১৭ জুলাই ২০১৯

মাধুরী বণিকের পাঠশালা

মাধুরী বণিক পাঠদান করছেন পাঠশালার শিক্ষার্থীদের -

বায়ান্ন বছর আগে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বাংলা বর্ণমালা ও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠদান শুরু করেছিলেন মাধুরী বণিক নামে তরুণী। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে মাধুরী বণিক ষাটোর্ধ্ব এক নারী। জীবনের পুরোটাই ব্যয় করেছেন শিশুদের শিক্ষায়। সমাজের অনেকের কাছেই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তি মাধুরী বণিক। গাছতলা কিংবা ঘরের উঠানে কোমলমতি শিশুদেরকে নিরলসভাবে পাঠদান করে যাচ্ছেন। মাধুরী বণিকের জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পানালিয়া গ্রামে। সেই সময়ে রক্ষণশীল এক পরিবারে জন্ম মাধুরী বণিকের। মাধুরী বণিকের পরিবারের সবাই ছিলেন শিক্ষিত। তিনি তখন নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। মাধুরী বণিক স্কুলে আসা-যাওয়া করলেও পানালিয়া গ্রামের তাঁত অধ্যুষিত এলাকার ছেলেমেয়েরা দারিদ্র্যের কশাঘাতে স্কুলে যেতে পারত না। ছোট্ট বয়সেও সমাজের যে বৈষম্য তা তার চোখে ধরা পড়ে। একদিন মাধুরী বণিক তার মাকে বলল, আমাদের বাড়ির আশপাশে শিশুরা কেউই স্কুলে যায় না। আমি ওদেরকে বাড়িতে পড়াব। মাধুরী বণিকের মা মিলন বণিক তাকে বলেছিলেন, তোমার পড়াশোনার পাশাপাশি তুমি যতটুকু সময় পাও সে সময়টাতে তুমি শিশুদের পড়াবে। মায়ের কথা অনুযায়ী, ১০ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়ে নিজঘরের উঠানে পাঠশালার যাত্রা করেন তিনি, যার নাম দেয়া হয় মা ও শিশু শিক্ষা কেন্দ্র। যেখানে শিশুদের পাশাপাশি নিরক্ষর মায়ের অক্ষরজ্ঞান শেখানো হয়। এই পাঠশালায় অনেক মা-ই শিশুদের পাশাপাশি নিজেরা নিরক্ষরমুক্ত হয়েছেন।
মাধুরী বণিকের পাঠশালার কার্যক্রম কেবল নিজ উঠানের সীমাবদ্ধ থাকেনি। দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছেন। বর্তমানে নবাবগঞ্জ উপজেলার চারটি অস্থায়ী কেন্দ্রে পানালিয়া, সমসাবাদ, কাসেমপুর ও যন্ত্রাইলে, দোহার উপজেলার দু’টি অস্থায়ী কেন্দ্রে খাড়াকান্দা ও দক্ষিণ জয়পাড়া এলাকায় পাঠদান চালু রয়েছে। তিনি কোনো নৌকার মধ্যে ১০ জন শিশুকে দেখতে পান, সেখানে তিনি তাদের বর্ণমালা শেখানোর উদ্যোগ নেবেন। প্রতিদিনই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ছুটতে হয় তার স্কুলে। সপ্তাহে পাঁচ দিন ছোট্ট শিশুদেরকে পাঠ দিয়ে থাকেন। কেবল পাঠদানই নয়, নীতি-নৈতিকতার শিক্ষাও দিয়ে থাকেন তার স্কুলের শিশুদের। তিনি জানান, মানুষ সকালে পয়সার জন্য ছোটে, আমি বিনে পয়সায় আমার শিক্ষকতা শুরু করি। তার একার পক্ষে পাঁচটি কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয় বলে তার প্রতিষ্ঠানে অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের পাঠদান করাচ্ছেন। শিশুরা যাতে তার স্কুলে আসতে উৎসাহী হয়, এ জন্য তিনি শিশুদের চকলেট, বিস্কুট ইত্যাদি দিয়ে থাকেন।
বর্তমানে মাধুরী বণিকের বয়স ৬৪ বছর। জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়ান এ গ্রাম থেকে সেই গ্রামে আর এভাবেই কাটে সকাল থেকে সন্ধ্যা। পাঠশালায় ধ্যান, জ্ঞান, মননশীলতাকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন; যে কারণে নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়ও হয়নি তার। ব্যতিব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটানোর জন্য ঘর-সংসার করার কথাও ভুলে গিয়েছিলেন। কখন যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে পরিণত হয়েছে, সেদিকে কোনো খেয়ালই ছিল না। সঙ্গত কারণেই ঘর-সংসার করা হয়ে ওঠেনি।
মাধুরী বণিকের স্কুলের বৈশিষ্ট্য হলো, ঘরের উঠান কিংবা কোনো গাছতলা। মনের আনন্দে ছোট শিশুরা স্কুলে আসে। এখানে প্রতিদিনই ক্লাস শুরুর আগে বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শপথবাক্যও পাঠ করানো হয়। শেখানো হয় নীতি-নৈতিকতা। আচার-আচরণ সম্পর্কে দীক্ষা দেয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে দেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে শিশুরা নিজেকে গড়ে তুলতে পারে।
আজ থেকে ৫২ বছর আগে যেভাবে শুরু করেছিলেন সেভাবেই চলছে তার স্কুল। ঝড়বৃষ্টি উপক্ষো করে পাঠশালার কার্যক্রম চালু রেখেছেন। একটা সময় অনেকের ঘরের উঠানের সামনেও পড়ানোর অনুমতি মিলত না। তখন বিষণœ মন নিয়ে সময় পার করতে হতো। এতেও তিনি কখনো মনোক্ষুণœ হতেন না। কারণ তিনি যে দায়িত্ব নিয়েছেন, সেটিকে বড় মনে করতেন। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এলাকায় মানুষের কাছে মাধুরী বণিক একজন আদর্শ মানুষ। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ উন্নয়নের কাজ করেছেন বলেই তার এই মর্যাদা। সমসাবাদ এলাকার স্বর্ণালী বেগম নামের এক অভিভাবক বলেন, আমার সন্তান নবাবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি আমি আমার সন্তানকে মাধুরী খালার স্কুলে পড়তে দেই। এখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিশুদেরকে নৈতিক শিক্ষাও দেয়া হয়।
মাধুরী বণিকের শিক্ষার মূলমন্ত্র হচ্ছেÑ মানুষ হও, সফল মানুষ হও এবং নিবেদিত মানুষ হও। এ তিনটি গুণ যে মানুষের মধ্যে থাকবে, দেশ ও জাতির কল্যাণ তার থেকে আশা করা যায়।
মাধুরী বণিক জানান, আমি আমার মেধা ও শ্রম দিয়ে মানুষকে ভালো দীক্ষা দিয়েছি। আজকে আমার হাতে গড়া অনেক ছাত্রছাত্রী দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তাদের গৌরবের কথা শুনে আমার বুক ভরে যায়। তারা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে। টাকা-পয়সা দিয়ে সম্মান কেনা যায় না। সম্মানের জন্য কাজ করতে হয়। টাকা হলেই সব কিছু হয় না। আমার জীবনের সাধনা। জীবনে আমি আমার নিজের মতো কিছুই ভাবিনি। এখন সবগুলো স্কুল ভাসমান অবস্থায় চলছে। স্থায়ী একটা ঠিকানা হওয়া দরকার। যেখানে রোদ-বৃষ্টি হলেও শিশুদের পড়াতে কোনো অসুবিধা না হয়। আমি এক সময়ে না থাকলে আমার সৃজনশীল কর্ম যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন করছি। প্রধানমন্ত্রী যেন অন্তত আমাকে একটি ভবন করে দেন, যেখানে স্থায়ীভাবে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করার সুযোগ পাবে। এটাই আমার জীবনের শেষ চাওয়া।

 


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi