২৭ মে ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এক করেছিল পাঠক সংখ্যা

-

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কত বেদনা! কত কথা স্মৃতির পটে জ¦লজ¦ল করছে তার খবর কে রাখে! তারই একটি কষ্টের বর্ণনা। আমার মা মারা যান ১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, পৌঁছে যাই বাড়ি। তখন আমি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী। ওই সময় সারা দেশ প্রতিনিয়ত গরম আর গরম হচ্ছে। বেশ কয়েকদিন পরই বারবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু তা সম্ভব হয় না দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে। একসময় এসে গেল ২৫ মার্চ কালরাত। ঢাকার পরিস্থিতির বর্ণনা সবার গোচরিত। ২৬ কিংবা ২৭ আমাদের শহরে মিলিটারি চলে আসে। আমাদের শহর ঝালকাঠি তখন মহকুমা শহর। শহরের পাশ দিয়ে বাসন্ডা খাল। তারই ওই পাড়ে আমার মামাবাড়ি রামনগর গ্রাম। শহরে মিলিটারি আসবে শুনে আমরা শহরবাসী সবাই যেদিকে পারি পালাই। আমরা গিয়ে উঠলাম মামাবাড়ি। সাথে আব্বাও। আব্বার ১৯৭০ সালে স্টোকের কারণে ডান পা অবশ হয়ে গিয়েছিল। মিটফোর্র্ড হাসপাতালে চিকিৎসায় ছিলেন প্রায় দুই মাস। ওই দুই মাস প্রতিদিন মা কুরআন শরিফ পড়ে আল্লাহকে বলতেনÑ আব্বার আরোগ্য যেন হয় আমার মায়ের জীবনের বিনিময়ে। আল্লাহর কাছে আমার মায়ের বক্তব্য ছিলÑ তিনি আয়রোজগার যেহেতু করেন না সেহেতু তার কোনো সামর্থ্য নেই আমাদের গড়ে তোলার। সত্যিই তাই হলো। জুলাই মাসে আব্বা হাসপাতালে কারো না কারো কাঁধে ভর করে ওয়াশ রুম সেরে আসাতে পারেন, তা-ও পা ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে। মা আব্বাকে নিয়ে বাড়ি গেলেন এবং সুস্থ মা আমার মাত্র ২৮দিন অসুস্থ থেকে পরের বছর মে মাস আসার আগেই মারা গেলেন। আমরা পাঁচ ভাইবোন স্কুল থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী মা-হারা হলাম।
যেদিন শহরে মিলিটারি আসে, তার পরের দিন রাতে শহরে আগুন ধরিয়ে দিলো। এটাও শুনা গেল যে, মিলিটারি এদিকে ধেয়ে আসছে। সে কি আগুনের লেলিহান শিখা! আমরা দেখছি আর দৌড়াচ্ছি। কারো কোনো হুঁশ নেই। মানুষের ¯্রােত আর ¯্রােত। পথে কাঁদা, ডোবা, ঝোঁপ, কাঁটা কোনো দিকেই কারো খেয়াল নেই। দৌড় আর দৌড়। সামনে চিকন চওড়া খাল পড়ল বেশ কয়েকটি। তার উপরেই পাশের পুল বা সাঁকো। ওই খালগুলো নৌকায় করেও মানুষ পালাচ্ছে। আমাদের জানাশোনা মানুষের গন্তব্য যে দিকে সে দিকে যেতে একটি খাল পার হতে গিয়ে দেখা গেল একটি মাত্র বাঁশের পুল; যার উপর দিয়ে এক একজন করে সবাই পার হচ্ছে; এক সাথে দুজন পার হওয়া সম্ভব নয, তা হলে হয়তো বাঁশটি ভেঙে পড়তে পারে। প্রায় সবাই পার হতে পারলেও আমার আব্বা পার হতে পারবেন না। কারণ তাকে কারো না কারো ঘাড়ে হাত দিয়ে চলতে হয়। তখন আব্বার সাথে আমিও থেমে গেলাম। এই থেমে যাওয়া দেখে আমার মামা আমাকে বললেন ‘তোর বাপকে কচু বনে রেখে আয়, নয়তো তুইও মরবি তোর বাপের সাথে’। আব্বা নিজেই কচু বনে ঢুকে গেলেন, আমাকে বললেন ‘মা যাও, আল্লাহ হাফেজ, আর যদি দেখা না হয় তবে মাফ করে দিও’। কিন্তু আমি ঢুকে গেলাম কচু বনে আব্বার সাথে থাকব বলে। এমন সময় আমার গালে পড়ল এক থাপ্পড়। আমার মামার থাপ্পড়টা দিয়ে ঘাড় ধরে এক বাঁশের সাঁকোতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। এখানে এ কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। আমার মামার আমি প্রাণের টুকরো, এমন মামা জীবনে আর কারো দেখিনি। পরিস্থিতির কারণে মামা আমার গালে চড় মারলেন।
যেতে যেতে যেতে যেতে একটি স্কুলঘরে পৌঁছালাম আমরা। রাত প্রায় ১টা । যত্রতত্র নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশু স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। বসে আছি আমিও। এক দেড় ঘণ্টা পরে সবার সামনে কলাপাতা দিয়ে সবাইকে খিচুড়ি দিচ্ছে কয়েকজন মানুষ, আমাকেও দিলেন। সবাই মুহূর্তেই খিচুড়ি খাওয়া শুরু করল। আমি খিচুড়ি সামনে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। ভাবছি আব্বার সাথে আর দেখা হবে না। আমার আব্বা কোনো সাধারণ আব্বা না। অসাধারণ! শুধু এটুকু বলেই আশা করি বোঝাতে পারব যে, আমরা যখন ‘আব্বা’ বলে ডাক দিতাম আব্বা বলতেন ‘জি’। কয়েকজন হারিক্যান নিয়ে আমায় দিকে দৌড়ে আসলেন, বললেন কি হয়েছে? আমার মামা দৌড়ে এসে বললেন ওর বাপকে আমরা কচু বনে রেখে এসেছি। বলতে গিয়ে মামার গলা ভারী হয়ে এলো। ঘোর অন্ধকার । মাথাটা কেমন যেন করছে! এর পর কখন যেন ওখানেই আমি ঝিমিয়ে পড়ে ছিলাম। হঠাৎ টের পেলাম আমার চোখে পানি ছিটানো হচ্ছে। চোখ খুলে দেখি আমার সামনে আব্বা! চোখকে বিশ^াস করতে পারছিলাম না। যেন এক স্বর্গীয় স্বপ্ন! আমার ও আব্বার সেকি সুখের কান্না। জানলাম দু’জন লোক হারিক্যান ও কোদাল নিয়ে আব্বার ওখানে পৌঁছে যায় এবং খালের পাড়ে খাঁজ কাটে আর আব্বাকে মোটামোটি কোলে করে পানির পাশে এনে অপেক্ষা করেন কোনো ছুটে চলা নৌকার আশায়। কিছুক্ষণ পর একটি নৌকাও পেয়ে গেল। আবার খাঁজ কেটে কেটে ওই লোক দু’জন এবং নৌকার দু’ একজন আব্বাকে পাড়ে উঠিয়ে দিলেন। এভাবেই আব্বাকে তারা নিয়ে এলেন।
দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে দেশবাসী যেমন একে অন্যের হয়েছিল, এখন কেন তেমন হয় না?


আরো সংবাদ




Instagram Web Viewer
Epoksi boya epoksi zemin kaplama hd film izle Instagram Web Viewer instagram takipçi satın al/a> parça eşya taşıma evden eve nakliyat Bursa evden eve taşımacılık gebze evden eve nakliyat Ankara evden eve nakliyat
agario agario - agario