১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

  কাঁটা চারাগল্প

-

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের ৩০২ নম্বর কেবিনে জায়গা পাওয়াটা আমার জন্য ভাগ্যের বটে। শহরে ডেঙ্গু জ্বরের রোগী এতই বাড়ছে যে, হাসপাতালগুলোতে সমস্ত রোগী হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ৩০২ নম্বর কেবিনে আজ সাতদিন ধরে পড়ে থাকা শয্যাশায়ী রোগী আমি। স্ত্রী রেহানার বিশেষ সেবায় আমি মুগ্ধ। আমার সামান্য রোগ-শোকে রেহানা অস্থির হয়ে পড়ে। আমাদের বিয়ের সাত বছর চলছে। এখনো সন্তানের মুখ দেখিনি আমরা। ডাক্তার বলেই দিয়েছেন রেহানার মা হওয়ার সম্ভাবনা আর নেই।
এই মুহূর্তে আমার সমস্ত চিন্তা হাসপাতালের খরচ নিয়ে। না জানি এখানে আর কতদিন থাকা লাগে! যত দিন গড়াচ্ছে, খরচও তত বাড়ছে। এত টাকা কোথায় পাবো, বুঝতে পারছি না। আর্থিক সঙ্কটও আজকাল আমাকে ঝেঁকে বসেছে। তাই দুঃচিন্তার অন্ত নেই। খলিল ভাই চাইলেই এই বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু সে করবে না। দুনিয়ার লোভ-লালসা তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে কে তার আপন আর কে পর।
খলিল ভাই আমার বাবার বড় সন্তান। সে যখন কলেজে পড়ে, আমি তখন ১৫ বছরের কিশোর। ওই বয়সেই মা মারা যান যক্ষ্মায়। দ্বিতীয় বিয়ে ঘরে নতুন মা আনেন বাবা। সৎ মায়ের সাথে খলিল ভাইয়ের সম্পর্ক আদা-কাঁচকলায়। নতুন মাকে সহ্য করতে পারে না খলিল ভাই। একদিন মাগরিবের পর পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন আমাদের সৎ মা। সেই পুত্র সন্তানের নাম রাখা হলো আশিক। তার মুখের দিকে তাকালে যে কারোই মায়া লেগে যেত। কিন্তু মায়া লাগত না খলিল ভাইয়ের। আশিককে তার সহ্য না হওয়ার কারণ ছিল আমাদের বাবার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি। খলিল ভাইয়ের ধারণা, আশিক বড় হলে ওর মা আমাদের বাবাকে ভুলিয়ে বালিয়ে সমস্ত সম্পত্তি আশিকের নামে লিখিয়ে নেবেন। তাই খলিল ভাইয়ের প্রধান টার্গেট হচ্ছে আশিক নামক এই কাঁটাকে পথ থেকে সরিয়ে ফেলা। প্রায়ই সে আমাকে বলত, ‘আশিককে আদর যতেœ মাথায় তুলবি না। ও আমাদের পথের কাঁটা। বড় হলে ও তোকে আর আমাকে পথে বসিয়ে বাবার সব সম্পদ একাই খাবে।’
তারপর থেকে খলিল ভাইয়ের মতো আমিও আশিককে পথের কাঁটা ভাবতে শুরু করি। একদিন খলিল ভাই আর আমি ছোট্ট আশিককে পুকুরপাড়ে নিয়ে এলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আশিককে পুকুরের মধ্যখানে ছুড়ে ফেলা, যাতে সে ডুবে মরে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে খলিল ভাই খুব জোরে আশিককে পুকুরে ছুড়ে ফেলল। জানালা দিয়ে সৎ মা আমাদের এই অমানবিক কাণ্ড দেখে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়ে এসে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আশিককে বাঁচালেন। এই অপরাধের কঠিন বিচার করলেন বাবা। রাতে আমাদের দু’ভাইকে হাত-পা বেঁধে গরু পিটুনি দিলেন। পরদিন সকালে আশিককে নিয়ে ওর মা চিরদিনের জন্য বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার ধারণা, আশিক এখানে থাকলে যেকোনো সময় আমাদের দুই ভাইয়ের হাতে খুন হবে।
আশিক আর ওর মা সত্যি সত্যি চলে গেল। এই ঘটনায় খলিল ভাই সবার থেকে বেশি খুশি হয়েছে। তার পথের কাঁটা স্ব-ইচ্ছায় দূর হলো।
এক ভোরে বাবা মারা গেলেন। সংসারের হাল ধরতে বিয়ে করলেন খলিল ভাই। ভাই-ভাবীর সংসারে দিন দিন গৌণ হয়ে উঠি আমি। ভাবী সাফ জানিয়ে দিলেন, আমাকে রেঁধে বেড়ে খাওয়াতে পারবেন না। অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। একদিন জানতে পারি, খলিল ভাই আমার ভাগের সব সম্পত্তি নিজের নামে দলিল করে লিখে নিয়েছে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে একদিন মুখোমুখি দাঁড়াই খলিল ভাইয়ের। আমার পাওনা সম্পত্তি তো দেয়ইনি, বরং গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় বাড়ি থেকে।
জীবনের কাছে অসহায় হয়ে পড়ি আমি। অসহায় জীবনে আলো জ্বালাতে আসে রেহানা। সংসার বাঁধি আমরা।

২.
ডেঙ্গুজ্বর থেকে খানিক এখন সুস্থ আমি। টেনশন বাড়ছে। এই সাতদিনের হাসপাতালের খরচ কিভাবে মেটাব! ফেসবুক খুললাম। গতকাল সকালে ফেসবুকে আমার রোগের সুস্থতার দোয়া চেয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। কোন হাসপাতালে আছি, সেটাও লিখে দিলাম। অনেকে এখানে কমেন্ট করে শুভ কামনা রেখেছেন।
দুপুরে এক তরুণ ছেলে হাসপাতালে এসেছে আমাকে দেখতে। পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমি আপনার ফেসবুকের মানুষ। অনেকদিন থেকে ফেসবুকে আপনার সাথে আছি। ‘মেঘ বালক’ আইডিটা আমার। ওটা ফেসবুকের ছদ্মনাম। আমার রিয়েল নাম আশিক। আমি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা।’
আশিক নামটা শুনে বুকটা ধক করে উঠল। সম্ভবত আমার অনুভূতি বুঝতে পেরে সে ক্ষীণ গলায় বলল, ‘ভাইজান, আমি আপনার বাবার দ্বিতীয় সংসারের সেই আশিক। আপনাকে অনেক আগেই ফেসবুকে পেয়েছি। ইচ্ছা করেই পরিচয় দেইনি। ফেসবুকে আপনার ডেঙ্গুজ্বরের পোস্ট দেখে আজ দেখতে এসেছি।’
এ কোন সত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি! এই ছেলে আশিক! আমার মাথাটা ঘুরে উঠল। আশিককে জড়িয়ে ধরে অঘোরে কাঁদতে লাগলাম।
ওকে সবকিছু খুলে বললাম। খলিল ভাইয়ের আমার সাথে প্রতারণা, আমার দুর্বিষহ জীবনের ঘটনা শুনে আশিক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। একজন নার্স এলো ওষুধ নিয়ে। আশিক নার্সকে ডেকে বলল, ‘আমার ভাইয়ের চিকিৎসায় এখানে যত টাকা খরচ হয়েছে, সব হিসাব দেন। আমি পরিশোধ করব।’
আশিকের এই উদারতায় আমি আবার কেঁদে দিলাম। সান্ত্বনা দিয়ে সে বলল, ‘আপনাকে আর ভাবীকে আজই এখান থেকে নিয়ে যাবো। আপনারা এখন থেকে আমার কাছে থাকবেন। আমাদের জন্ম ভিন্ন ভিন্ন মায়ের গর্ভে সত্যি, কিন্তু শরীরে তো একই বাবার রক্ত বইছে।’ আশিকের কথায় আমার কান্নার গতি বাড়ছে। খলিল ভাইয়ের অনৈতিক শলা-পরামর্শে যাকে একদিন কাঁটা ভেবে পথ থেকে সরাতে চেয়েছি, আজ সেই কাঁটা এই হাসপাতালে এসে আমার পায়ে বিঁধে যেতে চাইছে সুখের রক্ত ঝরাতে। খলিল নামের ফুল আমার জীবন থেকে ঝরে গেছে, আর আশিক নামের কাঁটা এসেছে জীবনের এই বিপন্ন বেলায়। না না, আশিক কাঁটা নয়। ওকে কাঁটা ভাবলে বড্ড পাপ হবে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ

ফাঁসির রায় শুনে আসামি হাসে বাদি কাঁদে (১১৮৭৬৬)শোভন-রাব্বানীকে নিয়ে ঢাবি অধ্যাপকের ফেসবুক স্ট্যাটাস (৪৮৭৫২)নতুন ভিডিও : রক্তাক্ত রিফাতকে মিন্নি একাই হাসপাতালে নিয়ে যান (৩২২৫১)শোভনকে নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা মামুনের ফেসবুক স্ট্যাটাস (২৭১৯০)খালেদা জিয়া আলেমদের কিছু দেননি, শেখ হাসিনা সম্মানিত করেছেন : আল্লামা শফী (১৮০১৫)ওমরাহর খরচ বাড়ছে, সৌদি ফি নিয়ে ধূম্রজাল (১৭১৩৭)পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হলে দিলিপ ঘোষকে যশোহর পাঠিয়ে দেবো (১৬৮৮৩)এবার আমিরাতের জাহাজ আটক করলো ইরান (১৩৩৭২)‘মানুষকে যতটা আপন মনে হয় ততটা আপন নয়’ (১৩১৮০)নতুন ভিডিও : রক্তাক্ত রিফাতকে মিন্নি একাই হাসপাতালে নিয়ে যান (১২৮২২)