২১ মে ২০১৯

ফাতেহপুর সিকরিতে

-

আগ্রার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে মোগল সম্রাটদের অনন্য আর চোখ ধাঁধানো সব নিদর্শনা। পড়ালেখার ফাঁকে একটু ফুরসত মিললেই বেরিয়ে পড়ি তাদের হাতে নির্মিত আশ্চর্য সে স্থাপত্য দর্শনে।
সে দিন ছিল বৃহস্পতিবার। ক্লাস শেষে আমরা ছয় বন্ধু ছুটে চললাম মোগল সম্রাট আকবরের প্রথম রাজধানী ফাতেহপুর সিকরির উদ্দেশে। মাদরাসা হোস্টেল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। একটা মাইক্রো ভাড়া করে চড়ে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল যমুনার পাড় ধরে। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস গাড়ির জানালা গলে কোমল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিল গায়ে। রাস্তার দু’পাশের সুন্দর দৃশ্য দেখে চলছিলাম আমরা। পরস্পর হাসিঠাট্টা আর গল্পগুজবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল দুপুরের অলস সময়টা। ঘণ্টাদুয়েক পর পৌঁছলাম ফাতেহপুর। ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে দিলেন গেট থেকে একটু দূরে। এর আগে আর গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। গল্পে গল্পে কদম বাড়ালাম সামনে। সিকরির রাজমহল নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল এক টিলার ওপর। চড়তে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলাম প্রায়। টিলার ওপর থেকে দূরের গ্রামগুলো অপরূপ হয়ে দেখা দিলো দুই চোখে। অপলক সে অপূর্ব দৃশ্য মনভরে দেখলাম কতক্ষণ। সামনে কদম বাড়াতেই নজরে পড়ল হজরত শাহ সালিম চিশতি র.-এর মাজারের সুবিশাল ‘বুলন্দ দরওয়াজা’র ওপর। গেট পেরোতে আরো কয়েকটি খাড়া সিঁড়ির আশ্রয় নিতে হয়।
দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক ভিড় করেছেন এখানে। ২০০ রুপির বিনিময়ে একজন গাইড সাথে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলাম। গাইড জানালেন, লাল বেলেপাথরে নির্মিত সুবিশাল গেটটি সম্রাট আকবর ১৬০১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন। এর দৈর্ঘ্য ৪৩ ও প্রস্থ ৩৫ মিটার। গেটের ওপরে রয়েছে ছোট ছোট প্রায় ১৩টি গম্বুজ। দেয়ালে খোদাই করে লেখা হয়েছে কুরআনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আয়াত। বাইরে জুতা রেখে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মিলল শুভ্রতায় মোড়ানো হজরত সালিম চিশতি র.-এর মাজার। এর বাম পাশে রয়েছে সুবিশাল জামে মসজিদ আর ডান পাশে লম্বাটে রাজমহল। মাঝখানের বিস্তৃত মেঝে নির্মিত হয়েছে সাদা মর্মরপাথর দিয়ে। মেঝেতে সূর্যের আলো পড়ে চোখে ধাঁধার সৃষ্টি করছিল বারবার।
চত্বরে হাঁটছিলাম আর গল্পে গল্পে গাইড থেকে জেনে নিচ্ছিলাম অভূতপূর্ব এ স্থাপত্যের কিছু ইতিহাস। গাইড জানালেন, সম্রাট আকবর অনেকদিন নিঃসন্তান ছিলেন। পুত্র সন্তানের বাবা হওয়ার তার খুব ইচ্ছা ছিল। তিনি দোয়া নেয়ার জন্য আগ্রা থেকে হেঁটে আসেন হজরত সালিম চিশতি র.-এর দরবারে। সালিম চিশতি র.-এর দোয়ার বরকতে ১৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দে জাহাঙ্গীর জন্মগ্রহণ করেন। সালিম চিশতি র.-এর ওপর খুশি হয়ে সম্রাট আকবর এ মসজিদ, খানকা ও আশপাশের মহলগুলো নির্মাণ করে দেন। ১৫৭১ সালে হজরত সালিম চিশতি র.-এর জীবদ্দশায় মসজিদের কাজ শেষ হয়। মৃত্যুর পর এখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।
মাজারের পূর্ব দিকে রয়েছে আরেকটি বিশাল গেট। সেখান দিয়ে বের হয়ে গাইড আমাদের নিয়ে চললেন সিকরির সৌন্দর্য দেখাতে।
মাজার থেকে সিকরির দূরত্ব মাত্র দুই মিনিটের পথ। জনপ্রতি ৪০ রুপি টিকিটমূল্য। টিকিট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। সিকরির চার দিকেই রয়েছে পাঁচ মাইলব্যাপী বিশাল দেয়াল। জামে মসজিদের মতো সিকরিরও সব স্থাপত্য লাল বেলেপাথরে নির্মিত। পশ্চিম দিকে এগোতেই দেখলাম বেশ লম্বা কয়েকটি হলরুম। ভেতরে আবছা অন্ধকারে ভয় ভয় লাগছিল মনে। একটু আওয়াজ হলেই ভয়ঙ্কর প্রতিধ্বনি ভেসে আসে। গাইড জানালেন, এটা সম্রাট আকবরের ঘোরার আস্তাবল। বাইরে ঘোড়া বেঁধে রাখা হতো আর ভেতরে দেয়া হতো খাবার। ঘোড়ার জন্য সম্রাট এত সুন্দর কক্ষ নির্মাণ করেছিলেন, এটা দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম।
আস্তাবলের উত্তর দিকে রয়েছে একটা সুন্দর কক্ষ। গাইড জানালেন, এটা সম্রাট আকবরের সভাসদ বীরবলের কক্ষ। বীরবল অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন বিধায় সম্রাট তাকে খুব পছন্দ করতেন। সিকরির কোনো কক্ষেই দরজা নেই। দামি পর্দা ঝুলিয়ে দরজার কাজ চালানো হতো সে সময়। সেখান থেকে বেরিয়ে এগিয়ে গেলাম পূর্ব দিকের একই ডিজাইনে নির্মিত আরেকটি কক্ষে। গাইড জানালেন, এটা সম্রাট আকবরের স্ত্রী মরিয়ম বেগমের কক্ষ। এর ছাদের ওপর চড়ার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। কিন্তু সিঁড়ির দরজা তালাবদ্ধ হওয়ায় চড়া হলো না ওপরে। ভেতরে মশাল জালানোর জন্য রয়েছে বেশ কয়েটি খোপ। মরিয়ম মহল দেখার পর গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন সম্রাটপতœী যোধা বাইয়ের খাস কামরা দেখাতে। সেখানে ঢুকতে গেলেও আশ্রয় নিতে হয় সুবিশাল ও সুন্দর একটা গেটের। গেট পেরোতেই সম্মুখভাগে যোধা বাই মহল। অন্যান্য মহল থেকে এ মহলটি বেশ বড়। অদ্ভুত কারুকার্যে ভরপুর দেয়াল। ভেতরে ঢুকে দেখলাম সুন্দর আর আশ্চর্য সব নির্মাণশৈলী। যোধা বাই মহলের চার পাশেই রয়েছে চাকরদের ছোট ছোট কক্ষ। সবই এখন পরিত্যক্ত আর ভূতুড়ে হয়ে পড়ে আছে।
যোধা বাই মহল থেকে বের হয়ে আরেকটু সামনে এগিয়ে দাঁড়ালাম সুন্দর একটা হাউজের পাড়ে। এর পাশেই রয়েছে বেলেপাথরের আরেকটি সুন্দর মহল। গাইড বললেন, এটা সম্রাটের বিশ্রামগাহ। রাজকার্য শেষে এখানেই তিনি বিশ্রাম করতেন। ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম পাথর দিয়ে নির্মিত সম্রাটের শোয়ার পালঙ্ক। মেঝে থেকে পালঙ্কটি বেশ উঁচুতে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে চড়ে পালঙ্কে উঠতেন তিনি। যেখানে এক সয়মের প্রতাপশালী সম্রাটের গা ছুঁয়েছে, সে জায়গাটাকে আমিও একবার ছুঁয়ে দেখলাম। সেখান থেকে বের হয়ে গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন হাউজের অপর পাশে দোতলা একটা কক্ষে। গাইড বললেন, এর নিচতলায় একসময় মাদরাসা ছিল আর ওপর তলায় সম্রাটের দাসীরা গোসল সেরে কাপড় বদল করত। মাদরাসাটি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এর পাশেই পাঁচতলা আরেকটি মহল। গাইড বললেন, এর নাম পঞ্চমহল। এটি সম্রাটের পাঁচজন স্ত্রীর জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। একেকজনের জন্য নির্ধারিত ছিল একেকটা তলা। তারা এগুলোতে উঠে শীতল বাতাস গায়ে মাখতেন আর প্রকৃতির অমল সৌন্দর্য অবলোকন করতেন।
পঞ্চমহলের সামনের দিকে সুন্দর আরেকটি কক্ষ দেখলাম। এগিয়ে গেলাম সে দিকে। এর সম্পর্কে জানতে চাইলে গাইড বললেন, এর নাম দেওয়ানে আম। এতে রাষ্ট্রের সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতো। দরজাটা বন্ধ হওয়ায় এর ভেতর প্রবেশ করা হলো না।
দেওয়ানে আমের ডান দিকে রয়েছে দেওয়ানে খাস। এর ভেতর সম্রাটের ব্যক্তিগত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে পরামর্শ হতো। এ কক্ষের ভেতর অংশটি অদ্ভুত কারুকাজে ভরপুর। মাঝখানে একটা পিলার আর ওপরে চার পাশের দেয়ালে রয়েছে চারটি মোটা পিলার, যা এসে মিশেছে নিচের পিলারটিতে। এর ওপর নাকি সম্রাট আকবর বসে পরামর্শ নিতেন।
দেওয়ানে খাসের সামনে রয়েছে খাজানা মহল। এখানে রাষ্ট্রের খাজানা, স্বর্ণ, রুপা, হিরা ইত্যাদি রাখা হতো; যা ব্রিটিশরা দেশত্যগের সময় সাথে করে নিয়ে যায়।
আরেকটু পূর্ব দিকে এগোতেই দেখা মিলল সবুজে ছাওয়া সুন্দর একটি উদ্যানের। হাজারো ফুলের সমারোহে উদ্যানটিকে মনে হচ্ছিল এক টুকরো জান্নাত। আমাদের ঘোরাঘুরির সমাপ্তি ঘটল এখানেই। সূর্যটা ক্রমেই হেলে পড়ছে পশ্চিমাকাশে। সন্ধ্যাকালীন আঁধারের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে পাখিরা। আমরাও ছুটে চললাম আমাদের গন্তব্যে।


আরো সংবাদ




agario agario - agario