১৫ অক্টোবর ২০১৯

মুক্তি

চারাগল্প
-

এক ঘণ্টা আগে সানমুন রেস্টুরেন্টে এসে ইমরানের অপেক্ষায় বসে আছে রাখি। এই এক ঘণ্টায় প্রায় পাঁচবার কল করা হয়েছে ইমরানকে। প্রতিবারই ইমরানের কণ্ঠ, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার সামনে হাজির হবো লক্ষ্মীটি।’ কিন্তু সেই কিছুক্ষণ যেন আসছেই না। গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো যেন সহজে ফুরায় না। গুরুত্বপূর্ণ কাজেই রাখি আজ ইমরানকে এখানে ডেকেছে।
রাখির ফোন বাজছে। ইমরানের কল। রিসিভ করে রাখি। ওপার থেকে ইমরানের আহ্লাদি গলা, ‘গতবারে আমার জন্মদিনে তোমার দেয়া নীল পাঞ্জাবি পরে আসছি রাখি। এই মাত্র রিকশা পেয়েছি। ১০ মিনিটের মধ্যে তোমার সামনে হাজির হবো।’ রাখিকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লাইন কেটে দেয় ইমরান। ইমরানের কণ্ঠ শুনে রাখি বুঝতে পেরেছে, সে খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে। কিন্তু এখানে এসে যখন ইমরান দুঃসংবাদ শুনবে, তখন আর এই ফুরফুরে মেজাজ থাকবে না। হয়তো চোখের জলে ভেসেও যেতে পারে।
এই সানমুন রেস্টুরেন্টে রাখি ইমরানকে ডেকে আনার কারণটাও ভিন্ন। রাখি আজ সরাসরি ইমরানকে বলে দেবে, ‘আমার জীবন থেকে সরে গিয়ে আমাকে মুক্তি দাও।’ এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে রাখি আসলে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, রাখির অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তিন বছর ইমরানের সাথে সম্পর্ক। কিন্তু ইমরানের ফ্যামিলি রাখিকে মেনে নিতে বরাবরই অস্বীকৃতি জানায়। এত দিনে রাখি বুঝে নিয়েছে, ইমরানের ফ্যামিলি কখনো তাকে মেনে নেবে না। এই ইমরানের প্রতি রাখির একতরফা যে ভালোবাসা, এসব মূলত আবেগ। কিন্তু ভালোবাসা আর আবেগ এক জিনিস, বিয়ে আরেক জিনিস। ভালোবাসার ক্ষেত্রে আবেগকে প্রশ্রয় দেয়া গেলেও বিয়ের বেলায় দেয়া যায় না। বিয়ে সারা জীবনের চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাখি আজ এই সানমুন রেস্টুরেন্টে ইমরানের মুখোমুখি হবে। কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই বলবে, ‘আমাদের সম্পর্ক আজ এখানেই শেষ করে আমাকে মুক্তি দাও। রাসেল নামে এক ইউরোপ প্রবাসীর সাথে শুক্রবারে আমার বিয়ে। পরিবারের ইচ্ছানুসারে আমি যেমন অন্যকে বিয়ে করতে যাচ্ছি, তুমিও তোমার পরিবারের ইচ্ছানুসারে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিও। ব্যস, আমরা দুজনই মুক্ত হবো।’
কিন্তু ইমরান আসছে না কেন! ইমরানের কথা ভাবতে না ভাবতেই রাখির ফোনে ইমরানের কল। রিসিভ করার পর ওপার থেকে ইমরানের রিনরিনে গলা, ‘হ্যালো জান, বাজারের একটি ফুলের দোকানে এই শরতের কাশফুল বিক্রি হচ্ছে। ধুমছে কিনছে সবাই। আজকাল কাশফুলও দোকানে বিক্রি হয়। হা হা হা। তোমার জন্য কাশফুল কিনে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোমার সামনে হাজির হচ্ছি গো।’ রাখি জানায়, ‘আমার কাশফুল লাগবে না। তুমি জলদি আসো তো।’ ইমরানের আপত্তির গলা, ‘এই শরতে তোমাকে কাশফুল না দিলে আমাদের প্রেমকে অসম্মান করা হবে। হা হা হা।’ ইমরান হাসছে। কিন্তু বেচারা জানে না রাখি তাকে আজ কী একটি মন ভাঙানো সংবাদ শোনাবে।
২.
আধা ঘণ্টা পার হওয়ার পর এবার সত্যিই রাখির মেজাজ খারাপ হলো। ইমরানের আসার কোনো হদিস নেই। ডায়াল করে ইমরানের নম্বরে। কিন্তু ফোন বন্ধ। মানে কী! ফোন বন্ধ কেন ইমরানের। ফাজলামোর একটা সীমা আছে। জরুরি ব্যাপারগুলোতে এমন ফাজলামো সহ্য করা যায় না। বারবার ডায়াল করেও ওপার থেকে ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। শেষে অভিমান করে সানমুন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয় রাখি।
বাজারের একটি ফুল দোকানের সামনে জনতার ভিড় চোখে পড়ে রাখির। এগিয়ে যায় সে। একটি লাশ পড়ে আছে রাস্তায়। পুরো মাথাটাই থেঁতলানো। একটি ছেলেকে ঘটনা জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি জানায়, ‘পোলাটা কাশফুল কিনে ফুল দোকান থেকে বের হতেই ট্রাকের তলে পড়ে বেখেয়ালে। চাকাটা মাথার ওপর দিয়েই গেছে।’
কাশফুল! বুকটা ধক করে ওঠে রাখির। মাথা থেঁতলানো লাশের গায়ে নীল পাঞ্জাবি। এই পাঞ্জাবিটাই তো রাখি গতবার ইমরানের জন্মদিনে তাকে গিফট করেছে। তার মানে লাশটা কার! ওই তো, লাশের ডান হাতের পাশে পড়ে আছে কাশফুল। লাল রক্তের ছিপছিপে ¯্রােত সাদা কাশফুলের দিকে যাচ্ছে। ইমরানের নাম ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দেয় রাখি।
ইমরানের কাছ থেকে যে মুক্তি নিতে এসেছে রাখি, ট্রাকের তলে চাপা পড়ে সত্যি সত্যিই রাখিকে সেই মুক্তি দিয়ে ইমরান চিরদিনের জন্য, মুক্ত পাখি হয়ে পরকালে চলে গেছে। শুধু শরতের কাশফুলগুলো রাখিকে দিয়ে যাওয়া হলো না আর।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum