২০ মে ২০১৯

অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন অবহেলায় : মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ

স্ত্রী রাফিজা আজিজের সাথে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ -

‘উত্তাল ৭১। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। প্রথম সন্তানের বয়স দুই বছর, দ্বিতীয় সন্তান আসবে পৃথিবীতে। এক দিকে আনন্দের সুখবার্তার প্রতীক্ষা আর অন্য দিকে ভয়াল সেই যুদ্ধের দামামা। পরাধীনতার শেকল মুক্তির প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় রক্ত টগবগ করে উঠল। দেশের টানে পরিবারের মায়া ত্যাগ করলাম।
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে। কখন দেশ স্বাধীন হবে। সব সময় চিন্তা থাকত পাক হানাদার বাহিনী কিভাবে খতম করব। জীবন বাজি রেখে অসংখ্য হানাদার মারলাম। দেশ স্বাধীন হলো। ১৬ ডিসেম্বর বাড়িতে এসেই নবাগত সন্তানের মুখ দেখি।’ Ñ কথাগুলো বললেন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী গ্রামের অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ। বয়স ৮১ বছর। মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে, দেখতে পেলাম রক্ত টগবগ করা একাত্তরের সেই যোদ্ধার চোখেমুখে এক অনন্য উজ্জ্বল দ্যুতির আভা।
জানালেন, ২৬ মার্চ সন্তান জন্ম নিলেও তার মুখ পর্যন্ত দেখিনি। পরিবারের সবাই জানত আমি আর বেঁচে নেই। কেউ কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। যুদ্ধ আমাকে পরিবারের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল কিভাবে দেশ স্বাধীন করব।
মৃত্যুর সাথে সখ্য গড়ে অসংখ্য হানাদার মারলাম। দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আজো মুক্তিযোদ্ধারা না পাচ্ছে প্রকৃত সম্মান, না পাচ্ছে সমাজে মাথা উঁচু করে কথা বলতে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা এখনো মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। অথচ অনেকে যুদ্ধে অংশ না নিয়েও এখন হয়েছে বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা। তাদের দাপটই এখন বেশি। অনেক মুক্তিযোদ্ধারা রয়েছেন অবহেলায়।
মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি তখন পুলিশে চাকরি করি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি শেষে ২৭ মার্চ মেজর সফিউল্লার নেতৃত্বে খাগডোর ইপিআর ঘাঁটিতে অবাঙালি ইপিআর সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে শতাধিক শত্রু খতম করি। শত্রু খতমের পর আরো উদ্দীপ্ত হই। এর পর ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুর ব্রিজের নিকট পাকসেনাদের সাথে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেই। এতে বেশ কয়েকজন হানাদার আমাদের হাতে মারা যায়। তার কয়েক দিন পর ধানুয়া কালামপুর এলাকার কালিহাতি ব্রিজের নিকট এক প্লাটুন ইপিআর এবং এক প্লাটুন পুলিশ ফোর্স, আনসার ও কিছু ছাত্র মিলে পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ চালাই। কিন্তু আমাদের চেয়ে শত্রুদের সৈন্য বেশি থাকায় আমরা পিছু হটি। বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও লতিফ সিদ্দিকী আমাকে সাহায্য করায় সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যাই। শত্রুদের বুলেট আমার কান ছুঁয়ে গেলে অল্পের জন্য রক্ষা পাই। পরে ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে চলে আসি। এরপর জুন মাসে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে ১ নম্বর সেক্টরে যোগদান করে রংপুর ও ভুরুঙ্গামারীসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকসেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। আগস্ট মাসে চলে আসি নিজ জেলা মানিকগঞ্জে। সাটুরিয়া ও ঘিওর থানা কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে প্রথমে সাটুরিয়া থানার দরগ্রামের এলাহি মাস্টার ও ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ দল গঠন করি। সর্বপ্রথম সাটুরিয়া থানা আক্রমণ করে সফল হই। এর কিছু দিন পর বারবাড়িয়া ব্রিজ এবং বগাধর ব্রিজে রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করে সমস্ত গোলাবারুদ দখলে আনি।
সর্বশেষ ১৪ ডিসেম্বর সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ মানরা ব্রিজের সামনে পাবনা, সিরাজগঞ্জ থেকে আরিচা হয়ে পাকবাহিনীর আনুমানিক ২৩৫ সৈন্য হেঁটে ঢাকা যাওয়ার সময় সুযোগ কাজে লাগাই। তখন সিঙ্গাইর থানার তোবারক হোসেন লুডুর দল আমাদের সহায়তা করলে শত্রুদের ওপর হামলা চালাই। সর্বশেষ সম্মুখ এই যুদ্ধে আমাদের এক সহযোদ্ধা চান মিয়া শাহাদত বরণ করেন।
বয়সের ভারে আর নানা অসুখে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ এখন বেশ অসুস্থ; তার স্ত্রীও অসুস্থ। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। বড় ছেলে মঞ্জুরুল আলম কুমিল্লার মুরাদনগর থানার ওসি, ছোট ছেলে জাহাঙ্গীর আলম একটি টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপক। বড় মেয়ে রেবেকা সুলতানার স্বামী সৈয়দুজ্জামান নরসিংদী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আর ছোট মেয়ে রিপা সুলতানা, তার স্বামী বদরুল আলম সোহেল ইউসিবিএল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন।
‘যুদ্ধ শেষে গ্রামের বাড়ি সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লিতে ফিরে আসি। বাড়ির কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি আমি বেঁচে আছি। আমাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের সে কী কান্না। বাবাও হাউমাউ করে উঠলেন। স্বজন আর গ্রামবাসী দেখতে এলো। সবারই চোখ ভেজা। কান্নায় চোখ দুটো ফুলে ওঠা স্ত্রী এগিয়ে এলো, কোলে নবাগত সন্তান। সেদিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর। নবাগত সন্তান বুকে জড়িয়ে ধরি।’ Ñ কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠছিল। পাশে বসা তার স্ত্রী রাজেদা আজিজ আর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। অবুঝ শিশুর মতোই অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করলেন, ’৭১-এর সেই ভয়াল দিনগুলোর কথা। প্রথম সন্তানের বয়স দুই বছর। চার দিকে যুদ্ধের দামামা। অন্তঃসত্ত্বা এবং তারপর ভূমিষ্ঠ সেই শিশুসন্তানকে নিয়ে শত্রুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা যেন আজো তিনি চোখের সামনে দেখতে পান। তবুও মনে কষ্ট নেই একবিন্দুও। কারণ, তার স্বামী একজন স্বাধীনতার সৈনিক। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী তিনি। এ গর্বেই তার বুক ভরে যায়।


আরো সংবাদ