২০ অক্টোবর ২০১৯

প্রবীণদের আলো আঁধারের জীবন

-


ঢাকার দোহার উপজেলার উত্তর জয়পাড়া এলাকার ইলামুদ্দিন বেপারি এক সময়ে পরিবারের উপার্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। লুঙ্গির ব্যবসা করতেন বলে এক হাট থেকে ছুটে যেতেন আরেক হাটে। ব্যবসার উপার্জিত টাকা দিয়েই চলত পুরো পরিবারের ভরণপোষণ। কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কেটে যেত তার সময়। ইলামুদ্দিনের বয়স এখন প্রায় ১০৬ বছর। স্বাভাবিকভাবেই কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন। ছেলেরা যে যার মতো ব্যস্ত। ঘরের বারান্দায় এককোণে শুয়ে-বসেই দিন কাটে তার। শরীরে নানা অসুখ-বিসুখ দানা বেঁধেছে। প্রয়োজন সুচিকিৎসার; কিন্তু অর্থের অভাবে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারছেন না। স্থির হয়ে বসে মনে করেন অতীত জীবনের সেসব দিনের কথা। সেই সময়ে পরিবারের অনেকেরই চাওয়া-পাওয়ার অভাব মিটিয়েছেন। এখন নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্যের দিকে পথচেয়ে বসে থাকেন। বৃদ্ধ বয়সে নিজের মতো করে কিছু করার সাধ্য নেই, কিন্তু সাধ আছে। সাধ আর সাধ্যের দোলাচলে জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত হচ্ছে এই প্রবীণ ব্যক্তির।
ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মালেকা খাতুন। বয়স ৯০-এর ওপরে। জীবনে অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে ছেলেমেয়েদের লালনপালন করেছেন। বর্তমানে ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা বিয়ে করে যার যার মতো করে আলাদা সংসার সাজিয়েছে আর বৃদ্ধ মা থাকেন ভাড়াবাড়িতে। মেয়ের ঘরের নাতিরাই যতটুকু খোঁজখবর রাখছে, সেভাবেই কাটছে তার জীবন। অসুস্থতাকে সঙ্গী করে দিন কাটে তার। ওষুধ এখন নিত্যসঙ্গী। একটা সময় নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে ছেলেমেয়েদের বড় করে তুলেছিলেন। সেই সন্তানেরা যে যার মতোÑ এ কথা মনে করতেই অঝোরে কাঁদলেন তিনি।
দু’টি ঘটনা পাঠকদের সামনে আনলেও বাস্তবতা এর চেয়ে আরো কঠিন। প্রবীণ মানেই কি ঘরের এককোণে নির্জনে একাকী পড়ে থাকা এক মানুষ কিংবা পরিবার থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়া কেউ। বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও বাস্তবতার নিরিখে প্রবীণ মানেই সব কিছু জানা ও বোঝার পরও পরাজিত এক মানুষ। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ প্রবীণ। সময়ের ব্যবধানে আমাদের দেশের প্রবীণেরা অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত হচ্ছেন। যে বয়সে ভালোবাসা ও ছেলেমেয়েদের পরম যতেœ থাকার কথা, সেই বয়সে নিঃগৃহীত হওয়া ছাড়া কিছুই মিলছে না। না পাওয়ার সীমাহীন কষ্ট জমাট বাঁধছে বুকে।
বৃদ্ধ বয়সে এসে সাধারণত চোখে কম দেখা, কানে কম শোনা, ডায়াবেটিস এবং কিডনিজনিত আরো বহু জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এ সময়ে প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। কিন্তু পারিবারিক টানাপড়েনে মৌলিক অধিকারগুলো ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। অসুস্থ বয়োবৃদ্ধদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো সময়টুকুও হয়ে ওঠে না অনেকের। তবে এ কথাও সত্য, আমাদের দেশে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, পিতামাতার সেবাযতেœ সন্তান বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেন না। দায়িত্ব ও কর্র্তব্য ভালোভাবে পালন করেন। বিপরীত চিত্রে দেখা যায়, বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ তবুও জীবনের তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে। বয়োবৃদ্ধ হলে মানুষের শখ-আহ্লাদ বেড়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই। আচরণগত পরিবর্তনের ফলে শিশুর মতো হয়ে যান বৃদ্ধরা। জীবনের এ প্রান্তে এসে প্রত্যেক মানুষ নিজেকে সুখী দেখতে চান। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে আর আদরের নাতি-নাতনীদের সাথে নিয়ে আনন্দময় জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখেন তারা।
কিন্তু এ জায়গাটিতে পারিবারিক স্বার্থ আর দ্বন্দ্বের কারণে বর্তমানে প্রবীণেরা এক রকম কষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। আবার অনেকেরই পরিবার থেকে ছিটকে আশ্রয় হয় কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা প্রবীণনিবাসে। পত্রিকার পাতায় দেখা যায়, বৃদ্ধ পিতামাতাকে পরিবারের বোঝা মনে করে রাস্তায় ফেলে যায় কেউ কেউ। সারাজীবন যে মানুষটি তার মেধা আর প্রজ্ঞা দিয়ে সংসারের হাল ধরে ছেলেমেয়েদের লালনপালন করে বড় করেন, সময়ের ব্যবধানে তিনিই হয়ে যান ঘৃণার পাত্র। সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে সহ্য করতে পারে নাÑ এমনটি বুঝতে পেরে তারা সন্তানের চোখের আড়াল হয়ে একাকী জীবন যাপন করেন। আমাদের দেশে গড়ে ওঠা বৃদ্ধাশ্রমে অনেক অভিজাত পরিবারের সদস্যদের ঠাঁই হয়েছে। আশ্রিত এমন মানুষেরা কখনোই নিজেদের।
এ বছর ১ অক্টোবর মঙ্গলবার ‘বয়সের সমতার পথে যাত্রা’ এই প্রতিপাদ্যে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও পালিত হলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রবীণ দিবসে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দেশের প্রবীণহিতৈষী ব্যক্তিরা অংশ নেন। প্রবীণদের অধিকার ও নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আমাদের দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। প্রকৃতপক্ষে প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রবীণেরা সাধারণত কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে, সেগুলো শনাক্ত করে সমাধানের জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। তা হলেই প্রবীণদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে।

প্রবীণ দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর থেকে বিশ^ব্যাপী পালন হয়ে আসছে প্রবীণ দিবস। আমাদের দেশেও দিবসটি পালন হয়ে থাকে। প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কথা বলে থাকেন। প্রবীণদের উন্নয়নের জন্য যুগোপযোগী কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। প্রবীণদের জন্য দরকার নিরাপদ বাসস্থান ও মৌলিক চাহিদা পূরণ। প্রত্যেক প্রবীণ যেন পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই বসবাস করতে পারেন, এ ধরনের নিশ্চয়তা দরকার। প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিরা সম্মানিত। তারা দ্বিতীয় শিশু। মনে রাখা উচিত, আজ যারা প্রবীণ তারাও অতীতে তার পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক কিছু করে গেছেন। তাদের যেন কোনো রকম অবহেলা করা না হয়। আমরা যারা নবীন তারা যেন ভুলে না যাই যে, আমাদেরও একদিন এ অবস্থায় উপনীত হতে হবে। আজ যদি আমরা তাদের প্রতি অবহেলা করি, তাহলে আমাদেরও এ রকম অবহেলার শিকার হতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবীণেরা অবহেলিত, উপেক্ষিত, সমাজে ও পরিবারে অনেকের কাছে বোঝাস্বরূপ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অবশ্যকর্তব্য। বিশ^ প্রবীণ দিবসে সবার প্রত্যাশাÑ বাবা মা ও প্রবীণেরা পরিবারের বোঝা নয়, বরং তারা আমাদের নীতি ও আদর্শের জায়গা। সমাজে প্রবীণদের গুরুত্বের কথা মনে করে তাদের একাকিত্ব দূর করতে সবার উচিত তাদের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং তাদের সমস্যা বুঝে তাদের পাশে দাঁড়ানো। বিশ্ব প্রবীণ দিবস সেই দায়িত্ববোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। সারা বিশে^র প্রবীণেরা করুণা নয়, মর্যাদার আসনে আসীন হয়ে পরিবারের সাথে একই প্লাটফর্মে থেকে জীবন অতিবাহিত করুন, এটাই হোক বিশ^ প্রবীণ দিবসের অঙ্গীকার।

 


আরো সংবাদ

দেশী-বিদেশী পাইলটরা লেজার লাইট আতঙ্কে (৩৯৯৩৬)পাকিস্তান বনাম ভারত যুদ্ধপ্রস্তুতি : কে কতটা এগিয়ে (২৮৪৮৪)ভারতীয় বিমানকে ধাওয়া পাকিস্তানের, আফগানিস্তান গিয়ে রক্ষা (২১৮৯৮)দুই বাঘের ভয়ঙ্কর লড়াই ভাইরাল (ভিডিও) (২০৬১৪)শীর্ষ মাদক সম্রাটের ছেলেকে আটকে রাখতে পারলো না পুলিশ, ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা (১৪৭১৯)রৌমারী সীমান্তে বিএসএফ’র গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ! (১৪৫৭২)বিশাল বিমানবাহী রণতরী নির্মাণ চীনের, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকে (১৪৩৩৮)‘গরু ছেড়ে মহিলাদের দিকে নজর দিন’,: মোদির প্রতি কোহিমা সুন্দরীর পরামর্শে তোলপাড় (১৩৫৮৪)বিএসএফ সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়ে যা বললো বিজিবি (১১৮৬৩)লেন্দুপ দর্জির উত্থান এবং করুণ পরিণতি (৯৩৩৭)



portugal golden visa
paykwik