১৮ আগস্ট ২০১৯

যখন নামবে আঁধার পাঠক সংখ্যা

-

লোকমান সাহেবের বয়স হয়েছে। এখনো বিয়ে করেননি। কেন বিয়ে করেননি, এই গল্প অবশ্য এখন সবার জানা। মাহমুদার স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবন একা পার করার দৃঢ়সঙ্কল্প নেয়া লোকমান সাহেবকে কাছের মানুষেরা অনেক চেষ্টা করেও বিয়েতে রাজি করাতে পারেনি।
মাহমুদার সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হয়েছিল লোকমান সাহেবের। তখন ১৯৭১ সাল। বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে। হঠাৎ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি হায়েনাদের আক্রমণ। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গ্রামেও তারা হানা দেয়। বারাহীনগর গ্রামের জোয়ান ছেলেরা সিদ্ধান্ত নেয় সবাই মুক্তিযুদ্ধে যাবে। সহযোদ্ধা হিসেবে লোকমান সাহেবও তাদের সাথে যোগ দেন। বয়সে তখন তিনি তরুণ। মাহমুদার হবু বর।
নয় মাসের যুদ্ধ শেষে বন্ধুদের সাথে গ্রামে ফিরে এসে দুঃসংবাদ শোনেন লোকমান সাহেব। মাহমুদাকে নাকি পাকবাহিনী তুলে নিয়ে তাদের ক্যাম্পে আটকে রাখে। তিন দিন শারীরিক নির্যাতন আর ধর্ষণের পর তারা বুলেট চালায় মাহমুদার বুকে। লাশটা ফেলে রেখে যায় গ্রামের খালের নোংরা জলে। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে এই নির্মম গল্প শোনে ভেঙে পড়েন লোকমান সাহেব। বাবা-মা আবার পাত্রী খোঁজেন তার জন্য। কিন্তু অন্য কাউকে আর বিয়ে করার কথা ভাবতে পারেন না লোকমান সাহেব।
অনেকটা সময় বয়ে গেছে। লোকমান সাহেব বাবা মাকে হারান। আপন বলতে তার একটাই ভাই। সে রায়হান। বাজারে তার বড় ব্যবসা। রায়হানকে বিয়ে করান লোকমান সাহেব। রায়হানের বউ হয়ে এই সংসারে আসে রেনু।
২.
সংসারের হাল ধরতে ধরতে রেণু নিজের লাভ-ক্ষতি বুঝে নেয়। ফলে ভাসুর লোকমান সাহেবকে তার আর সহ্য হয় না। মানুষটার সারাদিন কোনো কাজ নেই, বসে বসে পেপার পড়া, টিভি দেখা আর বার্ধক্যজনিত কারণে রোজ মুঠো মুঠো ট্যাবলেট হজম করাটা রেণুর চোখের বিষ হয়ে দাঁড়ায়। এসব দামি ট্যাবলেট কিনতে যে তার স্বামীর মোটা অঙ্কের টাকা যায়, রেণু ঠিকই সেসব জেনে মনে মনে আন্দোলিত হয়। ফলে এই সংসার থেকে লোকমান সাহেবকে তাড়িয়ে দেয়ার মতো একটা বদ চিন্তা তার মাথায় খেলা করে। জ্ঞানী লোকমান সাহেব রেণুর আচরণে আজকাল বুঝতে পারেন যে ছোট ভাইয়ের বউ তাকে সহ্য করতে পারে না।
শুধু রেণু নয়, রায়হানও ইদানীং বড়ভাইকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার কাছে মনে হয় এই মানুষটি এখন সংসারের বোঝা। তাকে সংসার থেকে আলাদা করে দেয়া দরকার। বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালে কেমন হয়!
রাতে রেণুর সাথে এই নিয়ে আলাপ করে রায়হান। কিন্তু রেণু বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষে নয়। ওখানে পাঠালে যে মাঝে মধ্যে খরচপাতির জন্য টাকা পাঠাতে হবে।
Ñভাইজানকে বৃদ্ধাশ্রমে দিও না।
Ñতাহলে কি করব?
Ñএকেবারে শেষ করে দাও।
Ñমানে?
Ñকাল দুপুরবেলায় ভাইজানকে ছল করে মেঘনা সেতুতে নিয়ে যাও। তারপর সেতুর মাঝখান থেকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দাও। ব্যস, ঝামেলা শেষ।
Ñকাজটা কি ঠিক হবে?
Ñএই ছাড়া আর উপায় কী? উনার পেছনে তোমার কত টাকা খরচ হয়, খবর আছে?
কোনো কথা বলে না রায়হান। স্ত্রীর সাথে শলা-পরামর্শ করতে করতে রাত তখন দেড়টা।
৩.
ঝড়ের বেগে সিএনজি চলছে। সিএনজিতে বসে আছেন লোকমান সাহেব আর রায়হান। রায়হান বড়ভাইকে তার বন্ধুর বিয়েতে নিয়ে যাচ্ছে বলে ঘর থেকে বের করে এনেছে। লোকমান সাহেবও টুঁ শব্দ না করে ছোট ভাইয়ের সাথে যেতে রাজি হন। তার মুখটা হাসি হাসি। অনেকদিন নেমন্তন্ন খাওয়া হয় না।
সিএনজি এসে থামে মেঘনা সেতুর মাঝখানে। বড়ভাইকে নিয়ে সিএনজি থেকে নামে রায়হান।
Ñসেকি! এখানে নেমেছিস যে?
Ñভাইজান, আসেন নদী দেখব।
Ñহা হা হা। কী পাগল ভাই আমার!
লোকমান সাহেব সেতুর রেলিং ধরে নিচের নদী দেখছেন। রায়হান সুযোগ খুঁজছে বড়ভাইকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেয়ার। কয়েকবার সুযোগ পাওয়ার পরও সে কাজটি সমাধান করতে পারেনি। তার হাত আর বুক কাঁপছে। অবশেষে এই কাজটি ঠিক হবে না ভেবে সে ভাইকে নিয়ে বাড়ি চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।
Ñবাড়ি যাবি মানে? তোর বন্ধুর বিয়েতে না যাবার কথা! এখানেও বা থামলি কেন?
Ñবিয়েতে যাবো না। চলেন ভাইজান, বাড়ি ফিরে যাই।
Ñহা হা হা।
Ñহাসছেন যে?
Ñআমাকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দিবি না? দে!
Ñমানে?
Ñতোর আর রেনুর সব কথা কাল রাতে আমি আড়াল থেকে শুনেছি ভাই।
Ñইয়ে মানে...
Ñভাই, আমি তোর সংসারের বোঝা মনে হলে আমাকে বলতি। আমি কোথাও না কোথাও চলে যেতাম। ৭১ এর যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি, নিজের বেঁচে থাকার যুদ্ধেও আমি সফল হতাম।
Ñআমাকে ক্ষমা করুন ভাইজান। চলেন আমরা বাড়ি ফিরে যাই।
Ñনা। তোর সংসারে আমার আর যাওয়া ঠিক নয়।
Ñকি বলছেন ভাইজান?
Ñতুই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিস নদীতে ফেলে দিতে। আমি সকালে আমার বন্ধু জহিরকে ফোন করেছি দুপুরে এখানে এসে আমাকে নিয়ে যেতে। তোদের সব কথা জহিরকে বিস্তারিত বলেছি। সে আমাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দেবে। ওখানেই থাকবো।
লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেলো রায়হানের। এরকম পরিস্থিতিতে পড়বে সে, ভাবতেই পারেনি। হঠাৎ একটি সাদা প্রাইভেট কার এসে দাঁড়ায়। জহির উদ্দিন কার থেকে নামলেন। বন্ধুকে দেখে জড়িয়ে ধরেন লোকমান সাহেব। তারপর কারে চেপে বসে দুজনে চলে যাওয়ার আগে জহির উদ্দিন রায়হানকে বললেন, ‘তুমি তোমার ভাইকে এখানে যে উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছ, খুব খারাপ কাজ করেছ। লোকমান তোমাদের মুক্তি দিয়ে এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে। তোমার ভাই একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশের সম্পদ। এই সম্পদ এখন থেকে আমার দায়িত্বে থাকবে।’ রায়হান কী বলবে বুঝতে পারছে না। লোকমান সাহেব কারে উঠে বন্ধুর পাশে বসলেন। কার দ্রুত চলে যাচ্ছে। রায়হান কাতর চোখে কারের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ




bedava internet