১৭ জুলাই ২০১৯

বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা

চারাগল্প
-

আষাঢ়ের সন্ধ্যা। আকাশে মেঘের গুরুম গুরুম ডাক শুনতে পাচ্ছি। একটু পরপর বিজলি চমকাচ্ছে। মা তাড়াতাড়ি উঠান ঝাড়– দিয়ে গুঁড়াগুলো পাক ঘরে নিচ্ছেন, তার কপাল ঘামছে। সারাদিনের পরিশ্রমে মাকে আজ বেশিই ক্লান্ত মনে হচ্ছে। তিনি বলছেনÑ কই রে মেহরাব? তোর আয়েশা ফুফুর ঘর থেকে হারিকেনডা ধরাইয়া নিয়া আয় বাবা আমার।
আনছি মা, বলেই ফুফুর ঘরে গেলাম। ফুফুর জ্বর দুদিন ধরে। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আমি ডাকলে আস্তে আস্তে উঠে বসে সে।
Ñকিরে মেহরাইব্বা?
Ñফুফু হারিকেনটা ধরিয়ে দাও।
Ñতর মা কি করে?
Ñমা, ভাত রানধে।
Ñও (হারিকেন ধরাতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে)। হারিকেন দিয়ে সোজা বডুগ (পড়ার ঘর) ঘরে চইল্লা যাবি কেমন।
Ñআইচ্ছা।
Ñনে, (হাতে একটা পাকা আম দিয়ে) এটা তোর দাদার গাছের আম, আষাঢ় মাসে পাকে। কারোরে দেখাইছ না। এখন আমাদের ঘরে আইছও না কিয়ারে?
Ñআসব ফুফু। সন্ধ্যায় ছিমের বিচি আর চাউল বাইজ্জা দিবা ফুফু?
Ñআইচ্ছা দেমু, তবে পড়া শেষ করার পরে।
তখনো আমি বুঝে উঠতে পারিনি, আমার মা-বাবা দাদার সংসার থেকে আলাদা (আমাদের গ্রাম্য ভাষায় ভিন্ন) হয়ে গেছে। আমি আগে দাদার ঘরে গেলে কত আদর-যতœ পেতাম। এখন তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। দাদা-দাদী ঠিক আগের মতো আছে, কাকারা আর রেনু ফুফু কেমন করে জানি কথা বলে। আমার খুব খারাপ লাগে। আগে সবাই ভাত খাওয়ার জন্য বলত, এখন বলে না। এখনো দাদা-দাদীর সাথেই ঘুমাই। ঠিক খাওয়ার আগ মুহূর্তে আমি গিয়ে হাজির হতাম। কেউ না সাধলেও শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতাম কেউ যদি সাধে ভাত খেতে! আহারে কি যে স্বাদ ছিল সবার সাথে খাওয়ার সে খাবারে। যা কোনোদিনও ভোলা যাবে না।
মা এখনো পাকঘরে। আমার খুব খিদে লেগেছে। ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি বাতার বেড়ার ফাঁক দিয়ে ছিটকে পড়ছে। পাকঘর থেকে ধুয়ার কুণ্ডলি বের হচ্ছে। মা বিড়বিড় করে কি যেন বলছেÑ তোর বাপ তো এখনো বাড়ি ফেরেনি, জ্বালায় জ্বালায় আমি জ্বইল্লা গেলাম। ভাতের হরাডা (ঢাকনা) দিয়া তোর বইনরে একটু কোলে নে।
শিমের বিচি আর চাউল ভাজার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল, সাদিয়াকে কোল থেকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে দিলাম দৌড়। সে জোরে দিলো এক চিৎকার। আমি সোজা ফুফুর ঘরে। বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে চুপসে গেছি। ফুফু আমার সারা শরীর তার উড়না দিয়ে পরম আদরে মুছে দিচ্ছেন আর বলছেনÑ
Ñকিরে, কই আছিলি এতক্ষণ?
Ñসাদিয়ারে কোলে রাখছি।
Ñআচ্ছা তোর আব্বা মনে হয় এখন তোদের জন্য অনেক মজার মজার খানা আনে, নারে?
Ñমা দেয় না, শুধু বকবক করে।
Ñচুপ। মাকে এসব বলে না। নে তোর শিমের বিচি আর চাউল ভাজা। ঠিকমতো লেখাপড়া করবি কেমন।
Ñআচ্ছা ফুফু, ফুফা কি আরেকটা বিয়া করছে গো?
Ñতুই খা, আয় আমার কাছে আয়, বস। আমাকে টেনে চৌকিতে বসিয়ে দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
আমি তার চোখে সেদিন অশ্রু দেখেছিলাম। ফুফুই আমাকে স্কুলে ছোট ওয়ানে ভর্তি করে দেন। মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে পূত্রতুল্য আদর-¯েœহ করে গেছেন। এখনো আষাঢ়ের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় আমি সে ফুফুর উপস্থিতি টের পাই, আমার নিজেকে খুব একা মনে হয়। খুব একা! দক্ষিণ ঘর থেকে যেন কেউ আমাকে ডাকেÑ মেহরাইব্বা... ও মেহরাইব্বা। একটু শুনে যা। আমি কেন জানি সে ডাক পেলে সব ভুলে যেতাম। আহারে! কি মমতায় মাথা আঁচড়িয়ে দিতো আর শার্টের গোতাম লাগিয়ে দিতো। তুমি আমাকে ভুলে গেছ ফুফু? ওপারের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ভালো থেকো তুমি আর খুঁজে দেখো তোমার মায়াময় স্বর্গের কোনো প্রান্তরেÑ দেখবে তোমার মেহরাইব্বা এখনো দাঁড়িয়ে তোমার মায়া-ঘরের সামনে। আনমনে। শুধু একা।
নোয়াগাঁও, দেবিদ্বার, কুমিল্লা


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi