২১ জুলাই ২০১৯

স্মৃতিতে অমলিন বাবা

বাবা দিবস
-

আমার বাবা। স্মরণে এলেই মানসপটে ভেসে ওঠে সফেদ দাড়ি, পাজামা ও পাঞ্জাবি এবং মাথায় কিস্তি টুপি পরিহিত একজন অশীতিপর বয়স্ক মানুষের প্রতিবিম্ব। সবাই তাকে মৌলভি সাহেব বলে অভিহিত করলেও তিনি ছিলেন সাধারণ শিক্ষায় ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের এন্ট্রান্স পাস একজন সাধারণ মানুষ। জীবনের প্রথম চাকরির ইন্টারভিউ আনসার অফিসের কেরানি হয়েই বাবা আমাদের নিয়ে নশ্বর পৃথিবীর জীবন কাটিয়ে গেলেন।
একদিন বলেছিলাম, ‘বাবা, অশীতিপর জীবনসায়াহ্নে মাওলার কাছে কী সান্ত্বনা নিয়ে যাচ্ছেন?’ বাবার সহজ-সরল উত্তর ছিলÑ ‘সামান্য কেরানিগিরি করেছি, ঊর্ধ্বতনের আদেশমতো ফাইল তৈরি করে দেয়া ছাড়া কোনো ক্ষমতা চর্চা করিনি। তবে মাওলার দরবারে এই সান্ত্বনা নিয়ে যাচ্ছি যে, জীবনে কারো অধিকার বা হক নষ্ট করিনি।’ পাঁচ ভাই দুই বোনের সংসার। বাবার একার আয়ে কায়ক্লেশে চলতে হতো। বাবা অফিসে কারো কাছ থেকে ঘুষ নেবেন দূরে থাক, এক কাপ চা পর্যন্ত খেতেন না। স্বাধীনতা-উত্তর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হু হু করে বাড়তে লাগল। বলতে গেলে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেল। এমন অবস্থায় বাবা বাধ্য হয়েই তার এক ছেলেকে এসএসসি পাসের পর চাকরি করতে দিতে বাধ্য হলেন। সে মেধাবী ভাইয়ের উচ্চশিক্ষার জন্য আকুতি আজো মনে পড়ে। অনন্যোপায় হয়ে বাবা এ কাজ করলেন। মনে পড়ে, বাবার ইমামতিতে ফজর নামাজান্তে কুরআন তিলওয়াত করে আমরা পড়তে বসতাম। আবার বাবা সারা দিন অফিস করে ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে আসার পরও মাগরিবের নামাজ পড়ে আমাদের পড়াতেন। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি। বাবার একার সৎ আয়ে গৃহশিক্ষক রাখা বা প্রাইভেট পড়ানো বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। বাবা সে কাজটি সাধ্যমতো কষ্ট হলেও করে যেতেন। মনে করি, ভালোভাবেই করে গেছেন। এহেন বাবার সন্তান আমরা ভাইবোন কেউ বা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলে শিক্ষকতা বা দু-একজন অন্য পেশায় জীবন চালিয়ে জীবনের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। সবচেয়ে ছোট ভাইও পঞ্চাশোর্ধ্ব। জীবনের উচ্ছ্বাস বা প্রতিযোগিতায় নয়, ধৈর্য ও সহনশীলতার মূর্র্ত প্রতীক বাবা। যা পেলেন তাতেই তুষ্ট। বিধাতার ওপর পরম নির্ভরতা ও বিশ্বাস।
১৯ বছর চলছে বাবাহীন পথচলা। জীবন উপকরণ আমাদের ভাইবোনদের বাবা থাকাকালীন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আমরা ভাইবোন অতীত স্মৃতি রোমন্থনে বাবা প্রসঙ্গে সবাই একমত হয়ে বলে উঠিÑ জীবন উপকরণের অভাবের সময় বাবা থাকাকালে যে অব্যক্ত সুখানুভূতি, ভয়হীন জীবনধারা, তৃপ্তিময় জীবন বয়ে চলতাম; তা যেন বাবার প্রস্থানের সাথে সাথে চলে গেছে। অনন্ত জীবনে বাবাকে আল্লাহ রহমতের ছায়ায় রাখুন।
দেওভোগ, মুন্সীগঞ্জ


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi