২১ মে ২০১৯

সামর্থ্য যেখানে থমকে যায়

-

গণপরিবহনে সাভার যাচ্ছি। পাশের সিটে বসা ছিল জনৈক ছাত্রী। মেয়েটি শুরুতেই আমার কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল, কোথায় যাচ্ছি। ও-হ্যাঁ জনিয়ে রাখি, বাস কন্ডাক্টর যখন ভাড়া কাটছিল তখনি জেনেছিলাম মেয়েটি ছাত্রী। বৃহস্পতিবার রাত, তাই নগরের নিত্যদিনের যানজটের চেয়েও আরো অনেক বেশিই ছিল জ্যাম। গাড়ির গতি ছিল বলা যায় শূন্যের কোঠায়। এরকম প্রচণ্ড জ্যামে আমি ফেসবুকিং করে, বিরক্তিকর সময় কাটিয়ে দেই। কিন্তু সেই রাতে ঠিকমতো তা পারছিলাম না। কারণ পাশে বসা মেয়ে। চ্যাঁটিং করতে গিয়ে কখন আবার হাতের কনুই লেগে যায়। শেষে হবে কেলেঙ্কারি। তা ছাড়া মেয়েটি কিছুক্ষণ পরপরই কাশতে ছিল। তার কাশির ধরন দেখে আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, মেয়েটির বেশ কষ্টই হচ্ছে। কারণ এ রকম কাশিতে আমিও বেশ ভুগেছি। গাবতলী পার হওয়ার পর গাড়ির গতি কিছুটা ফিরে এলো। অনুরোধ করল জানালাটা আরেকটু মেলে দেয়ার জন্য। তাকে জানালাম আপনার যে অবস্থা তাতে বাতাস পেলে কাশি আরো বেড়ে যাবে। ছাত্রীটি বললÑ না আঙ্কেল, বাতাসে আমার সমস্যা নেই। অপরিচিত কেউ আঙ্কেল বললে কিছুদিন আগেও আমার মেজাজ বিগড়ে যেত। যেদিন থেকে হিসাব কষে দেখেছি, ভার্সিটি লাইফও পার করেছি তা প্রায় ১৮ বছর। সে দিন হতে আর আঙ্কেল ডাকলে রাগ করি না। যা হোক, জানালা দিয়ে এখন আর মোবাইল টান দেয়ার সুযোগ নেই, তাই খুলে দিলাম গ্লাস। এবার মেয়েটি বলল ধুলোবালিতে আমার সমস্যা হয়। আজ সারাদিন বাইরে ছিলাম তাই কাশি বেড়ে গেছে। গলা ফুলে গেছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। মনে মনে বললাম তুমি যা বলছ, তা সবই আমার জানা। নিজ থেকেই জানতে চাইলাম, কোথায় চিকিৎসা চলছে। জানাল বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। আমি জানালাম, এ সমস্যা আমারো ছিল। যেখানে চিকিৎসা করিয়েছি সে ডাক্তারের নাম বললাম। ছাত্রীটি এবার পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা জানতে চাইল। আমি জানালাম। জিজ্ঞাসা করল কেমন উপকার পেয়েছি। বললাম ৯৫ ভাগ সুস্থ আমি। বেশ খুশি মনে আবারো একই কথা জানতে চাইল। আমিও বললাম একই কথা, ৯৫ ভাগ সুস্থ এখন। এবার সে কত টাকা খরচ হয়েছে তা জানতে চাইল। আমি শুধু তাকে ডাক্তার ফি জানালাম। সে আবারো বলল সব মিলিয়ে কত খরচ হয়েছে। বললাম প্রায় সাত-আট হাজার টাকা। এবার তার মুখের ঝিলিক দেয়া হাসি মিলিয়ে গেল। বললাম হাসপাতালের ঠিকানা লিখে রাখতে। সে শুকনো কণ্ঠে জানাল, মনে থাকবে। আমি বুঝতে পারলাম সেখানে গিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো তার পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি নেই। বাইরের উদ্যম বাতাস পেয়ে ধীরে ছাত্রীটি প্রায় ঘুমিয়ে গেল। বারবারই তার ঘাড়-মাথা আমার শরীরের সাথে স্পর্শ করল। কিন্তু অতীতের মতো আজ মনের ভেতর শয়তান সুযোগ পেল না। তবে ভাবলাম যদি তার জায়গায় আমার এরকম ঘুমঘুম ভাব হতো তাহলে হয়তো এতক্ষণে পুরো বাসজুড়ে চেঁচামেচি শুরু হয়ে যেত। যাক সেসবই চিন্তাধারা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, মেয়েটিকে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবো। কারণ শুধু অর্থের জন্য মানুষ এত কষ্ট পাওয়ার পরও সঠিক জায়গায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারবে না। ভাবতেই মনটায় দুঃখে ভরে গেল। আমরা প্রায়ই বলে থাকি, টাকা হতের ময়লা। কেউবা আবার বেশ তাচ্ছিল্যভাবেই বলে থাকে, জীবনে কি টাকাই সব। কিন্তু জীবনের কঠিন মুহূর্তেই উপলব্ধি করা যায়; আসলে জীবনে টাকাই সব না হলেও, আবার সবই। যদি তাই না হতো, তাহলে টাকার জন্য কেউ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে মরত না। আজ আর্থিক সামর্থ্য নেই বলেই এই ছাত্রীটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। গেন্ডা বাস স্টপেজ পার হতেই আমি নেমে পড়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু পারলাম না মুখ ফুটে সাহায্যের কথা জানাতে, শুধু সমাজব্যবস্থার কারণে। অজানা আশঙ্কা, যদি না আবার কোনো গণঝামেলায় জড়িয়ে যাই। ছাত্রীটির দিকে রইল শুধুই আমার করুণ চাহনি।


আরো সংবাদ




agario agario - agario