২২ আগস্ট ২০১৯

শ্রাবণের বাদলা দিনে

চারাগল্প
-

শ্রাবণের আজ প্রথম দিন। ভোর হতেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। নাহিদ ঘুমোচ্ছিল। বৃষ্টির শব্দে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টির নৃত্য চলছে। জানালার গ্লাস বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির জল। প্রবল বর্ষণে বান ডেকেছে ঢাকার রাস্তায়। শ্রাবণের প্রথম দিনটি নাহিদের খুব প্রিয়। কারণ বছরে এই একটা দিন কেয়ার সাথে দেখা হয়। দিনটা বেশ ভালোই কাটে। মনটা হালকা হয়। আজো যাবে দেখা করতে। কিশোরগঞ্জের পল্লী গাঁয়ে। কেয়ার নির্মল ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে। দেরি না করে তৈরি হয়ে নিলো। ছাতা হাতে পা বাড়াল বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া রাস্তায়। বাস স্টপে এসে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সকাল সকাল বৃষ্টি হওয়ায় যাত্রী নেই তেমন। খানিক বাদে বাস এলে জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসল। বন্ধ জানালার বাইরে প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। কৃষ্ণাভ আকাশ থেকে নিরন্তর ধারাবাহিক নিñিদ্র ফুল হয়ে জমিনে পড়ছে বৃষ্টি। জানালর কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। বৃষ্টি নামলেই নাহিদের চারপাশে কেয়ার স্মৃতিগুলো ডানা মেলে উড়তে থাকে। এই বৃষ্টিভেজা বর্ষা কতই না প্রিয় ছিল কেয়ার! আনমনা হয়ে সে হারিয়ে যায় অতীতে। এমনই বর্ষণমুখর দিনে নাহিদ পেয়েছিল কেয়াকে।
সবে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে একটা চাকরির জন্য এদিক ওদিক ঘুরছিল নাহিদ। তখনই তার বাল্যকালের শিক্ষক এখলাস উদ্দিন স্যার তাদের গ্রামের স্কুলের শিক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান নাহিদকে। আশা ছিল ভালো কোম্পানিতে জব করার। কিন্তু প্রিয় স্যারের অনুরোধ ফেলতে পারেনি। ভোরের ট্রেনে চড়ে রওনা হয়ে গেল এখলাস স্যারের গ্রাম কিশোরগঞ্জের কালির হাটে। দুপুরে যখন ট্রেন থেকে নামে, তখন ঝুম বৃষ্টি। ছাতা ফুটিয়ে স্যারের বাড়ির দিকে পা বাড়াল। গ্রামের ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে মেঠোপথ। লতাগুল্মের গা চুইয়ে পড়ছে স্বচ্ছ বৃষ্টির পানি। কর্দমাক্ত পথে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছে নাহিদের। চারপাশে বৃষ্টির রিনিঝিনি ছন্দে রোমাঞ্চ এসে ভর করল মনে। বৃষ্টির সাথে আলিঙ্গন করতে ছাতাটা বুজিয়ে দিলো সে। কি যে আনন্দ লাগছে! ভাবছে এই রোমাঞ্চকর মুহূর্তে কোনো আহ্লাদী কিশোরীর সাথে দেখা হয়ে গেলে বৃষ্টির দিনটা সার্থক হতো। হঠাৎ কোথা থেকে কোনো রমণীর খিলখিলিয়ে রিনিঝিনি হাসির আওয়াজ ভেসে এলো। ঝোপঝাড় পেরিয়ে হাসির উৎস খুঁজতে লাগল নাহিদ। সামান্য এগিয়ে দেখল, বড় একটা কদম গাছের নিচে শান বাঁধানো দীঘিতে নেমে ১৬ বছর বয়সের একটা কিশোরী ছোট আরেকটা মেয়ের সাথে খেলা করছে। পানিতে নাচন তুলে একজন আরেকজনের দিকে পানি ছোড়াছুড়ি করছে। তাদের এই আনন্দে চারপাশের পারিবেশটা যেন আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। মেয়েটার চুল বেয়ে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির পানি। মটির পৃথিবীতে এমন সুন্দর দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। হঠাৎ মেয়েটা নাহিদকে দেখে লজ্জায় উঠে দৌড়ে চলে গেল। নাহিদ অপলক তাকিয়ে রইল মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে।
এখলাস উদ্দিন স্যার নাহিদকে দেখে খুব খুশি হলেন। এতদিন পর বাল্যকালের প্রিয় স্যারকে পেয়ে নাহিদের মনটাও আনন্দে ভরে উঠলো। এখলাস স্যার গ্রামের স্কুল থেকে রিটায়ার করে নাহিদকে তার স্থানে বসিয়ে দিলেন। এখন থেকে এ বাড়িতেই থাকবে নাহিদ। আলাপচারিতার এক ফাঁকে এখলাস স্যার ঘরে গিয়ে চা দিতে বলে এলেন। একটু পর চায়ের পেয়ালা হাতে নাহিদের পাশে এসে দাঁড়াল একটা মেয়ে। নাহিদ চোখ তুলে দেখে কদম তলার পুকুরে দুষ্টুমি করা সেই মেয়েটি। তার কাজলকালো চোখ দেখে নাহিদ আবারো প্রেমে পড়ে গেল। মেয়েদের চোখ এত সুন্দর হয়! এই প্রথম মেয়েটিকে ভালোভাবে দেখল সে। কাচ ভাঙা সফেদ দাঁতের মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। এখলাস স্যার মুচকি হাসি দিয়ে নাহিদকে বললেন, ‘ওর নাম কেয়া। আমার বড় ভাইয়ের মেয়ে। জন্মের সময় মা মারা যায়। দু’বছর আগে বাবাও মারা গেলে আমার এখানেই থাকে। খুব লাজুক হয়েছে। কথা বললেই বুঝতে পারবে।’
নাহিদের মনে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করল। পল্লী গাঁয়ে এসে এত সুন্দর একটা কিশোরীর দেখা পেয়ে যাবে, ভাবেইনি কখনো। কেয়াকে পড়ানোর দায়িত্ব এসে পড়ল নাহিদের ঘাড়ে। কেয়া সবে নাইনে উঠেছে। স্যার বলে দিয়েছেন, এসএসসিতে কেয়াকে পাস কারানোর দায়িত্ব নাহিদের। স্যারের আদেশ পালনার্থে কেয়াকে পড়াতে শুরু করল? এর সাথে সাথে কেয়ার মন জয় করার চেষ্টাও করতে লাগল আপ্রাণ। গ্রামের মেয়েদের মন নিতান্ত সহজ-সরল হয়। তাই কেয়ার মন বাগে আনতে বেশি দিন শ্রম দিতে হয়নি নাহিদকে। অল্পতেই নাহিদের প্রেমে পড়ে গেল কেয়া। শুরু হলো তাদের গোপন প্রেমাভিসার। রাগ-অভিমান আর দুষ্টুমিভরা নাহিদদের প্রেমের তরী এগোচ্ছে একটু একটু করে।
বাসের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে স্মৃতির জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরল নাহিদ। বাইরে তাকিয়ে দেখে কিশোরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে বাস দাঁড়িয়ে। তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নামল। দেরি হলে কেয়া আবার প্রচণ্ড রেগে যায়। ফুটপাথের পাশের দোকান থেকে কয়েকটা কালো গোলাপ কিনে নিলো। কালো গোলাপ কেয়ার খুব পছন্দ। নিয়ে না গেলে গাল ফুলিয়ে থাকবে। ছাতা মাথায় ফুটপাথে কদম বাড়াল। প্রবল বর্ষণ ছাতার ওপর নৃত্য করছে। মূল রাস্তা ছেড়ে নেমে এলো গ্রামের মেঠোপথে। চারপাশটা নির্জন। কেবল বাঁশঝাড়ে বৃষ্টি পড়ার মৃদু ছন্দ হচ্ছে। এই তো প্রায় এসে গেছে। বড় কদম গাছটার কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় নাহিদ। এই গাছের নিচে তিনটে বছর ধরে চিরদিনের জন্য শুয়ে আছে কেয়া। কেয়ার কবরের দুর্বাঘাসে কদম ফুলের পাপড়ি গাছ থেকে ঝরে পড়ে ছড়িয়ে আছে। কবরের নরম মাটি বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। গোলাপগুলো কবরের ওপর রেখে হু হু করে কেঁদে ওঠে নাহিদ। ওর কান্নার আওয়াজ বৃষ্টির আওয়াজের সাথে মিলে একাকার হয়ে যায়। বাদলা দিনে কেয়ার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নাহিদের মনটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। যেদিন কেয়া মারা যায়, সেদিনও ছিল শ্রাবণের প্রথম দিন। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল সেই সকাল থেকে। মাঝে মধ্যে আকাশ কাঁপিয়ে বাজ পড়ছিল। এই ঘোরলাগা বর্ষায় কেয়ার সাথে ভিজতে নাহিদের খুব ইচ্ছে করছিল। কেয়াকে গিয়ে ইচ্ছের কথাটা বলতেই কেয়াও রাজি হয়ে গেল অকপটে। কেউ যেন বুঝতে না পারে এ জন্য কেয়া নাহিদের একটু আগে গিয়ে দাঁড়ায় পুকুরের বড় আমগাছটার নিচে। কেয়া নাহিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। হঠাৎ বড় একটা বজ্রপাত হয় কদম গাছের ওপর। বিকট শব্দে সাথে সাথে সেখানেই মারা যায় কেয়া। নাহিদ তখন কেয়া থেকে একটু দূরে ছিল। অল্পের জন্য সে বেঁচে যায়। জায়গাটা কেয়ার খুব পছন্দ হওয়ায় সেখানেই তাকে কবর দেয়া হয়। কেয়ার মৃত্যুশোকে নাহিদ পাগলের মতো হয়ে যায়। একটু স্বস্তি পেতে চিরদিনের জন্য কিশোরগঞ্জ ছেড়ে চলে আসে ঢাকায়। তবে প্রতি বছর শ্রাবণের প্রথম দিনটিতে কেয়ার কবরের কাছে যায়। মিছেমিছি কথা বলে। এরপর আবার ভগ্ন হৃদয়ে চলে আসে। সাথে নিয়ে আসে কেয়ার সাথে কাটানো জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর স্মৃতি আর একরাশ কষ্ট।
নাহিদের চোখের পানি বৃষ্টির পানির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধার নামতে শুরু করেছে চারপাশে। নাহিদ উঠে দাঁড়াল। এলোমেলো পায়ে চলতে শুরু করল গন্তব্যে।
টঙ্গী, গাজীপুর।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet