film izle
esans aroma Umraniye evden eve nakliyat gebze evden eve nakliyat Entrumpelung wien Installateur Notdienst Wien
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মধ্যাহ্ন

ঈদ আয়োজন
-

চাকরির প্রথম বেতনে পরিবারের সবার জন্য এবারের ঈদে কেনাকাটা আমিই করেছি। আব্বার জন্য সাদা পাঞ্জাবি, আম্মার জন্য শাড়ি, রকির জন্য শার্ট-প্যান্ট, রিমের জন্য থ্রিপিস, আমার আর জাবেদ ভাইয়ার জন্য একই রকম নীল পাঞ্জাবি। এসব কেনাকাটা দেখে আম্মা খুশি হলেও আপত্তির সুরে বললেন, ‘জাবেদের জন্য এত দামি পাঞ্জাবি কিনেছিস কেন? এটা ওকে দেয়া হবে না।’ আম্মার কথায় আমার মন খারাপ হলো। আম্মা জাবেদ ভাইয়াকে সহ্য করতে পারেন না। সমস্যা একটাইÑ জাবেদ ভাইয়া তার পেটের সন্তান নয়। আব্বার প্রথম সংসারের একমাত্র ছেলে। কালসাপের দংশনে আব্বার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে আমাদের আম্মাকেই করেন। পরের সংসারে আমি, রকি আর রিম।
আমরা যখন ছোট ছিলাম, জাবেদ ভাইয়া তার হৃদয়ের সবটুকু স্নেহ আমাদেরকে বিলিয়ে দিতে কখনো অবহেলা করেননি। পুকুরে সাঁতার শেখানো, মাঠে গিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, আমাদের জামা ধুয়ে দেয়াÑ এসবে জাবেদ ভাইয়ার তুলনা হতো না। শৈশবে দেখতাম আম্মা জাবেদ ভাইয়াকে সব সময় অকারণে বকাঝকা করতেন। সংসারের কঠিন কাজগুলো তাকে দিয়েই সারাতেন। গাছের নারিকেল-সুপারি পাড়া, গোয়ালের গোবর পরিচ্ছন্ন করা, হাঁস-মুরগি ও খোপের কবুতরকে নিয়মানুসারে খাবার দেয়াÑ এ কাজগুলো আম্মা জাবেদ ভাইয়াকে দিয়েই করাতেন। তার পরও দুপুরে খেতে বসলে জাবেদ ভাইয়ার প্লেটে মাছের সবচেয়ে ছোট টুকরোটি পড়ত। পুরনো ময়লা ফুলহাতা শার্ট পরা জাবেদ ভাইয়ার জন্য কখনো নতুন জামা কেনা হতো না। এসব চিত্র দেখতে দেখতে যেদিন প্রথম জানলামÑ এ মানুষটি আমাদের সৎভাই, সেদিন অঘোরে কাঁদলাম।
আমার নানাজান জমিদার ছিলেন না। তার পরও আম্মার আচরণ বেশির ভাগ সময় ছিল জমিদারের মেয়ের মতো। আম্মাকে আমরা ভয়ও পেতাম। আমরা যখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছি, আম্মা একদিন আমাকে, রকিকে আর রিমকে ডেকে চুপি চুপি বললেন, ‘জাবেদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবি। ও তোদেরকে পানিতে ডুবিয়ে মারবে। তোরা মরে গেলে তোদের বাবার সমস্ত সম্পত্তি ও একাই দখল করবে। জাবেদ খুব চালাক।’
আম্মা তার এই যুক্তিহীন কথার মধ্য দিয়ে আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কেন জানি মনে হতো জাবেদ ভাইয়া আমাদের তিন ভাইবোনকে একদিন চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে কোনো এক নদীর তীরে নিয়ে যাবেন। তারপর সুযোগ বুঝে নদীতে ধাক্কা মেরে দৌড়ে পালাবেন। পেয়ে যাবেন সবটুকু পৈতৃক সম্পত্তি। জানি, আম্মার শেখানো এই পরামর্শ ভিত্তিহীন এবং আমাদের জাবেদ ভাইয়া এমন নন। তার পরও সেই দিনের পর থেকে জাবেদ ভাইয়াকে আমার খানিক ভয় লাগত।
২.
আজ ঈদের দিন। আম্মা সত্যি সত্যিই জাবেদ ভাইয়ার জন্য আমার কিনে আনা নীল পাঞ্জাবিটি তাকে দেননি। পুরনো জামা গায়ে দিয়ে জাবেদ ভাইয়া ঈদগায় চলে গেলেন।
শেষ হলো ঈদের নামাজ। নামাজ শেষে যখন বন্ধুদের সাথে কোলাকুলি করছি, জাবেদ ভাইয়া পাশ থেকে এসে বললেন, ‘আয় ভাই, কোলাকুলি করি।’ আমরা দুই ভাই কোলাকুলি করলাম। জাবেদ ভাইয়া বললেন, ‘পাঞ্জাবিটা তোকে খুব মানিয়েছে।’ আমি জাবেদ ভাইয়ার গায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। পুরনো ফুলহাতা শার্টে জাবেদ ভাইয়ার মুখটা বড় মলিন দেখাচ্ছে। আম্মা কাজটি ঠিক করেননি। জাবেদ ভাইয়াকে পাঞ্জাবিটি দেয়া উচিত ছিল। জাবেদ ভাইয়া বললেন, ‘চল বাড়ি যাই। গরু জবাই করতে হুজুর হয়তো চলে এসেছে।’
আমরা দুই ভাই বাড়ি যাচ্ছি। পথে এক টং দোকান দেখে জাবেদ ভাইয়া বললেন, ‘চা খাবি? লাল চা!’ নত গলায় বললাম, ‘খাবো।’
অনেক দিন পর লাল চা খেলাম। জাবেদ ভাইয়া যখন চায়ের দাম পরিশোধ করছেন, আমার চোখ ভিজে এলো। যে ভাই এত যতœ আর পরম ভালোবাসায় আমাকে লাল চা খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে তার বুকের সব স্নেহ-সোহাগ ঢেলে দিতে জানেন, সে ভাই কি কখনো সম্পদের লোভে আমাকে পানিতে ডুবিয়ে মারতে পারবেন! পারবেন না। আম্মা এ কথা বোঝেন না কেন?

৩.
গরু জবাই, গোশত কাটাকাটিসহ সব কাজ শেষ হতে হতে সময় যখন মধ্যদুপুর, জাবেদ ভাইয়া খুব দক্ষতার সাথে পুরো কাজে ভূমিকা রাখলেন। রসইঘরে রিম আর আম্মা চালের রুটি বানানোতে ব্যস্ত। গরু জবাইয়ের জায়গাটুকু পানি দিয়ে পরিষ্কার করে জাবেদ ভাইয়া এখন পুকুরে নামবেন গোসল করতে। গোসল সেরে হয়তো অন্য কোনো পুরনো জামা আবার গায়ে দেবেন।
আম্মাকে গিয়ে বললাম, ‘জাবেদ ভাইয়ার জন্য যে পাঞ্জাবিটা এনেছি, ওটা বের করে দেন। ভাইয়া পরবে।’ আম্মা ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, ‘এত দামি পাঞ্জাবি জাবেদ পরার দরকার নেই। ওটা আমার বোনের ছেলে রনির জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি।’
জাবেদ ভাইয়া পুকুরে গোসলে ব্যস্ত। যতœ করে গায়ে সাবান মাখলেন, মাথায় শ্যাম্পু করলেন, ডুব দিলেন অনেকগুলো। মধ্যদুপুরে জাবেদ ভাইয়ার এই গোসল করাটা কেন জানি এক অপূর্ব দৃশ্য হয়ে আমার চোখে ধরা দিলো। এখনই তিনি পুকুর থেকে উঠে লুঙ্গি পরে সোজা ঘরে গিয়ে পুরনো শার্ট পরবেন। অথচ তিনি জানেনই না তার জ্েযও এবারের ঈদে পাঞ্জাবি কেনা হয়েছে। নীল পাঞ্জাবি। ভাগ্য তাকে সেই নীল পাঞ্জাবি পরতে দেয়নি।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 


আরো সংবাদ