২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

টেবিল ফ্যান

-

যা গরম পড়ছে, বেশ হাঁপিয়ে উঠছেন রহমত আলী। যখন তখন ঘামে ভিজে জবুথবু হয়ে পড়েন। বেশ অস্বস্তিকর। অথচ কয়েক মাস আগেও এমন ছিল না। অগত্যা এই গরম! আল্লাহর অভিশাপ নয় তো!
শরীরের এক ফোঁটা ঘামও পানে পড়তে দেন না পান ব্যবসায়ী রহমত আলী। পানের দোকানটা বেশ পরিপাটি করে রাখেন। পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী হিসেবে এই বাজারে তার একটি সুনাম আছে। দশ গেরামের মানুষ বাজার থেকে পান কিনলে রহমত আলীর দোকান থেকেই কিনেন।
আজকাল রাতে ঘরে ফিরলে বউটারে বড় মনে পড়ে রহমত আলীর। মনোয়ারা সেই যে ষোল বছর আগে মারা গেছে, আর বিয়ে করেননি তিনি। ছেলে জসীমকে নিয়ে বাকি জীবন কাটবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। গত বছর ছেলেকে বিয়েও করিয়েছেন। সুরমা বেশ ভালো মেয়ে। দক্ষ হাতে পুরো পরিবার আগলে রাখে। শ্বশুরের প্রতি বিরাট ভক্তি। বৌমার আদব কায়দায় সন্তুষ্ট রহমত আলী।
২.
মুদি দোকানে কাজ করে জসীম। মাস শেষে ভালো বেতন আসে। বিয়ের আগে বাবার সাথে বেতনের খরচা নিয়ে বৈঠক করলেও জসীম এখন বদলে গেছে। বাবাকে এখন আর জানানোই হয় না বেতনের সংবাদটি। রহমত আলীও ছেলের মধ্যে বিশাল পরিবর্তন দেখছেন বিয়ের পর। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।
গরমের কোনো কমতি নেই। দিন রাত যেন আসমান থেকে আগুনের শিখা খসে পড়ছে। হাতপাখা ঘোরাতে ঘোরাতে রাত পার হয়। এই হাতপাখাটি মনোয়ারা বানিয়েছে। বড় গুণবতী বউ ছিল।
হাতপাখা ঘোরাতে আগের মতো শক্তি পান না রহমত আলী। বিদ্যুৎ থাকার পরও ঘরে কোনো ফ্যান নেই। না সিলিং ফ্যান, না টেবিল ফ্যান। এসব কেনার সামর্থ্য হয়নি কখনো। রহমত আলী শুনেছে টেবিল ফ্যানের দাম নাকি কম! ছেলেকে বলতে হবে। ঘরে অন্তত একটা টেবিল ফ্যান থাকলে হাতপাখার দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আজই জসীমকে বলতে হবে।
বাবার আবদার শোনে জসীম নত গলায় বলে ‘আব্বা, টাকায় কুলিয়ে উঠতে পারছি না। হাতপাখা থাকতে ওতো বিলাসিতার দরকার কী?’ ছেলে এমন কথা বলবে, আশা করেননি রহমত আলী। অথচ আগে ছেলের কাছে যা-ই প্রত্যাশা করত, ন্যূনতম হলেও পেত। সেই ছেলে এভাবে কথা বলছে, বউয়ের শলা-পরামর্শে নয়তো! না না, সুরমা এমন মেয়েই না। ভাবেন রহমত আলী।
৩.
রাত বাড়ার সাথে সাথে কিসের একটা অদ্ভুত শব্দ কানে বাজছে রহমত আলীর। ঘোঁ ঘোঁ ঘোঁ ঘোঁ...। অনুমান করা যাচ্ছে না। ওটা কিসের শব্দ, রহমত আলী বোঝার চেষ্টা করেন, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। রাত যত বাড়ছে, শব্দের গতি তত স্পষ্ট হচ্ছে। শব্দটা আসছে জসীমের ঘর থেকে। পাশের ঘরে শুয়ে রহমত আলী অজ্ঞাত শব্দটি শোনেন আর হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়েন।
সকালে ঘুম ভাঙার পরও একই শব্দ জসীমের ঘর থেকে আসছে। ঘড়িতে সকাল সাড়ে ছয়টা। সুরমা হাঁড়ি-পাতিল ধুয়ে এনে উঠোন ঝাড়–তে মনোযোগী। বৌমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে ওটা কিসের শব্দ হচ্ছে ওদের ঘরে। না থাক, সুরমা কাজেই মনোযোগী থাক এখন।
ছেলের ঘরে আসেন রহমত আলী। জসীম চোখের সামনে মোবাইল ধরে শুয়ে আছে। তার বালিশের পাশে একখানা নতুন টেবিল ফ্যান ঘুরছে। শব্দটা সেখান থেকে হচ্ছে।
বাবাকে দেখে উঠে বসে জসীম। রহমত আলী জানতে চান এই টেবিল ফ্যান কবে আনা হয়েছে। জসীম জানায়, ‘ইয়ে আব্বা, সুরমা একটা টেবিল ফ্যানের আবদার করেছে। ওর নাকি গরম সহ্য হয় না।’ ছেলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন রহমত আলী। তারও তো একটা টেবিল ফ্যানের আবদার ছিল ছেলের কাছে! অথচ ছেলে কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, মনে আছে রহমত আলীর। বাবার আবদারকে পরোয়া না করে ছেলে যে তার বউয়ের আবদার পূরণ করেছে। রহমত আলীরও বলতে ইচ্ছে হলোÑ হাতপাখা থাকতে ওতো বিলাসিতার দরকার কী? কিন্তু কথাটি তিনি বলতে পারলেন না। কথাগুলো যেন গলার মধ্যিখানে এসে আটকে গেছে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ