২২ জুলাই ২০১৯

বাবা তোমাকে ভালোবাসি

বাবা দিবস
-

বাবা এমন একটি শব্দ, যার তুলনা শুধু বাবাকে দিয়েই বোঝানো যায়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সন্তানের কাছে জীবন চলার পথে শৈশবের প্রথম বন্ধু হলো তার বাবা।
প্রতিটি সন্তানের অন্তরে গভীরভাবে মিশে থাকে শৈশব স্মৃতি! বাবার হাত ধরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। এলোমেলোভাবে বাবার আঙুল ধরে হাঁটাচলা করা। বাবার কাঁধে চড়ে ঘোরা কিংবা মাঠের বুকে ফুটবল-ক্রিকেট খেলা দেখতে যাওয়া। শত লোকের প্রচণ্ড ভিড়ে শক্ত করে বাবার হাত জড়িয়ে ধরা।
প্রতিটি সন্তানের যেমন বাবাকে নিয়ে মনের মণিকোঠায় জমানো আছে হাজারো অতীত স্মৃতি।
আমার জীবনেও তেমন কিছু স্মৃতি আছে বাবাকে নিয়েÑ যা কখনোই ভুলে যাওয়ার মতো নয়।
আমার শৈশব অন্য আর দশটা ছেলের মতোই ছিল।
তবে আমাদের সংসারে তখন সব সময় অভাব লেগে থাকত। বাবা সারা দিন অন্যের জমিতে কাজ করতেন। আবার সপ্তাহে দু-তিন দিন, বাজারে চাল বিক্রি করতেন। আমাদের নিজস্ব কোনো দোকান ছিল না বাজারে।
বাবা অন্য কারো দোকানের সামনের বারান্দায় পাটের বস্তা বিছিয়ে চাল বিক্রি করতেন।
যেদিন বাবা বাজারে চাল নিয়ে যেত। সেদিন আমিও বাবার পিছু পিছু যেতাম। কারণ তিন-চার মণ করে চাল, বাইসাইকেলে করে হেঁটে বাজারে নিয়ে যেতে খুব কষ্ট হতো বাবার। আমাদের গ্রামের রাস্তা তখন কাঁচা ছিল। তাই আমি বাবার পিছু পিছু যেতাম আর ঠেলা দিতাম সাইকেল।
বর্ষা মওসুম এলে বাবা খুব কষ্ট হতো। বৃষ্টিতে অনেক সময় চাল ভিজে যেত। বাবা মাঝে মধ্যে আমাকে দোকানে বসিয়ে নামাজ পড়তে যেতেন।
তখন নিজেকে খুব বড় মনে হতো আমার। যদিও তখন আমার বয়স সবে ১১ বছর হবে হয়তো। বিকেল থেকে রাত অবধি চাল বিক্রি করে যখন দোকান গোছানো শেষ হতো, তখন বাবা আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন বাজারের সবচেয়ে বড় হোটেলে। আহা, পাঁচ টাকার ছোলা বুট আর বুন্দিয়া কিনে দিত আমাকে। সাথে আমার বাবাও নিতেন।
বাবা আর আমি মজা করে একসাথে বসে খেতাম।
খাওয়া শেষ করে বাবা আমাকে সাইকেল পাহারা দিতে বলত। আমি চুপ করে সাইকেলের রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাবা বাজারের মসজিদে এশার নামাজ পড়ে বাড়ির জন্য তরকারি কিনতেন।
আমি মাঝে মধ্যে বাবার কাঁচাবাজারে যাওয়ার দিকে লক্ষ করতাম। বাবা যেদিন মাছ বাজারে যেত সেদিন আমার খুশি দেখে কে। তবে সে প্রতিদিন মাছ কিনত না। যেদিন চাল বিক্রি করে একটু বেশি টাকা লাভ হতো, সেদিন মাছ কিনতেন। মাছের কাঁটা আমার ভীষণ ভয় লাগে। তাই কাঁটা কম বলে
পাঙ্গাশ মাছ আমার খুব প্রিয়। বাবা যখন বাজার-সদাই করে আমার কাছে চলে আসতেন, আমি ব্যাগ হাতে নিয়ে ব্যাগের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখতাম।
ব্যাগে মাছ থাকলে আমি খুব খুশি হতাম।
বাজার করা শেষে যখন বাড়ির পথে রওনা করতাম, তখন বাবা আমার ছোট্ট দুই ভাইয়ের জন্য পেঁয়াজু, নয়তো বুট-বাদাম কিনে নিত। আমিও বাবার কাছ থেকে দুই টাকা চেয়ে নিয়ে বাদাম কিনে প্যান্টের পকেটে ভরে একটা একটা করে খেতে খেতে বাড়ি আসতাম বাবার পিছু পিছু।
বাড়ি এসে বাবা চাল বিক্রি করা টাকাগুলো আমার হাতে দিতেন। আমি বিছানার ওপর বসে সবগুলো টাকা গুনে দেখতাম। প্রায় চার-পাঁচ হাজার টাকা হতো সব মিলিয়ে।
তখন ওই চার-পাঁচ হাজার টাকা ছিল আমার বাবার সহায়সম্বল জীবন চলার পথে। মা মাছ কেটে ধুয়ে রান্না করত। রান্না শেষ হলে আমরা তিন ভাই ও বাবা-মা একসাথে বসে ভাত খেতাম।
আমার বাবা সব সময় ন্যায়ের পথে চলতেন। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করত। খেয়ে না খেয়ে আমাদের খাওয়াত। যখন যা চাইতাম সাধ্যমতো তা দেয়ার চেষ্টা করত। ঈদ এলে বাবা-মা নতুন কাপড় কিনতেন না, তবে আমাদের তিন ভাইয়ের জন্য ঠিকই নতুন জামা-প্যান্ট কিনতেন।
দিনে দিনে আমরা তিন ভাই বড় হচ্ছি। এখন দুই ভাই চাকরি করি। বাবাও এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারে না। এখন আমরা তিন-চার মাস পরপর বাড়ি যাই। বাবা-মায়ের জন্য নতুন জামাকাপড় নিয়ে যাই। নানা রকম সুস্বাদু ফল কিনে নিই।
বাবা এসব দেখে খুব খুশি হয়। বাবাকে সাথে করে নিয়ে বাজারে যাই। বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটা কিনে নিয়ে বাবার হাতে ধরিয়ে দিই। তখন আমার বাবা মায়াভরা একটি হাসি দেন। বাবার এমন হাসিমাখা মুখ দেখে আমার মনে পড়ে কয়েক বছর আগের কথা। যখন আমার শৈশবকাল ছিল, তখন আমিও ঠিক এমন একটা হাসি দিতাম বাবার হাতে মাছ অথবা পেঁয়াজু দেখে।
সফিপুর, গাজীপুর

 


আরো সংবাদ

সকল




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi