২১ মে ২০১৯

বৈসাবি

বৈসাবি। পাহাড়ে বর্ষবরণের একটি উৎসবের নাম। ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, মারমা ভাষায় সাংগ্রাই ও চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিঝুকে একসাথে বলা হয় এই বৈসাবি উৎসব। বৈসাবির মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা হয় পাহাড়ে -

বৈসাবি। পাহাড়ে বর্ষবরণের একটি উৎসবের নাম। ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, মারমা ভাষায় সাংগ্রাই ও চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিঝুকে একসাথে বলা হয় এই বৈসাবি উৎসব। বৈসাবির মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা হয় পাহাড়ে।
গত ১২ এপ্রিল শুক্রবার থেকে শুরু হয় পাহাড়ে এই ‘বৈসাবি উৎসব’ সপ্তাহব্যাপী। এর মাধ্যমে পুরনো বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেন এ অঞ্চলের মানুষ। পাহাড়ে ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে আয়োজন করে থাকেন নানা রকম কর্মসূচি। রঙ-বেরঙের নতুন পোশকে শিশু-কিশোররা ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ি ও বাড়ি। বর্ষবরণ উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আলোচিত অনুষ্ঠান মারমাদের পানি উৎসব। এদিন মৈত্রী পানি বর্ষণের পাশাপাশি নাচে আর গানে পরস্পরকে ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায় সিক্ত হন তারা। ঠিক এভাবে পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার মাধ্যমে পাহাড়ে মানুষ মেতে ওঠে বৈসাবি উৎসবে। নতুন বছরকে বরণ করতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রতিটি সম্প্রদায়। তবে ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস একমাত্র বান্দরবান জেলায়। উৎসবের নানান রঙ ও বহুমুখী বৈচিত্র্যতা ফুটে উঠে এখানে। ধর্মীয় ও সম্প্রদায়ভেদে বর্ষবরণ উৎসবকে একেক সম্প্রদায়ের মানুষ একেকভাবে উদযাপন করে থাকেন।
চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় ফুলবিজু দিয়ে শুরু করেন বৈসাবি। মূলত বাংলা নববর্ষের দুদিন আগে থেকে তারা আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। প্রথম দিন ভোরে বন-ঝোপঝাড় থেকে বুনো ফুল সংগ্রহ করে নদীতে ভাসিয়ে উৎসব উদযাপন করেন শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা। পরের দিন মূল বিজু। এ দিনে নানা পদের সবজি দিয়ে তৈরি করা হয় পাঁচন। এ সবজিতে থাকে কাঁচা কাঁঠাল, বরবটি, শিম, আলু, মুলাসহ নানা রকমের তরতাজা সবজি। বাড়িতে আগত অতিথিদের অন্যান্য খাবারের সাথে পাঁচন দেয়া হয়। ঘরে ঘরে তরুণ-তরুণীরা বয়স্কদের আশীর্বাদ নেয়। সন্ধ্যায় পাড়ায় পাড়ায় চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নাচ-গান। পরের দিন অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের দিন আনন্দ করা হয়। এ দিনটিকে চাকমারা বলেন গইজ্জাগজ্জি, বাংলায় যাকে বলে গড়াগড়ি বা আনন্দ করা। বছরের প্রথম দিনটি আনন্দে-আয়েশে কাটায় তারা। তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানগুলোও প্রায় চাকমাদের মতো। তারা নববর্ষকে বলেন বিসু। তবে তাদের অন্য রকম একটি অনুষ্ঠান হলো ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা। পাহাড়ের এক ধরনের সবজির ফল এই ঘিলা। এই ঘিলাকে পবিত্র মনে করেন তঞ্চঙ্গ্যারা। ঘিলা ফল দিয়ে তরুণ-তরুণীরা অনেকটা মার্বেল খেলার মতো করে প্রতিযোগিতার অয়োজন করে। পাড়ায় পাড়ায় চলে এই প্রতিযোগিতা। পুরস্কারেরও আয়োজন করা হয়। বান্দরবানের বালাঘাটা রেইছাসহ বিভিন্ন এলাকায় এবারো ঘিলা খেলা উৎসবের আয়োজন করা হয় নববর্ষে। তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ৩৩টি দল অংশ নেয় এতে। নানা ধরনের নানা রঙের পোশক পরে তরুণ-তরুণীরা অংশ নেয় ঘিলা খেলা ও ফুল ভাসানো উৎসবে।
বর্ষবরণ উৎসবকে ‘চাংক্রান’ নামে পালন করে থাকে ম্রো সম্প্রদায়। বেশ কয়েক বছর ধরে জাঁকজমকভাবে পালন করা হয় ম্রো সম্প্রদায় অধ্যুষিত চিম্বুক এলাকায়। আশপাশে বিভিন্ন পাড়া থেকে প্রচুর লোকসমাগম ঘটে সেখানে। উৎসবে গো হত্যা নৃত্যের আয়োজন করা হয়। ম্রো তরুণ-তরুণীরা বাঁশির তালে তালে নেচে গেয়ে পালন করে চাংক্রান। তরুণীরা এ সময় তাদের নানা ধরনের পুরনো গয়না পরে নাচে। এসব গয়না বংশপরম্পরায় ব্যবহার হয়ে আসছে। সাথে চলে বিভিন্ন খেলা। তার মধ্যে লাঠি খেলা, পুঁতির মালা তৈরি, শক্তি প্রদর্শন প্রতিযোগিতা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয় সেখানে। চাংক্রান উৎসবে পুরো চিম্বুক পাহাড় আনন্দময় হয়ে উঠে। সংস্কৃতি কর্মী ইয়াঙান ম্রো বলেন, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে চিম্বুকে পোড়া বাংলা এলাকায় ‘চাংক্রান’ উৎসব পালন করা হচ্ছে।
‘সাংক্রাইং’ নামে উৎসব পালন করেছে খুমি সম্প্রদায়। রোয়াংছড়ি উপজেলা তারাছা এলাকায় লংথাং পাড়ায় ২০ এপ্রিল দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠান। এবারো নানা আয়োজনে বর্ষবরণ উৎসব পালন করে খুমিরা। তবে তাদের বর্ষবরণ উৎসব এখন আগের মতো আর দেখা যায় না।
বর্ষবরণ উৎসবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে মারমা সম্প্রদায়ের মৈত্রী পানি বর্ষণ। তরুণ-তরুণীরা একে অন্যের গায়ে পানি ছিটিয়ে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। তাদের বিশ্বাস, স্বচ্ছ পানির ধারা পুরনো বছরের যত দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে মুছে দেবে। চন্দন পানিতে বৌদ্ধ মূর্তি স্নানের মধ্য দিয়ে মারমারা সংগ্রাই উৎসব শুরু করেন। নববর্ষের আগের দিন তারা ঘর দুয়ার পরিষ্কার করেন, বয়স্কদের পূজা দেন। মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনায় অংশ নেন। বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বয়স্কদের প্রণাম করেন। পরে শুরু হয় পাড়ায় পাড়ায় মৈত্রী পানি বর্ষণ। এই উৎসবের একটি জনপ্রিয় গান রয়েছে। সেটি হলো ‘সাংগ্রাইয়ে মা ঞি ঞি ঞা ঞা রিকা জাই কাই পামে’ এর বাংলা অর্থ হলোÑ সাংগ্রাইয়ের বর্ষবরণে চলো আমরা একসাথে মৈত্রী পানি বর্ষণে যাই। উৎসবের সময়ে এই গানটি সবার মুখে মুখে ফিরে। সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে ওঠে মারমা পল্লীগুলো। রাতে পাড়ায় পাড়ায় চলে পিঠাপুলি তৈরির আয়োজন। পরের দিন পিঠা ও মিষ্টান্ন মন্দিরে ভিক্ষুদের উৎসর্গ করা হয়। বান্দরবান শহরের রাজার মাঠে বসে দুই দিনব্যাপী মৈত্রী পানি বর্ষণ প্রতিযোগিতা। সেখানে বিভিন্ন এলাকার তরুণ-তরুণীরা নতুন পোশাক পরে পানি বর্ষণে অংশ নেয়। অন্য দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে মঞ্চে। শিশু থেকে শুরু করে যুবক-যুবতি এমনকি প্রবীণরাও পানি ছিটিয়ে বরণ করে নেন নতুন বছরকে। উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি হ্লাএমং মারমা জানান, বর্ষবরণের উৎসব পালন করতে শহরে রাজার মাঠে চার দিনের কর্মসূচি পালন করেন তারা। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑ ১৩ এপ্রিল মঙ্গল শোভাযাত্রা, বয়স্ক পূজা ও পিঠা তৈরির উৎসব। পরের দিন উজানি পাড়ার সাঙ্গু নদীর ঘাটে বুদ্ধ ¯œান। মূলত মারমারা নববর্ষের পরের দিন অর্থাৎ ১৫ ও ১৬ এপ্রিল মৈত্রী পানি বর্ষণ, তৈলাক্ত বাঁশ আরোহণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। এ ছাড়া বর্মি পঞ্জিকা অনুসরণ করে ১৩ এপ্রিল দিয়ে উৎসব শুরু করে খিয়াং এবং চাক সম্প্রদায়ের মানুষ। তারাও ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন ঘরদোর। পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন তারাও।


আরো সংবাদ




agario agario - agario