১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

বাবার মুখের হাসি

বাবা দিবস
-


শত অভাব-অনটন ও দুঃখ-যন্ত্রণাকে জীবনের নিত্যসঙ্গী হিসেবে বরণ করে নেয়ার পরও আব্বার মুখের হাসি কোনো দিন মিলিয়ে যেতে দেখিনি। জন্মাবধি দেখে আসছি, আমার পরিবারের দারিদ্র্য। এর কারণ ছিল দু’টিÑ এক. আমার দাদা আব্বার জন্য কোনো সম্পদ রেখে যাননি। দুই. আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যার আধিক্য। আমরা ৯ ভাইবোন। ছোটবেলায় দাদীকে জীবিত অবস্থায় পেয়েছি কয়েক বছর। তিনিও সব সময় আমাদের সাথেই থাকতেন। সুতরাং পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ১২-তে। এই ১২ জন মানুষের অন্ন-বস্ত্রের জোগান দেয়া একটি সচ্ছল পরিবারের পক্ষেও যেখানে কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেখানে একজন ক্ষুদ্র বর্গাচাষি আমার আব্বার জন্য কাজটা কত কঠিন ছিল বলার অপেক্ষা রাখে না। ভালো-মন্দ খাওয়া দূরে থাক, তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে আব্বাকে কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, সেটি ভেবে আমি হয়রান হয়ে পড়ি।
আব্বাকে নিয়ে লিখতে বসে আজ কত কথাই না মনে পড়ছে! সেসব কথা লিখতে গেলে আমার এই লেখা ধারণ করবে বিশাল আকৃতি। তবে কিছু কথা তো আমি চাইলেও না লিখে থাকতে পারব না। আমি তখন খুবই ছোট। কোনো মতে হেঁটে বেড়াতে পারি। পাশের বাড়িতে খেলতে থাকা অবস্থায় আমাকে কুকুরে কামড় দেয়। সে দিনের স্মৃতি আমার মনে আজো স্পষ্ট ভেসে রয়েছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এলাম। তখনকার দিনে চিকিৎসাব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। চাইলেই ডাক্তার পাওয়ার উপায় ছিল না হাতের নাগালে। আমার চিন্তায় আব্বা পাগলের মতো হয়ে গেলেন। সে অবস্থায় কী করতে হবে, এটাই জানা ছিল না তার। আমাকে নিয়ে বৈদ্য-কবিরাজের বাড়িতে ছুটতে লাগলেন দিনের পর দিন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আব্বা আমাকে কাঁধে করে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। দেরি হয়ে যায় এই ভয়ে পথে তিনি একটিবারের জন্যও বিশ্রাম নেননি। বৈদ্য-কবিরাজের চিকিৎসায় কোনো কাজ না হওয়ায় আব্বা শেষমেশ ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। ডাক্তার আমার নাভির চারপাশে ১৪ দিন ধরে প্রতিদিন একটি করে মোট ১৪টি ইনজেকশন পুশ করেছিলেন। আমার শর্ত মোতাবেক, প্রতিটি ইনজেকশন পুশ করার আগে আমাকে বড় সাইজের একটা রসগোল্লা খাওয়াতে হয়েছিল। আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম। আব্বার মুখে পুরনো সেই হাসি ফিরে এলো আবার।
আব্বার সাথে আমার মধুর স্মৃতিগুলোর কথা যখন মনে হয়, তখন সবার আগে আসে তার সাথে হাটে যাওয়ার কথা। আব্বা আমাকে নিয়ে হাটে যেতেন বাজার করতে। আমি তার পেছন পেছন যেতাম আর বাজারের ব্যাগ বহন করতাম। শুধু শুধু যে আব্বার সাথে হাটে যেতাম তেমনটি নয়; একটা বিশেষ লোভে তার পিছু চলে যেতাম। হাটে গেলে নানা রকম মিষ্টি খেতে পাওয়া যেত। শুধু হাটেই নয়, আব্বার সাথে বহুবার গ্রাম্যমেলায় গিয়েছি। একবার একটা মেলার স্মৃতি মনে আছে। আব্বার কাছে একটা খেলনা পিস্তল কিনতে চেয়েছিলাম। আব্বা রাজি হননি। আমি খুব কেঁদেছিলাম মেলায় দাঁড়িয়েই। আব্বা বহুভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমি বুঝতে চাইনি। সেদিন না বুঝলেও আজ বুঝতে পারি কেন তিনি সেদিন পিস্তল কিনে দেননি। সেই দুঃখের কথা এখন আর বলতে চাই না।
আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করতে যাই, তখন আব্বার হাতে টাকা ছিল না একদমই। তিনি নিজের সবচেয়ে প্রিয় গরুটা বিক্রি করে দিয়ে আমাকে কোচিং করতে পাঠালেন। সেদিন তার বুকে কষ্ট জমাট বেঁধেছিল হয়তো। কিন্তু মুখের সেই হাসি তখনো অটুট ছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও আমার চান্স হচ্ছিল না কোথাও। আমি ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু আজীবন দুঃখ-কষ্ট সয়ে যাওয়া এ মানুষটি কখনো ভেঙে পড়েননি। আমার প্রতি আস্থা হারাননি একবারের জন্যও, বরং আমাকে সাহস জুগিয়েছেন প্রতিনিয়ত। আমি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। আল্লাহর রহমতে এবার চান্স হয়ে যায়। সংবাদটা প্রথমেই আব্বাকে দিই। তিনি সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন। এভাবে কোনো দিন কাঁদতে দেখিনি তাকে। আমার চেয়ে তিনিই তো বেশি খুশি হয়েছিলেন। জগতের সমস্ত সুখ ভিড় করেছিল তার মুখে। সারা জীবন অমানুষিক পরিশ্রম করে এসেছেন এ মানুষটি; এখনো করে চলেছেন। কারণ, আমার পড়াশোনা শেষ হয়নি এখনো। খরচের টাকা তিনি যেভাবেই হোক জোগাড় করে পাঠান। আমি মনে মনে মহান রবের কাছে প্রার্থনা করি, আর ক’টা দিন তাকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখো। তার এই পরিশ্রম এবং দুঃখ-কষ্টের দিন শেষ হতে চলেছে অচিরেই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়