film izle
esans aroma Umraniye evden eve nakliyat gebze evden eve nakliyat Entrumpelung wien Installateur Notdienst Wien
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বরফঘেরা পাহাড়ি শিমলা

-

ট্রেনের জানালার ফাঁক গলে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে এলোমেলো। বাইরের কোলাহল ঝক ঝক শব্দের সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে। মন্দ লাগছে না ট্রেনের শব্দটা। কেমন নেশা নেশা ভাব। বাইরে গভীর অন্ধকার। দূরে কোথাও টিপটিপে জ্বলছে গেঁয়ো মশাল। শীতের রাতে মনে হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছি কোনো দূর অজানায়।
অনেক দিন ধরেই পরিকল্পনা করছি শিমলা দেখতে যাওয়ার। কয়েকজন সঙ্গী জুটে যাওয়ায় রাতেই রওনা হলাম শিমলার উদ্দেশে। শিমলা ভারতের হিমাচল প্রদেশের রাজধানী। জমিন থেকে এর উচ্চতা প্রায় সাত হাজার ২৩৪ ফুট। ভারতের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। প্রচণ্ড গরমেও সেখানে থাকে কনকনে শীত। শীতকালে বরফ পড়ে। বরফ দেখতে পর্যটকরা শীতকালকেই বেছে নেন ভ্রমণের জন্য।
দেওবন্দ স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে বসলাম। আম্বালা স্টেশনে হবে খানিক যাত্রাবিরতি। ভাবছি, সফরটা আনন্দেই কাটবে। বরফে গা ভাসাব। মেঘের নির্মল পানি ছুঁয়ে দেখব পাহাড়ে চড়ে। ঝরনার পানিতে সাঁতার কাটব মনভরে। কী মজাটাই না হবে!
আম্বালা পৌঁছতে রাত ১০টা বেজে গেল। টিকিট কেটে জানালার পাশে বসলাম। বাইরে রাতের দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। কালকা স্টেশনে নামলাম রাত আড়াইটায়। শিমলার ট্রেন রাত ৩টায়। ট্রেনগুলো দেখতে খুব সুন্দর। ছোট ছোট বগি। দেখতে অনেকটা শিশুপার্কের বাচ্চাদের চড়ার ট্রেনের মতো। যথাসময়ে ট্রেনে চড়লাম। পুরো বগিতে হইহুল্লোড়, চিল্লাচিল্লি। বিপুল আনন্দে মত্ত সবাই। কয়েকটা পরিবারও এসেছে। ছোট শিশুরা এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে। ট্রেনজুড়ে যেন খুশির বন্যা বইছে।
হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছাড়ল খানিক বাদে। সারা রাতের নির্ঘুম ক্লান্তিতে ফের ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে বাইরে তাকালাম। জীবনের অভিনব সব দৃশ্য দেখলাম সেখানে। শত শত ফুট ওপর দিয়ে ট্রেনটা এগোচ্ছে আমাদের নিয়ে। নিচে খাদের দিকে তাকালে গা ছমছম করে। দূরের বিশালাকারের পাহাড়গুলো যেন আকাশের নীল ছুঁয়েছে। কোনোটা পাহাড় সবুজেঘেরা, কোনোটা কালো পাথুরে, কোনোটা গাঢ় খয়েরি। লাগোয়াভাবে রয়েছে এক পাহাড় অন্য পাহাড়ের সাথে। যেন স্বপ্নের কোনো ভূস্বর্গ। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই সাথে প্রচণ্ড শীত। জমে যাওয়ার অবস্থা। এত উঁচুতে অবস্থান করছি যে, পাহাড়ের আশপাশে ভাসমান মেঘ দেখা যায়। চলতি ট্রেনে বসে ছুঁয়েও দেখেছি সে মেঘের ভেলা। কেমন শিরশিরে ভাব। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের আর আনন্দের লেগেছে। মেঘ ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি এই প্রথম। ট্রেনটি এগোচ্ছে বড় একটি গুহার ভেতর দিয়ে। ইংরেজদের আমলে নির্মিত এ রেলপথ আর পাহাড়ের গুহা সত্যিই আশ্চর্যের। বিশাল পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ১০৪টি গুহা। এসবের ভেতরে ঢুকতেই আনন্দ-চিৎকারে মেতে ওঠে সবাই। পাশের সিটের দিদিদের আনন্দ যেন একটু বেশিই। একটু পরপরই চিৎকার-চেঁচামেচি, নয়তো গলা ছেড়ে হিন্দি গান। যত ওপরে উঠছি ততই শীত বেড়ে চলছে। আরেকটু ওপরে উঠতেই তুষারপাত শুরু হলো। চারদিকে বরফের মেলা। গাছের ওপর, গাড়ির ওপর, ঘরের ছাদে বরফ পড়ে সব শুভ্রবর্ণ হয়ে আছে। সবাই আনন্দ-চিৎকার করছে বরফ দেখে। মোবাইল বের করে শুভ্র প্রকৃতির ভিডিও করে নিলাম। বরফে আবৃত গাছগুলো দেখতে সত্যিই চমৎকার।
এক স্টেশনে ট্রেন থামল মিনিট দশেকের জন্য। ট্রেন থেকে বরফ খেলায় নামলাম সবাই। হাতে নিয়ে গোল পাকিয়ে ছোড়াছুড়ি। ওপর থেকেও ঝরছে বরফ, নিচেও তার ছড়াছড়ি। কী এক মুগ্ধতায় হারালাম তখন। দূরের পাহাড়গুলো বরফে সম্পূর্ণ সাদা হয়ে আছে। মনে হলো, পাখা মেলে একটু উড়ে আসি দূরের ওই শুভ্র নীল জগত থেকে!
আবারো ট্রেনে চড়ে বসলাম। প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে পৌঁছলাম স্বপ্নের শিমলা। শিমলার রেলস্টেশনটা যেন কোনো স্বর্গের নিকুঞ্জ। সবার সাথে আমরাও অনেকক্ষণ হইহুল্লোড়ে মেতে রইলাম।
একটা হোটেলে রুম ভাড়া করে নিলাম। হোটেলের পাশে বড় একটা মাঠ। পুরো মাঠ সাদা বরফে ঢাকা। যেন আকাশের শুভ্রতা নেমে এসেছে মাটিতে। মাঠে নেমে দৌড়াদৌড়ি, হুড়োহুড়ি শুরু করলাম।
বিকেলে হোটেলবয় আমাদের নিয়ে চললেন আশপাশের জায়গাগুলো ঘোরানোর জন্য। একটু দূরেই পাহাড়। আমরা তার সাথে পাহাড়ে উঠতে লাগলাম। ঢালু সিঁড়ি থাকলেও উঠতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। মাঝে মধ্যে বিশ্রাম নিয়ে আবার চলতে থাকি। মিনিট দশেক বাদে আমরা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছলাম। সেখানে একটা পুরনো আমলের বাড়ি নজরে এলো। হোটেলবয় বললেন, এটা ইংরেজদের তৈরি। নাম অ্যাডভান্স এস্টেডি। এর ভেতর নাকি আশ্চর্য সব জিনিস রয়েছে। সেদিন ছুটি থাকায় ভেতর ঢুকতে পারিনি ঘরটির। বাইরে থেকে ঘুরে দেখেছি কেবল।
এরপর হোটেলবয় আমাদের নিয়ে চললেন আরেক বিস্ময় দেখাতে। আগেরটার চেয়ে এ পাহাড় বেশ উঁচু আর চওড়া। উঠতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলাম। তবু খানিক বিশ্রাম নিয়ে উঠতে লাগলাম। একেবারে প্রান্তচূড়ায় পৌঁছে বিস্ময়ে আমরা হতবাক! কী সুন্দর প্রকৃতি ও তার রূপলাবণ্য। মহান প্রভুর অসীম মহিমাময়তার দেখা পেলাম যেন। চারদিকে কেবল বরফের পাহাড়। বাতাসে ভাসছে মেঘের ভেলা। কাছে এলে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখা যায়। মনে হলো, পৃথিবীর সবচে উঁচু জায়গায় রয়েছি আমরা। দূরের পাহাড়গুলো অনেক ছোট মনে হলো। রাস্তার পাশে রেলিং ঘেরা একটা জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে নিচের জগৎ দেখলাম। শুভ্র বরফে ছেয়ে আছে সব। মনে হচ্ছে, যেন পুরো শিমলাই সাদা বরফে ঢাকা। পাহাড়ের আরো উপরে রয়েছে একটা শিবমূর্তি। অনেকদূর থেকে এটি দেখা যায়। বড় একটি গির্জাও রয়েছে এ চূড়ায়। হোটেলবয় বললেন, এ জায়গার নাম মালরোড। বিকেল পর্যন্ত সেখানে ঘোরাঘুরি করে মহান প্রভুর সৃষ্টি অনিন্দ্য রূপ দেখলাম। সন্ধ্যায় ফিরলাম হোটেলে।
এখানের বাড়িঘরগুলো খুব সুন্দর আর আশ্চর্যের। পাহাড় কেটে খোঁপে খোঁপে তৈরি করা হয়েছে সুন্দর ঘরবাড়িগুলো। রাতের পাহাড় দেখতে আরো সুন্দর। প্রতিটি পাহাড়েই জ্বলজ্বল করছে হাজারও বাতি। যেন এটিও আকাশের একটি প্রান্ত। যেখানে জোনাকির মতো জ্বলছে শত শত তারকারাজি।
রাতে প্রচণ্ড শীত পড়ল। কাঁথা, কম্বলে মানছিল না। এমনিতে সারা দিন বরফে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তার ওপর শীত! পরদিন ফেরার পথ ধরলাম। সিদ্ধান্ত হলো, বাসে করে ফিরব। বাসস্ট্যান্ড এসে বাসে চড়ে বসলাম। মিনিট পাঁচেক পর বাস ছাড়ল আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে। জানালা দিয়ে মেঘের উড়াউড়ি দেখছি। চারপাশে তখন বিরাজ করছিল নৈসর্গিক সুন্দরের অপূর্ব হাতছানি।
টঙ্গী, গাজীপুর


আরো সংবাদ