১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কে

চারাগল্প
-

রিপনের কাজ হলো ন্যাশনাল হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভ করা। লাশ বা রোগীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে আসে সে। ছয় বছর ধরে সে এই পেশায় নিয়োজিত। তার এবারের যাত্রাটা দূরের পথ। দূরের বললে ভুল হবে। অনেক দূরের পথ। অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে এই ঢাকা থেকে তাকে এখন নোয়াখালী যেতে হবে।
কর্তৃপক্ষের দেয়া ঠিকানানুযায়ী সে রওনা দিলো নোয়াখালীর উদ্দেশে। এখন দুপুর ১২টা। পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। সফরসঙ্গী হিসেবে সাইফুলের যাবার কথা থাকলেও বেচারা গত ক’দিন ধরে জ্বরে বিছানায় পড়ে আছে। তাই একাই রওনা দিলো রিপন। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে লাশ। ছেলেটার নাকি বয়স কম। আজ সকালে মারা গেছে। কী কারণে মারা গেছে রিপন জানে না।
ছয় বছর ধরে লাশের গাড়ি টানছে রিপন। আজকের মতো পথঘাট আর কখনো এতো জ্যামমুক্ত পায়নি সে। নোয়াখালীতে এই প্রথম যাচ্ছে রিপন। কর্তৃপক্ষের লিখে দেয়া ঠিকানাটা পকেট থেকে বের করে আরেকবার পড়ে নিলো। উপজেলা, থানা, পোস্ট-সব ভালো করে দেখে নিলো। আবদুল্লাপুর যাবে এই লাশ।
এরই মধ্যে ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লায় চলে এসেছে অ্যাম্বুলেন্স। যানজট কম বলে খুব অল্প সময়ে এখানে আসতে পেরেছে। এত বছর ধরে লাশের গাড়ি টানছে সে, কখনো ভয় লাগেনি। আজ তার কিছুটা ভয় ভয় লাগছে বলে দোয়া-দুরুদ পড়ে নিলো। লাশের সাথে নাকি তার আত্মা ঘোরাফেরা করে। ভয়টা কি সে কারণে? সাইফুল থাকলে এই ভয়টা লাগত না রিপনের, সে নিশ্চিত।
লাকসাম অতিক্রম করতেই তেইশ-চব্বিশ বছরের একটা ছেলে পথ আগলে দাঁড়ায়। অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে জানালার কাচ নামায় রিপন। ছেলেটি জানালার পাশে এসে বলেÑ ‘উপকার করো ভাই। আমার সব কিছু ছিনতাই হয়েছে। তোমার পাশের সিটে আমাকে জায়গা দেবে? সোনাইমুড়ি নেমে যাব।’ ছেলেটি বেশ ভদ্রভাবে কথাগুলো বলল বলে রিপন আর না করতে পারেনি। তার উপকার হলে সমস্যা কি! বিপদে তো পড়েছে ছেলেটা। ছেলেটা দেখতেও ভারি মিষ্টি। সব মিলিয়ে রিপন অজ্ঞাত এই যুবককে অ্যাম্বুলেন্সের সামনে সিটে বসতে দিলো।
ছেলেটা সিটে বসতেই অদ্ভুত এক পারফিউমের গন্ধ নাকে এলো রিপনের। বেশ ভালো ঘ্রাণ। ছেলেটা চয়েজ আছে, বলতেই হবে।
Ñকী নাম আপনার?
Ñফয়েজ।
Ñকিভাবে ছিনতাই হলো, খুলে বলেন তো!
Ñনা ভাই। এ ঘটনা আর ভাবতে চাই না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। সুমিকেও কিছু বলব না।
Ñসুমি কে?
Ñইয়ে মানে...। হা হা হা! সে আমার অপেক্ষায়। আমি সুমির কাছে যাচ্ছি। এই যে দেখুুুুুুুুুুুুুুুুুুুন শরতের কাশফুল, এটা সুমির জন্য। ওর কাশফুল বড় পছন্দের।
রিপন বুঝে গেল এই ছেলে কেবল প্রেমিক নয়, বেশ রোমান্টিকও। ওর মতো স্মার্ট ছেলেদের রোমান্টিক হতেই হবে। সুমির ভাগ্যটা বেশ ভালো।
Ñসুমির সাথে কত দিনের সম্পর্ক?
Ñহা হা হা।
Ñহাসলেন যে?
Ñ হা হা হা হা হা...।
Ñপ্লিজ এভাবে হাসবেন না। এটা লাশের গাড়ি।
Ñআমি জানি মিস্টার।
Ñকিভাবে জানেন?
Ñহা হা হা হা।
ফয়েজের অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর হাসি দেখে ভয় পেল রিপন। এভাবে অকারণে হাসার মানে কি? এটা কিন্তু অভদ্রতা।
Ñআপনি কি ভাবছেন, আমি জানি।
Ñকি?
Ñভাবছেন কেন আমি এভাবে অভদ্রের মতো হাসছি।
সেকি! ফয়েজ তো ভুল বলেনি। কিভাবে জানলো রিপন এখন ফয়েজের অভদ্র আচরণের কথা ভাবছে! দ্রুত বেগে ছুটে চলছে অ্যাম্বুলেন্স।
Ñথামুন থামুন।
Ñথামব কেন?
Ñসোনাইমুড়ি চলে এসেছে যে।
Ñও আচ্ছা।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামতে নামতে ফয়েজ আবার বিকৃত ভঙ্গিমায় হাসল। যাবার সময় একটু ধন্যবাদ দেয়া দূরের কথা, ফিরেও তাকাল না। হাতের কাশফুলগুলো যতেœ রেখে হনহনিয়ে চলে গেল। এই ছেলেকে যতটা ভদ্র ভাবা গেল, সে ততটা ভদ্র না। যত্তসব বিচিত্র মানুষ।
অ্যাম্বুলেন্স আবদুল্লাহপুর চলে এসেছে। বরকান্দাজ বাড়ির উঠোনে অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে অনেক শোকার্ত মানুষ। ভেতর থেকে প্রবীণ কয়েকগুলো গলার আহাজারিÑ‘বাপধন, কই গেলিরে।’ দুজন মাঝ বয়সের ভদ্রলোক অ্যাম্বুলেন্স থেকে লাশের বাক্স নামিয়ে খাটিয়ার সামনে নিয়ে যেতেই চারদিক থেকে কান্নার মাতম উঠল। বাক্সের ঢাকনা খুলে লাশ খাটিয়ায় রাখা হলো। লাশের দিকে তাকাতেই রিপনের মাথা ঘুরে উঠল। এ কাকে দেখছে সে? কে এই ছেলে? এ ছেলেই তো ছিনতাইকারির অজুহাত দেখিয়ে তার সাথে অ্যাম্বুলেন্সে করে সোনাইমুড়ি পর্যন্ত এসেছে। রিপন ভুল দেখছে না তো! নাকি তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে!
পনের-ষোল বছরের যে ছেলেটি রিপনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, রিপন তাকে জিজ্ঞেস করলÑ
Ñআচ্ছা এ ছেলেটা মারা গেল কিভাবে?
Ñসুমি নামে একজনকে ভালোবাসতো। রাতের আঁধারে এই শরতের কাশফুল নিয়ে সুমির সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় সুমির ভাইদের হাতে ধরা পড়ে। তারা ব্যাপক মারধর করে। অচেতন অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়। আজ মারা গেছে।
সুমি! কাশফুল! পথের সেই ফয়েজ নামের ছেলেটির সাথে এভাবে মিলে যাচ্ছে কেন? এটা কিভাবে সম্ভব?
Ñআচ্ছা এ ছেলেটার নাম কি?
Ñফয়েজ।
এবার সারা শরীর হিম হয়ে এলো রিপনের। ভীরু চোখে খাটিয়ার লাশের দিকে আবার তাকালো। ওই তো, হুবহু একই চেহারার পথের সেই ফয়েজ নামের ছেলেটি লাশ হয়ে শুয়ে আছে। একে একে পরিজনেরা লাশ দেখতে আসছে আর বিলাপ করে কাঁদছে। রাজ্যের ভয় এসে ঝেঁকে ধরল রিপনকে। একটা আত্মা তার সাথে সোনাইমুড়ি পর্যন্ত এসেছে!
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ