২০ নভেম্বর ২০১৯

শাপলা বিলের শৈশব

-

শৈশব মানে নীল চাদরে মোড়ানো এক টুকরো রঙিন আকাশ। ছুটির দিনে সে আকাশ হয়ে যেত আরো কাব্যিক। মনের ডানায় ভেসে যেতাম চাঁদের মা বুড়ির দেশে। যেখানে থাকে রাজা-রানী।
ভোরবেলা বিল থেকে শাপলা তুলতাম। স্কুলে যাওয়ার পথে ঈদগাহ মাঠের কাশবন থেকে ছিঁড়তাম কাশফুল। সেই কাশফুল আর শাপলা এখন শৈশবের হারিয়ে যাওয়া বন্ধু।
বাড়ির পাশে ফলিয়ার বিলে ফুটে থাকা শাপলার সেই শুভ্র হাসি। যা বর্ষা শেষে শরতকেও রাঙাত। বিলের মাঝে দিয়ে বয়ে চলা রাস্তা থেকে দুই পাশে ফুটন্ত শাপলার সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য।
আমাদের শৈশবে ছিল পুরনো প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে পপনওয়ালার কাছ থেকে কটকটি খাওয়া। মধ্যদুপুরে তালপুকুরে দুরন্ত ডুবসাঁতার, তপ্ত রোদে অবাধ্য ঘাসফড়িংয়ের পিছু ছোটা। সেই ডাঙ্গুলি খেলার দিন। বিকেলে পাড়ার মাঠে দলবেঁধে গোল্লাছুট কিংবা বউচি খেলা। বৃষ্টি এলে জলে-কাদায় মাখামাখি হয়ে হইহই রবের উন্মাদনা। সন্ধ্যা এলেই উঠোনে মাদুর পেতে দাদীর মুখে যুবরাজ ও রাজকন্যাদের গল্প।
বর্ষা শেষে বিলের স্বল্প পানিতে শালুক কুড়ানো আর বড়দের সাথে মাছ ধরার সেই দৃশ্য ছিল উৎসবের মতো। নির্ধারিত দিনে সবাই বিলে নামত পলো নিয়ে। এখন এসব কালভদ্রের ব্যাপার হয়ে গেছে। খুব একটা চোখে পড়ে না।
শৈশব এখন সন্ধ্যাবেলা রঙিন ঘুড়ির নাটাই গুটিয়ে ঘরে ফেরার বদলে সন্ধ্যার কোচিং ক্লাস থেকে বাসায় আসা। ফুটন্ত শাপলা কুড়ানোর বদলে দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডারের শাপলা দেখা!
শরতের রঙিন আকাশ তাকে নির্মল ভাবায় না কারণ সে ব্যালকনি নামক খাঁচায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে তারের জঞ্জালে ঘেরা আকাশ দেখার চেষ্টা করে। তার রূপকথার রাজ্যে বিচরণ করে কম্পিউটার, ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগৎ। শৈশব এখন একগাদা বইয়ের ভারে ন্যুব্জ। বেলা কাটে বাসা থেকে কোচিংয়ে ঘুরে ফিরেই। কম্পিউটার গেমস, হিন্দি কার্টুন আর মটুপাটলুর বাইরে তার দুরন্তপনার সময় কোথায়।
প্রকৃতি আমাদের থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছে। বদলে যাচ্ছে ঋতু বৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা শরৎ, কাশফুল ও শাপলা। মওসুমি পানির অভাবে শাপলাসহ পানিতে ফোটা ফুলগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তবুও এই আশ্বিনের কোনো এক শুভ্র বিকেলে স্মৃতির রঙিন ঝাঁপি খুলে সেসব টুকরো স্মৃতি আবার নেড়েচেড়ে দেখা হয়। দাদীর মুখে গল্প শোনা সেই সন্ধ্যার কথা। প্রজন্ম যায়, প্রজন্ম আসে। আমাদের নতুন প্রজন্ম ফিরে আসুক আপন ধারায়। তাদের দুরন্তপনায় প্রাণ পাক প্রকৃতি। জয় হোক শৈশবের।

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।


আরো সংবাদ