১৫ অক্টোবর ২০১৯

ইফা ডিজির পদত্যাগ নিয়ে ধূম্রজাল

সামীম মোহাম্মদ আফজাল - সংগৃহীত

ইসলামি ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজালের পদত্যাগের বিষয় নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। গতকাল রোববার তার পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা থাকলেও জানাননি বরং আগের মত পাল্টিয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। 

জানার জন্য ডিজির মোবাইল ফোনে কল করা হলে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জাকির হোসাইন ফোন রিভিস করে তার পক্ষে নয়া দিগন্তকে বলেন, উনি কাশির জন্য কথা বলতে পারছেন না। উনার পক্ষে আমি বলছি। তিনি বলেন, স্যার তো সরকারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত। চুক্তি তো সরকারের সাথে হয়েছে। সরকারপ্রধান তার চুক্তি বাতিল করে যদি অন্য কাউকে নিয়োগ করেন সেটা সরকারের বিষয়। স্যার তো পার্লামেন্টের মেম্বার না বা মন্ত্রিপরিষদের সদস্যও না যে পদত্যাগ করবেন।
ফাইল সরানোর চেষ্টার ব্যাপারে তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। স্যার কোথাও গেলে উনার সাথে ফাইল থাকে। সচিব কর্তৃক ফাইল ফেরত নেয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এগুলো অন্য ফাইল ছিল। এ ব্যাপারে তিনি আর কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান। 

রোববার নয়া দিগন্তকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য মিছবাহুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ইফা ডিজি অসুস্থতার কারণে পদত্যাগের পরামর্শ দিলে তিনি না করেননি এবং তিনি রোববার তার অবস্থান বা পদত্যাগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানাবেন। ইফার সচিব কাজী নুরুল ইসলামও জানিয়েছিলেন, ডিজি পদত্যাগ করবেন জানিয়েছে ছুটির দিনেও তাকে অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বেঁধে এক কর্মকর্তার গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে সেগুলো নিতে দেয়া হয়নি। 
গতকাল মিছবাহুর রহমান চৌধুরীর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ঢাকার বাইরে আছেন জানিয়ে বলেন, তাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেয়ার পর তিনি তো রোববার সিদ্ধান্ত বা পদত্যাগের বিষয় জানাবেন বলেছিলেন। কিন্তু কেন জানাননি আমার সাথে আর কথা হয়নি। একবার তিনি ফোন দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি আত্মীয়ের নামাজে জানাজায় থাকায় কথা বলতে পারিনি। এ বিষয়ে তিনি আগাম কিছু বলতে পারবেন না বলেও জানান। 

এ দিকে পদত্যাগের বিষয় এবং ছুটির দিনে ইফা থেকে ফাইল নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ডিজির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য গতকাল দেয়া হয়নি। ডিজি গতকাল আগারগাঁও ইসলামিক ফাউন্ডেশনেও যাননি। গতকাল দুপুরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়ে দেখা যায় সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গতকাল ইফা ডিজি অফিস করেছেন কি না জানতে চাইলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, আজ তিনি অফিসে যাবেন, অফিস করবেন। 

ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে গত সোমবার ধর্ম মন্ত্রণালয় ইফা ডিজিকে শোকজ করার পর তিনি পদত্যাগ করছেন এমন খবরই গতকাল জানা গিয়েছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই পদত্যাগের বিষয়ও জানা গিয়েছিল। তবে গতকাল ওই সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে ডিজিকে পদত্যাগের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল এবং তাতে তিনি রাজি হয়েই শনিবারই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েই নিজ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তবে তার পদত্যাগের বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়নি- এমন একটি ধারণা থেকেই ডিজি পরে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। তবে সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

শনিবার সরকারি ছুটির দিনে আগারগাঁও ইসলামিক ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনে গিয়ে অফিসে যান ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল। সংস্থার সচিব কাজী নুরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, নিজের পদত্যাগের কথা বলেই তাকে ছুটির দিনে অফিসে ডেকে পাঠান। এ সময় কিছু ফাইল সরানোর চেষ্টায় বাধা দিলে তিনি পরে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে থাকতে পারেন বলেও ইফা সচিব জানান। 

পদত্যাগের জন্যই ইফা সচিবকে শনিবার ডেকে পাঠানোর বিষয়টিও ডিজির হয়ে তার পিএস জাকির হোসাইন অস্বীকার করে বলেন, সচিবকে ডাকা হয়েছিল ফাইল নিয়ে আলোচনা করার জন্য। 
শনিবার ডিজি অফিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথিপত্র সরিয়ে ফেলছেন- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সংস্থার শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে ছুটে যান। তারা ডিজির অফিস ঘেরাও করে রাখেন। পরে ইফার বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য আলহাজ মিছবাহুর রহমান, ইফার সচিব কাজী নুরু ইসলাম ও আইন উপদেষ্টা এ আর মাসউদ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তারা ডিজির সাথে কথা বলেন এবং তার পদত্যাগের বিষয়েও আলাপ করেন। একপর্যায়ে ডিজি তাদের ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় অফিস ত্যাগ করেন। 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বাসায় নেয়ার জন্য আনুমানিক ৪০টি ফাইল ডিজির গাড়িতে ওঠানো হয়েছিল। কিন্তু বাধার মুখে সেগুলো আবার গাড়ি থেকে অফিসের লকারে রাখতে বাধ্য হন। 
মিছবাহুর রহমান শনিবার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছি। তিনি এতে না করেননি। বলেছেন, রোববার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন। উনি রোববারই পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি নিয়ম অনুযায়ী জানিয়ে দেবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। ফাইল সরিয়ে নেয়ার চেষ্টার ব্যাপারে এই বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য বলেন, একজন কর্মকর্তার গাড়িতে কিছু ফাইল তোলা হয়েছিল। পরে সেগুলো ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় সামীম মোহাম্মদ আফজালের মোবাইল ফোনে বারবার ফোন করেও কথা বলা যায়নি। তিনি লাইন কেটে দেন। তবে গতকাল সন্ধ্যায় প্রথমে কয়েকবার ফোন রিসিভ না করলেও পরে পরিচয় দিয়ে এসএমএস পাঠালে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা প্রথমে জানান, উনি বিশ্রামে আছেন। পরে জানান, কাশির জন্য কথা বলতে পারছেন না। তার পক্ষে তিনিই কথা বলবেন। এরপর পদত্যাগ ও অন্যান্য বিষয়ে ডিজির পক্ষে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

গত সোমবারর ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ইফা ডিজিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কেন অবহিত করা হবে না তা সাত কার্যদিবসের মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ মার্কেট বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মজুমদারকে ইফা ডিজি সম্প্রতি সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশকে কেন্দ্র করে এই শোকজের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ডিজি নির্ধারিত সাত কর্মদিবসের মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের শোকজেরও জবাব দিতে পারেন। এ জন্য একটি জবাবের খসড়া ইতঃপূর্বেই তৈরি করা হয়েছে। এই শোকজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ও ইফা ডিজির মধ্যে তিক্ততা ও বিরোধের বিষয় সামনে এসেছে বলে অনেকে মনে করছেন। 

এ দিকে ইফা ডিজি কর্তৃক ছুটির দিনে ফাইল সরানোর চেষ্টা ও তিনি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন এমন খবরে সোশ্যাল মিডিয়াসহ সর্বত্র ব্যাপক আলোচনা জন্ম দেয়।

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum