২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শহীদ রফিক স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর

-


ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ। মানিকগঞ্জের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। ভাষাশহীদ রফিকের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২০০৮ সালে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তার জন্মভূমি রফিকনগর এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। এলাকাবাসীর দীর্ঘ দিনের এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়নি।
সরেজমিন সিঙ্গাইরের পারিল গ্রাম অর্থাৎ রফিকনগরে প্রতিষ্ঠিত ভাষাশহীদ রফিক গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, কেউ বই পড়ছে, কেউ পত্রিকা আবার কেউ গল্পগুজব করে সময় কাটাচ্ছে। ছোটদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরাও ছুটে আসছেন রফিক নগরের এই ছোট্ট গাঁয়ে।
শহীদ রফিক গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে রফিকের কোনো স্মৃতি সংরক্ষণে রাখা হয়নি। গ্রন্থাগারে শহীদ রফিকের জীবনী নিয়ে স্বল্প আকারের শুধু একটি বই সংরক্ষণে রাখা হলেও অন্যান্য ভাষাশহীদকে নিয়ে লেখা কোনো বই সেখানে নেই। যার ফলে সেখানকার নতুন প্রজন্ম বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে তেমন অবগত হতে পারছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে অগণিত পাঠকদের।
সেখানে গিয়ে কথা হয় নানা বয়সী এবং নানা পেশার মানুষের সাথে। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা ওয়ালিদ জাহান আকাশ ও তার পরিবারের তিন সদস্য। ওয়ালিদ জানালেন, আমি সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে ছুটে আসি শহীদ রফিকনগরে। এসেই ছুটে যাই ভাষাশহীদ রফিক গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে।
রফিকনগর এলাকার স্কুলশিক্ষার্থী নাহার, ইলমা, রুবাইয়াত হোসেন জানাল, ভাষাশহীদ রফিক আমাদের গ্রামের অহঙ্কার; যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। এখানে আমরা অনেক ধরনের বই পড়ি। কিন্তু ভাষা আন্দোলন ও অন্য শহীদদের নিয়ে লেখা বই নেই। এ কারণে পাঠকসংখ্যা ও দর্শক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পাঠাগার ও জাদুঘরের কথা শুনে দূর-দূরান্ত থেকে পাঠক ও দর্শনার্থী এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কারণ জাদুঘরে শহীদ রফিকের কোন স্মৃতিচিহ্ন নেই।
জানা যায়, মরহুম সংসদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খানের সার্বিক সহযোগিতায় ও সে সময়ের ইউএনও আশরাফ আলীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৯৫ সালে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে উপজেলা চত্বরে টিনের ঘরে রফিক স্মৃতি পাঠাগারের কার্যক্রম চালু করা হয়। দীর্ঘ দিনের নাজুক অবস্থা কাটিয়ে পাঠাগারে নিজস্ব তহবিলের ৩ লাখ টাকা ও সরকারি অনুদান দিয়ে ২০০৬ সালে সে সময়ের ইউএনও দেলোয়ার হোসেন উপজেলা চত্বরে পাঠাগারের একতলা পাকা ভবন নির্মাণ করেন। ২০০৮ সালের ১৫ মে বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিক্রমে ভাষাসৈনিক রফিক উদ্দিন আহমদের স্মৃতিকে চিরজাগ্রত রাখতে তার জন্মস্থান সিঙ্গাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের ‘পারিল’ গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর নামকরণ করা হয়েছে এবং সেখানে এক বিঘা জায়গার ওপরে গড়ে উঠেছে শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। উল্লেখ্য, এই এক বিঘা জায়গাটি দান করেন লে. কর্নেল (অব:) মজিবুল ইসলাম (পাশা)। জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং এই মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল। বেসরকারি সংস্থা প্রশিকা শহীদ রফিক জাদুঘর স্থাপন করে ভাষাশহীদ রফিকের নিজ বাসভবনে। রফিকের বেশ কিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে এখানে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং প্রশিকাসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে দেয়া প্রায় ১২ হাজারের মতো বই রয়েছে এ জাদুঘরে।
মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট গোলাম মহীউদ্দিন বলেন, সরকার শহীদ রফিকের নামে তার নিজ গ্রামে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তার বসতবাড়িতে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরো বই যেন পর্যাপ্ত থাকে, সে বিষয়ে অবশ্যই জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শহীদ রফিকের স্মৃতি হিসেবে নকশি কাঁথার রুমাল, ম্যাট্রিকের সনদ, কলমসহ আরো যা আছে সেগুলো শহীদ রফিকের পরিবারের ছোট ভাইয়ের কাছে রয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। পরিবারের সাথে কথা বলে সেই স্মৃতিগুলো গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে রাখার কাজটিও আমরা করব।


আরো সংবাদ