১৫ অক্টোবর ২০১৯

সেদিন সন্ধ্যায়

চারাগল্প
-

রাসেল প্রতিদিনের মতো আজো কোচিং শেষ করে বাড়ি ফিরছে। তবে আজ একা। সাথে কেউ নেই। কোচিং করানো হয় সিদ্দিকীয়া একাডেমিতে। প্রাথমিক সমাপনী কোচিং। কোচিংয়ের সময় সন্ধ্যা ৭টা হতে রাত সাড়ে ৮টা। অবশ্য দিনে স্কুল ছুটির পরও দুই ঘণ্টা পড়ানো হয়। পরীক্ষার বাকি আর মাত্র দুই মাস। তাই কোচিংয়ে প্রচণ্ড পড়ার চাপ। ছাত্র-শিক্ষক সবাই ব্যস্ত। ভীষণ ব্যস্ততায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছে প্রায়।
স্কুল থেকে রাসেলদের বাড়ির দূরত্ব ছয় শ’ মিটার মাত্র। পায়ে হেঁটে পাঁচ-সাত মিনিটের পথ। প্রতিদিন সাথে থাকে বন্ধু সিয়াম। তাই রাসেল এবং সিয়ামের পরিবার নিশ্চিন্ত থাকে; অল্প দূরত্ব আর দুইজন একসাথে চলে আসবে। আজ সিয়াম অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসেনি। সিয়াম আসবে না শুনে রাসেলও আসবে না চিন্তা করছিল। কিন্তু ট্যালেন্টপুলে বৃত্তির দৃঢ় সঙ্কল্প তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। যাবার সময় তেমন কিছু না ভাবলেও ফেরার সময় বিপত্তি বাধল। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পুরো রাস্তাটি জনবসতিহীন। মাঝখানে একটি কালভার্ট। বড়দের মুখে শুনেছে, এই কালভার্টের অংশটি প্রায় সময় ভাঙা থাকত। তখন এখানে কালভার্ট ছিল না। প্রতি বছর রাস্তা মেরামত করলেও পরের বছর বন্যার পানিতে ভেঙে যেত। এখন কালভার্ট হয়ে গেলেও এটিকে এখনো সবাই লইজ্জাবাড়ির ভাঙা নামেই চেনে। একসময় নাকি এই রাস্তা দিয়ে রাতে লোকজন একা চলাচল করত না। কী সব ভুতুড়ে ঘটনার সম্মুখীন হতো। বড়দের মুখে এমন কত ঘটনাই শুনেছে রাসেল। সব সময় এসব ঘটনা মনে না পড়লেও আজ যেন প্রতিটি ঘটনা ধারাবাহিকভাবে একের পর এক মনে পড়ছে।
প্রায় আধা ঘণ্টা চৌধুরীর দোকানে দাঁড়িয়ে থেকেও বাড়ির দিকে যাওয়ার মতো কাউকে পেল না। সময় তখন রাত সাড়ে ৮টা। আরো দেরি হলে বিপদ হতে পারে ভেবে রাসেল একা একাই হাঁটা শুরু করেছে। মুখস্থ থাকা সকল দোয়া-কালাম পড়তে পড়তে দ্রুত হাঁটছে রাসেল। হাতের টর্চলাইট একবারের জন্যও নেভাচ্ছে না। আবার ডানে বামে লাইটের আলোও ফেলছে না, সোজা রাস্তায় আলো ফেলে হাঁটছে। বিপত্তি ঘটল সেই কালভার্টের গোড়ায় এসে, লইজ্জাবাড়ির ভাঙায়। রাসেল কিন্তু সেদিকে তাকায়নি, এমনিতেই হঠাৎ চোখ চলে গেছে। কালভার্টের বাম পাশে ভরামুহুরী খালের পশ্চিম কিনারায়। এ কী! এ যেন সাক্ষাৎ যমদূত!
রাসেল সেদিকে আলো ফেলেনি। রাস্তার ওপর থেকে টুকরো আলো পড়েছে ধবধবে সাদা দেহের ওপর। এত শুভ্র সফেদ যে, রাসেল সেদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে না তাকালেও দৃষ্টি চলে গেছে। সাদা কাফনের কাপড় মোড়ানো একটি লাশ! কয়দিন আগে নেমে যাওয়া পাহাড়ি ঢলের নরম পলিমাটির ওপর শোয়ানো লাশটির দিকে টর্চলাইটের আলো ফেলার দুঃসাহস রাসেলের নেই। শরীরের সব শক্তি একত্রিত করে ‘আল্লাহ’ শব্দে আর্তচিৎকার করে দিলো দৌড়। তাও যেন স্বস্তি নেই। মনে হচ্ছে, লাশটি দাঁড়িয়ে গেছে এবং তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। সামনে লাইটের আলো এবং লোকজন দেখে রাসেলের সাহস ফিরে এলো। শাহ আলম সওদাগরের দোকানের সামনে গিয়ে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল।
সবাই রাসেলকে ঘিরে ধরেছে। একজন জগের সব পানি রাসেলের মাথায় ঢেলে দিলো। আরেকজন টিনের গ্লাসভর্তি পানি রাসেলের ঠোঁটের সামনে ধরেছে। সবাই জানতে চাচ্ছে, কী হয়েছে? রাসেল গ্লাসের সবটুকু পানি এক নিঃশ্বাসে শেষ করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। অস্ফুটে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলোÑ লাশ!
বারো বছরের বাচ্চা ছেলের মুখে লাশের কথা শুনে সবাই চমকে উঠল। মুরব্বিরা ভয় পেয়ে গেছে। উঠতি যুবকেরা চরম উত্তেজিত। লাশ? কোথায়? কার লাশ? রাসেলের দিকে একসাথে প্রশ্ন ছুটে এলো।
রাসেল কিছুটা সাহস সঞ্চয় করেছে। এখন স্পষ্টভাবে বলছে, একটি লাশ! সাদা কাফনের কাপড় মোড়ানো লাশ। লইজ্জাবাড়ির ভাঙায় পড়ে আছে!
রাসেলের কথায় সবাই তাজ্জব বনে গেছে। কেউ কেউ ভয় পেয়ে সটকে পড়ছে। কয়েকজন রাসেলের হাত ধরে টানতে টানতে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সবার হাতে টর্চলাইট আর লাঠি। এখন রাসেলের মনে আর কোনো ভয় নেই, বরং অ্যাডভেঞ্চার কাজ করছে। লাশের নেপথ্য কাহিনী জানতে হবে।
কালভার্টের কাছে পৌঁছার সাথে সাথে উত্তেজিত লোকজন চিৎকার করে বলছে, এই রাসেল! কই লাশ? কোন জায়গায় দেখেছিস? বল, কোন জায়গায় দেখেছিস?
রাসেল হাতের ইশারায় স্থান দেখানোর সাথে সাথে প্রায় এক ডজন লাইটের আলো ছুটে গেল লাশের শরীরে। তেরো জোড়া চোখ একসাথে দেখল, ছাল ছাড়ালো বড় একটি কলাগাছ খালের পাড়ে শুয়ে আছে। অট্টহাসির রোল পড়ে গেল লইজ্জাবাড়ির ভাঙায়। সবাই উচ্চস্বরে হাসছে। বড়দের সাথে সুর মিলিয়ে রাসেলও হাসছে। এটি তাহলে লাশ ছিল না!
সাভার, ঢাকা

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum