১৭ জুলাই ২০১৯

ছুঁয়ে কান্নার রং

চারাগল্প
-


দুপুরবেলায় আকাশে মেঘ করেছে। এই পড়ন্ত বেলায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকাতেই মনে হলো যেন সন্ধ্যার ছায়া নেমেছে। আকাশ ভেঙে এখনই বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি পড়লে আমার কবিতা পড়তে ইচ্ছা করে। এখন কবিতা পড়তে ইচ্ছা করছে না। তবুও বুকশেলফ থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’ খুলতে যাবো, এমন সময় মোবাইলে কল। কে আবার এই সময় কল করেছে! নাম্বারটা আননোন। রিসিভ করতেই ওপার থেকে এক ব্যাকুল নারীকণ্ঠ, ‘হ্যালো রনি, তুই কই? জলদি প্রাইম হাসপাতালের ৩০৭ নাম্বার কেবিনে আয়। বাবার জন্য হার্টের স্প্রে নিয়ে আসিস। খুব জরুরি। বাবার হার্টের পেইন উঠেছে। এখানে ডাক্তার নার্স সবাই ব্যস্ত। তাদের এত সময় নেই ফার্মাসি থেকে স্প্রে এনে দেয়ার।’ মহিলার দ্রুতগামী কথা শুনে বুঝলাম এটা রং নাম্বার। আবার কেন জানি মনে হলো এটা রং নাম্বারও নয়। কেউ আমার সাথে রসিকতা করছে। আমাদের ক্লাসের অনেক মেয়ে আজকাল আমার সাথে এমন করে। কিন্তু এই গলাটা পরিচিত মনে হচ্ছে না। আমি খুব নম্রভাবে বললাম, ‘স্যরি, আমি রনি নই। আপনি ভুল করছেন।’ ওপার থেকে উচ্চস্বর, ‘বিপদের সময়ে রসিকতা বাদ দে তো। জলদি আয়। বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে। স্প্রে খুব দরকার ভাই।’ আমাদের ক্লাসের কোনো দুষ্ট বান্ধবীর তামাশা ভেবে বললাম, ‘ওকে। আসছি আপা।’ ওপার থেকে জবাব, ‘জলদি আয়। তোর গলাটা এমন লাগছে কেনো? আর শোন...।’ লাইন কেটে গেল। নিশ্চয়ই ব্যালেন্স ফুরিয়ে গেছে।
কী করব এখন! কলব্যাক করব? না না দরকার নেই। এটা আমাদের ক্লাসের তানির কাজ। তানি এর আগে গলাকে বিকৃত করে আমাকে দুইবার বোকা বানিয়েছে। এখনো বোকা বানাবার চেষ্টা। এসব ভাবছি। ততক্ষণে বাইরে প্রবলধারায় বৃষ্টি ঝরছে। না না, এখন সঞ্চয়িতা পড়ব না। ঘুমাব।
২.
ঘুম ভাঙল শেষ বিকেলে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি সাড়ে ছয়টা বাজে। এখন আর বৃষ্টি নেই। আকাশ পরিষ্কার। দুপুরের কল বিড়ম্বনার কথা মনে হলো। আচ্ছা, এমনও হতে পারে, এটা কারো ফাজলামো ছিল না। সত্যি সত্যি কোনো বোন বাবার অসুস্থতায় হাসপাতাল থেকে ভাইকে কল করেছে আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা রং নাম্বার হয়ে আমার ফোনে এসেছে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। রিসিভ অপশন থেকে নাম্বারটা বের করে কল দিলাম। প্রথম রিং হতেই ওপার থেকে সেই নারীকণ্ঠ, ‘হ্যালো কে?’ নিচু স্বরে বললাম, ‘ইয়ে মানে, এটা কোন জায়গা?’ সেই নারীকণ্ঠ চেঁচিয়ে বলল, ‘আশ্চর্য, কোথায় কল করেছিস জানিস না? তোদের উদ্দেশ্য বুঝি হারামি কোথাকার। আমার বাবা হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে নড়ছে, আর তুই কল করেছিস নাটক দেখাতে?’ আমি নত সুরে বললাম, ‘প্লিজ শুনুন, দুপুরে আপনার নাম্বার থেকে আমার ফোনে কল এসেছে।’ ওপারে নারীকণ্ঠে ভীষণ রাগ, ‘অদ্ভুত তো। আমি আবার কখন তোকে কল করেছি! ফোন রাখ তো হারামি। আমার ভাই রনি এখনো স্প্রে নিয়ে আসেনি, ও আসলে তোর পরিচয় বের করে তোকে পুলিশে দেবো। দুপুরে আমার ভাইকে ফোন করে মোবাইলের টাকা শেষ, এখন চার্জও ফুরিয়ে গেছে...।’ লাইন কেটে গেল।
সর্বনাশ। তাহলে ঘটনা সত্য! এটা তানির রসিকতা নয়। ওই নাম্বারে আবার কল দিলাম। ফোন বন্ধ। নিশ্চয়ই চার্জ ফুরিয়ে মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছে। কী হবে এখন! হাসপাতালে ওই বোন তো জানে না সে সত্যি তার ভাই রনিকে ফোনে পায়নি, রং নাম্বারে পেয়েছে আমাকে। রনিও তো এমন বিপদের কথা জানে না।
প্রাইম হাসপাতাল আমার খুব কাছে। তড়িঘড়ি করে ছুটলাম হাসপাতালের দিকে। যাওয়ার সময় এক ফার্মাসি থেকে একটা হার্টের স্প্রে কিনে নিয়ে গেলাম।
হাসপাতালে পৌঁছতেই আবার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ৩০৭ নাম্বার কেবিনে এসে দেখি মাঝ বয়সের এক নারীর গলা ফাটানো কান্না। উনি কী সেই নারী, যার ভুল কল আমার নাম্বারে এসেছে! উনি এভাবে কাঁদছেন কেন? কেবিনে সাদা কাপড়ে আবৃত কে শুয়ে আছে, উনার বাবা! একজন নার্সকে ঘটনা জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘উনার বাবা কিছুক্ষণ আগে হার্টের পেইনে মারা গেছে। উনার ভাইয়ের স্প্রে নিয়ে আসার কথা।’ আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। একি শুনলাম! এ ঘটনার জন্য কে দায়ী! আমি না রনি! বাইরে বৃষ্টি যতই বাড়ছে, বাবাকে হারানো রনির বোনের কান্না ততই বাড়ছে। আমার প্যান্টের পকেটে পড়ে আছে হার্টের স্প্রে। কী করব বুঝতে পারছি না। বারান্দায় এসে হাসপাতালের নিচের দিকে তাকালাম। বেশ বৃষ্টি বাইরে। হুড তোলা একটা রিকশা আসছে। রিকশায় বসা একটা ছেলে। এই ছেলে রনি কিনা কে জানে! যদি রনি হয়, তাহলে সে এসে দেখবে তার বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছে। পৃথিবীর কোনো হার্টের স্প্রেতে আর কাজ হবে না। বোনের সাথে গলা মিলিয়ে সেও বাবার জন্য কাঁদবে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi