১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

অবসরের পরও দেশের স্বার্থে নিয়োজিত থাকবো : ডিএমপি কমিশনার

প্রেস কনফারেন্সে ডিএমপি কমিশানর। - ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘ ৩২ বছর পুলিশে চাকরি শেষে অবসরে যাচ্ছি। ১৬৮০ দিন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে নগরবাসীকে সেবা করেছি। আজ আমার শেষ কর্মদিবস। আইন শৃংখলা রক্ষার্থে আপনারা আমাকে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন সেজন্য আপনাদের প্রতি রইলো চির কৃতজ্ঞা। আপনাদের ভালোবাসা ও সুস্থতা নিয়ে অবসরে যাচ্ছি। অবসরের পরও দেশের স্বার্থে সবসময় নিয়োজিত থাকবো।

বৃহস্পতিবার (৮ আগস্ট) বেলা ১১টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে শেষ কর্মদিবসে আয়োজিত মিট দ্যা প্রেসে একথা বলেন ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বিপিএম (বার), পিপিএম।

প্রেসে কনফারেন্সে সাংবাদিকদের কমিশনার বলেন, একটি সময় ছিল পুলিশ ও সাংবাদিকতার মধ্যে অনেক দুরত্ব ছিল। কিন্তু আমার সাড়ে ৪ বছর ডিএমপি কমিশনার হিসেবে কর্মজীবনে সাংবাদিকদের সাথে চমৎকার পেশাদারিত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। আমি ২০১৫ সালে কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর টানা ৯২দিন আগুন সন্ত্রাস হয়েছিল। আমরা সাংবাদিক ও নগরবাসীকে সাথে নিয়ে সেই আগুন সন্ত্রাসকে দমন করেছি। ১ জুলাই ২০১৬ হলি আর্টিসান হামলায় দেশী বিদেশী ২২জন নাগরিক নিহত হন। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমি আমরা অন্যান্য অফিসার নিয়ে হলি আর্টিসানে গিয়ে হাজির হই। আমার পাশেই সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গেলেও প্রাণ হারায় আমরা প্রিয় দুই সহকর্মী। এই সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবানে দেশজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নাগরিক ঐক্য তৈরি হয়। হলি আর্টিসান হামলার পর আমরা ছোট বড় ৬০টি প্রিভেনটিভ জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালিয়েছি। তাতে অনেক জঙ্গি নিহত হয়েছে এবং অনেককেই আমরা গ্রেফতার করেছি। ৬ মাসের মধ্যে আমরা এই জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক বিধ্বস্ত করেছি। বিদেশী বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের আস্তা আমরা স্বল্প সময়ে অর্জন করতে পেরেছি বলে দেশে বিনিয়োগ চলমান রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সবসময় জিরো টলারেন্স। আমরা ঢাকা মহানগরীরে মাদক বিরোধী অনেক অভিযান করেছি। মাদকের আখড়া বলে খ্যাত সকল স্থান ভেঙ্গে সামাজিক প্রতিষ্ঠান করে দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, দেশের যেকোন আন্দোলনে কিছু কুচক্রীমহল আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্ঠা করেছিল। আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও ধৈর্য দিয়ে সব কুচক্র মোকাবেলা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি পুলিশের একার পক্ষে কোন কাজ করা সম্ভব না। তাই জনসম্পৃক্ততা ও জনগণকে পুলিশিংয়ে সম্পৃক্ত করতে ডিএমপি’র ৫০টি থানাকে ৩০২টি বিটে ভাগ করে জনমত গড়ার কাজ করেছি। অপরাধীরা যাতে পরিচয় গোপন রেখে ঢাকা শহরে বসবাস না করতে পারে সেজন্য আমরা ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের তথ্য সংগ্রহ করেছি। বর্তমানে প্রায় ৭২ লাখ নাগরিকের তথ্য আমাদের CIMS সফটওয়ারে সংরক্ষিত আছে। নাগরিক তথ্য সংগ্রহের ফলে হলি আর্টিসানে সন্ত্রাসী হামলার পর ঢাকা শহরে কোন সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি। আমাদের উদ্যোগে ঢাকা শহরের বাসা-বাড়ি,অফিস, দোকান, মার্কেট ও শপিংমলসহ বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। যার ফলে অপরাধ হলেও অপরাধীকে সহজে ও দ্রুত সময়ে সনাক্ত করে গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে। ঢাকা শহরে ট্রেডিশনাল ক্রাইম নেই বললেই চলে। মোটা অংকের টাকা পরিবহনে সবসময় আমরা মানি এস্কর্ট সেবা দিচ্ছি। আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়েছে।

কমিশনার বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইভেন্টের জন্য নিরাপদ ভেন্যু হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা অত্যন্ত সফলতার সাথে আইপিইউ, সিপিইউ সম্মেলনের মত বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্টে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিয়েছি। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার সাংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আমাকে চিঠি দিয়েছে। পবিত্র নগরী মক্কা-মদিনার সম্মানিত খতিব ও ক্যাথলিক ধর্মীয় গুরু পোপ বাংলাদেশে নিরাপত্তার সাথে সফল করে গেছেন। বাংলাদেশে আগত বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারদের আমরা ওয়ার্ল্ড ক্লাস নিরাপত্তা দিয়েছি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইভেন্টে আমরা সুদৃঢ় নিরাপত্তা দিয়েছি।

বিভিন্ন সফলতম উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, আমরা থানার সেবার মান বৃদ্ধিতে নানান উদ্যোগ নিয়েছি। ফরমের মাধ্যমে জিডি করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা শতভাগ সফল না হলেও থানা পুলিশের মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছি। বর্তমানে ট্রাফিক প্রসিকিউশনের জরিমানা পরিশোধ ডিজিটাল করা হয়েছে। ক্রেডিট/ ডেবিট কার্ডসহ যেকোন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ঘটনাস্থলে জরিমানা পরিশোধ করা যাচ্ছে।

এছাড়াও কমিশনার বলেন, ডিএমপি’র ৩৪ হাজার সদস্যকে নিয়ে জনবান্ধব, শিশু ও নারী বান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা ছিল আমার বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ আমরা সফলভাবে মোকাবেলা করেছি। আমার দীর্ঘ ৩২ বছর চাকরি জীবনে সবসময় চেষ্টা করেছি জনবান্ধব পুলিশিং করতে। মানুষকে ভালো সেবা ও সর্বোচ্চ আইনী সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে গেছি। আমি অবসরে যাওয়াকালে বলবো থানা যেন হয় মানুষের আস্থার ও নিরাপত্তার প্রতীক।

সম্মানিত নগরবাসীর প্রতি আমরা আহবান জানিয়ে কমিশনার বলেন, আসুন আমরা সকলে আইন মানি। আমরা এদেশের নাগরিক। সু নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেই আইন মানবেন ও অন্যকে আইন মানতে বলবেন। আমরা সকলে আইন মানলে ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করলে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

দীর্ঘ ৪ বছর আট মাস ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সবচেয়ে সফল ও অসফল দিক সম্পর্কে জানতে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে কমিশনার বলেন, আমি দীর্ঘ ১৬৮০ দিন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। যা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ইতিহাসে এটাই প্রথম দীর্ঘ সময় ধরে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। এই সময়টার মধ্যে সফলতা বলতে টিম ডিএমপি’র ৩৪ হাজার সদস্যের পরিবারকে একটি ছাতার নিচে রেখে ঢাকা মহানগরীর আইন শৃংখলা আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। জঙ্গিবাদ দমনে আমাদের সফলতা বিশ্বের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। আমরা CIMS ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে নগরীর একটি টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অসফলতা বলতে জনগণের প্রত্যশা ও প্রাপ্তি অনেকাংশে পূরণ করেছি কিন্তু শতভাগ পূরণ হয়নি। থানার সেবার মান অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। আরো বৃদ্ধি করতে হবে। যানজটমুক্ত ঢাকা শহর বিনির্মানে আমরা শতভাগ সফল হয়নি। আমাদের প্রচেষ্টার কোন ঘাটতি ছিল না।

ডিএমপি কমিশনার হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ কোনটি ছিল এমন প্রশ্নের উত্তরে কমিশনার বলেন, কমিশনার হিসেবে চ্যালেঞ্জ ছিল ২টি। প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিলো- ডিএমপি’র ৩৪ হাজার সদস্যের মনোভাব পরিবর্তন করা। আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, জনগণ আমাদের মুনীব, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার ও সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার মনোভাব প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের দেশেরে অধিকাংশ লোক আইন মানতে চাই না। আইন না মানার যে সংস্কৃতি রয়েছে তা থেকে বেরিয়ে জনগণকে মনে আইন মানার সংস্কৃতিতে কিভাবে গেঁথে দেয়া যায় সেটি ছিল আমার আর একটি চ্যালেঞ্জ।

এসময় ডিএমপি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik