজে সাংবাদিকদের ডেকে বলেন, তিনি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত। প্রকৃত ঘটনা জানতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 
ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি সাজানো ভিডিও। একটি হ্যাকার গ্রুপ দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করলেও তিনি গুরুত্ব দেননি। এর পরই বানোয়াট ভিডিওটি একটি ফেক আইডি থেকে পোস্ট দেয়া হয়েছে। 
তবে ভিডিওটিতে দেখানো কক্ষটি অফিসের ভেতরে ডিসির বিশ্রাম নেয়ার কক্ষ ও ভিডিওর ওই নারী তার কার্যালয়ের অফিস সহায়ক বলে স্বীকার করেন তিনি। 
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গতকাল আহমেদ কবীরকে ওএসডি করেছে এবং জামালপুরের নতুন ডিসি নিয়োগ দিয়েছে।


আরো সংবাদ