২৩ আগস্ট ২০১৯

বেলাশেষের গান

জীবনের বাঁকে বাঁকে
-


শৈশবে মোমবাতির আলোয় পড়ালেখার কথা খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে লাল আলোর সেই হারিকেনটাকে। আমাদের ঘরে ফিরতে হতো সন্ধ্যার আজান পড়ার আগেই। হাতমুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে মাথা ঝাঁকানো কর্তব্যে পড়ত। মাঠে বন্ধুদের ছেড়ে আসতে বড্ড খারাপ লাগত তখন। মনে মনে মায়ের প্রতি বিরক্ত হতাম। অবশ্য, কোনো দিন প্রকাশ করার মতো সাহস পাইনি বা প্রকাশ করার যে সাহস দরকার, আমাদের তা ছিল না। বাড়ির মহিলারা মাকে বলতÑ মেয়েদের মতো এভাবে ঘরে ঘরে কেউ রাখে? মা জবাব দিতেন না।
আজ বেলা শেষের অবকাশে সবুজের মাঠে বসে সেই ছেলেবেলাকে মনে পড়ছে। আজ আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার তেমন তাড়া নেই। মনের বাঁশি তীব্র শিস দিয়ে বলছে, আজ যদি মা আমাকে ডেকে বাসায় পাঠাতেন। এই যে এখন আজান পড়ছে মসজিদের মাইকে, ছেলেরা ইচ্ছামতো বাসায় ফিরছে, কাউকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে প্রিয় মা। আমার দিব্বি আফসোস হচ্ছে। আজ আর আমাকে কেউ ডেকে নিতে আসে না। বাড়ি ফিরতে ডাকে না কেউ।
শেষবেলার আধমরা আকাশে একাকী চিল ওড়ে। আমার মাথা বরাবর স্থির থাকে কিছুক্ষণ। শূন্যতার ভেতর মিল খুঁজি প্রাণিজগতে। অপলক চেয়ে থেকে আবিষ্কার করি তাকে। মিল পাওয়ার লগ্ন আসন্ন হলে আরেকটি চিল উড়ে যায় তাকে ডেকে। সঙ্গীর সাথে উড়ে বেড়ায় বাতাসের শরীরে ভর করে। ব্যথা বাড়ে সঙ্গীহীন ক্ষতহৃদয়ে।
বাজারের দক্ষিণ কোণে বাচ্চু মিয়ার চায়ের দোকান। ভালো ‘লাল চা’ করে সে। চার পায়া লম্বা টেবিলে বসি। ধূমায়িত চায়ে মানুষেরা গল্প করছে। নানান গল্প। কাজের। অকাজের। হাসি-তামাশার। সুখের। কষ্টের। কেউ গল্পে হাসে। কেউ মুখ ভার করে চিন্তা করে। কেউ সিগারেটে টান দিয়ে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়ে। ধোঁয়ায় চেয়ে চেয়ে হিসাব মেলাতে চায় কেউ। মানুষের জীবনে কি আর সব কিছুর হিসাব মেলে!
চা খাচ্ছি। কাঁধে একটা আর্দ্র হাতের স্পর্শ অনুভব করি। আরে, সুমন। কেমন আছিস? অনেক দিন পর দেখা। শুকিয়ে গেছিস।
Ñ আছি, এক রকম। না থাকার মতোই।
Ñ কেন? কী হয়েছে?
Ñ খুব অভাবে আছি দোস্ত। সিগারেট কেনার টাকা পর্যন্ত নেই। গাড়ির পথ আজকাল হেঁটে যেতে হয়। সেদিন এক বন্ধুর কাছে কিছু টাকা চাইলাম। দিল না। অথচ আমি জানি, সে দিব্বি ভালো আছে। ভালো মাইনে পায়। অথচ তার বিয়ের সময়; আমি তখন কাতারপ্রবাসী। প্রচুর টাকা দিতাম। না থাকলে রুমমেটদের শেয়ার করতাম। তাকে না করিনি কোনো দিন। আর আজ সে আমাকে অবহেলা করছে। হাজারটা বায়না ধরছে। আরো অনেকে আজ এমন করছে। অভাবের সময় কেউ পাশে থাকে না। আমার দিন কি ফিরবে না! ফিরবে। আমি বিশ^াস করি। কী বলব দোস্তÑ আজকাল সময়ও গাদ্দারি করে। প্রেমিকাও অযথা রাগ করে। আমার ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তি নেই। ইচ্ছে করে, মরে যাই। কিন্তু স্বপ্ন আমাকে মরতে দেয় না।
আমি কথা বলি না। মাটিতে চেয়ে থাকি। তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করি। তাকাতে পারি না।
সুমন বলে ওঠেÑ দোস্ত, তুই তো লেখক। পত্রিকায় তোর অনেক লেখা পড়েছি। অবশ্য আজকাল পড়তে পারি না। সিগারেটই খেতে পারি না, আবার পত্রিকা! আমারে নিয়া একখান গল্প লেখ। বেদনার গল্প। আমার জীবন কিন্তু গল্পের ফ্যাক্টরি। আর শোন, গল্পের নামটা আমি দেবো। তোরে এখনই শুনাব। আমাকে সময় দিতেই হবে।
আমি কোনো কথা বলি না। তাকিয়ে থাকি সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর। ধোঁয়ার ভেতর গল্পের পৃথিবী দেখি। পৃথিবী আবিষ্কারের চেষ্টা করি। ওই দিকে সুমন গল্প বলা শুরু করে। আমি তাকে ধরার চেষ্টা করি। সে বলে যায়...।
গল্পের ফাঁকে জিজ্ঞেস করেÑ দোস্ত, গল্পটা লিখবি তো? আমি তাকে আশ্বস্ত করি।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet