২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঢামেক হাসপাতালের নতুন নিয়মে লাশ নিয়ে ভোগান্তি

ঢামেক হাসপাতালের নতুন নিয়মে লাশ নিয়ে ভোগান্তি - ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা যেকোনো রোগীর স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও লাশের পোস্টমর্টেম করাতে হবে। হঠাৎ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে ভোগান্তিতে পড়ছেন নিহতদের স্বজনেরা। পোস্টমর্টেম ছাড়া প্রিয়জনের লাশ ফিরে পেতে থানা পুলিশ থেকে শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্না ধরছেন তারা। 

এদিকে পোস্টমর্টেম নিয়ে এমন সিদ্ধান্তের কারণে হাসপাতালের কিছু অসাধু ব্যক্তি লাশ জিম্মি করে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাধারণত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কোনো রোগী মারা যাওয়ার পর স্বজনদের কোনো অভিযোগ না থাকলে সেটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম করানোর বিষয়টি স্বজনদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। মূলত কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে এবং পুলিশ কেস হলে লাশের পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করে থাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কয়েকদিন ধরে চিকিৎসা নিতে আসা কোনো রোগীর মৃত্যু হলেই বাধ্যতামূলক পোস্টমর্টেমের জন্য লাশ পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে মর্গে। ফলে স্বজনরা হাসপাতাল থেকে তাদের প্রিয়জনের লাশ নিতে গিয়ে পোহাচ্ছেন চরম ভোগান্তি। পোস্টমর্টেম ছাড়া প্রিয়জনের লাশ নিতে তারা ধর্না দিচ্ছেন পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে।

ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, হঠাৎ করেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পোস্টমর্টেমের ব্যাপারে নিয়ম জারি করেছে। হাসপাতালের পরিচালক পাঁচ দিন আগে নির্দেশ দিয়েছেন, সব লাশের পোস্টমর্টেম করতে হবে। পরিচালকের এই নির্দেশের পর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা যেকোনো রোগী মারা গেলে পোস্টমর্টেমের জন্য লাশ পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে মর্গে। সূত্র জানায়, কোনো কারণ বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এ যাবৎ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মারা গেলে ওই লাশের পোস্টমর্টেম হতো না। কিন্তু হঠাৎ করে এই নিয়ম পাল্টে গেছে। হাসপাতাল পরিচালকের এই সিদ্ধান্তের কারণে হাসপাতালের চিকৎসক ও কর্মকর্তারাও বিব্রত।
সূত্র জানায়, গত পাঁচ দিনে ঢামেক হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা ৩৫ জন রোগীর মারা যায়। স্বজনদের অভিযোগ না থাকায় তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলেও ধরে নেয়া হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের কারণে লাশগুলো আতœীয়-স্বজনের কাছে না দিয়ে পোস্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠিয়ে দেন মেডিক্যাল অফিসাররা। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্বজনেরা। তারা সময় এবং আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু তাই নয় তাদের স্বজনদের লাশ অহেতুক কাটাকাটি করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলেও এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতায় পরিচালকের নির্দেশে রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

গত বুধবার বেলা সোয়া ১১টায় লালবাগের শেখসাহেব বাজার এলাকা থেকে মোছলেম বেপারী (৬৮) নামে এক ব্যক্তিকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন স্বজনেরা। চিকিৎসক তাকে দেখে ইসিজি করানোর জন্য পাঠান। কিন্তু ইসিজি করার আগেই মারা যান মোছলেম ব্যাপারী। নিহতের ছেলে জিদনী বেপারী জানান, তার বাবা দীর্ঘ দিন শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। বুধবার বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক বাবাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, চিকিৎসক তার বাবার লাশের পোস্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠায়। পোস্টমর্টেম ছাড়া বাবার লাশ বাড়ি নেয়া জন্য এ সময় তিনি একটি কাগজ নিয়ে ছুটে যান লালাবাগ থানায়। পাশাপাশি স্থানীয় এক নেতার সাহায্য নেন। তিনি অভিযোগ করেন, পোস্টমর্টেম ছাড়া বাবার লাশ পেতে তার সারা দিন লেগে যায়।

পটুয়াখালীর বাউফল থেকে ঢামেক হাসপাতালে আসা আবদুল খালেক (৭০) বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ছিলেন। তার ছেলে সেলিম জানান, গত বুধবার সকালে চিকিৎসার জন্য পটুয়াখালী থেকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন বাবাকে। সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। এরপর তার বাবার লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় মর্গে। পোস্টমর্টেম ছাড়া বাবার লাশ ফিরে পেতে ছুটে যান শাহবাগ থানায়। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুলিশের ধর্না ধরেন। পরদিন বাবার লাশ নিয়ে যান বাড়ি।

এভাবে কয়েকদিন ধরে ঢামেক হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীর লাশের বাধ্যতামূলক পোস্টমর্টেম করানোর কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন স্বজনেরা। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে পর্যন্ত ৯ জন মারা যান হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। কেউ মারা গেছেন হৃদরোগে, আবার কেউ মারা গেছেন ব্রেইন স্ট্রোকে। আবার কেউ মারা গেছেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। এদের প্রত্যেকের লাশই পোস্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। 

এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিক্যাল অফিসার ডা: মশিউর রহমান বলেন, অনেক দিন ধরে এখানে আছি। কিন্তু এমন আইন এই প্রথম দেখলাম। স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পোস্টমর্টেমের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বাড়তি পোস্টমর্টেমের কারণে আমাদের ভোগান্তি হচ্ছে। এটি বন্ধ করা উচিত। আর এতে লাভবান হচ্ছেন হাসপাতালের কিছু অসাধু লোক ও থানা পুলিশ সদস্য। 
জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা: মো. আলাউদ্দীন এ বিষয়ে বলেন, পরিচালকের নির্দেশে আমরা কাজ করছি। আমাদের কিছু করার নেই। তিনি আরো বলেন, নতুন করে মৃত্যুর সনদপত্র ছাপানোর কারণে এ ব্যবস্থা নিয়েছেন পরিচালক। তবে এতে নিহতদের স্বজনদের অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হবে। 
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।


আরো সংবাদ