১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

হারিয়ে যাচ্ছে ঢেঁকিশিল্প

-

কালের আবর্তনে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো। তেমনি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকিশিল্প আজ হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ঘরে এখন আর ঢেঁকি আগের মতো চোখে পড়ে না। ভোরে আজানের সাথে সাথে স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির শব্দ এখন আর ছড়িয়ে পড়ে না চার দিকে। চোখে পড়ে না বিয়েশাদির উৎসবে ঢেঁকি ছাঁটা চালের ক্ষীরপায়েস রান্না। অথচ একদিন গ্রাম ছাড়া ঢেঁকি বা ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কল্পনা করাও কঠিন ছিল। যেখানে বসতি সেখানেই ঢেঁকি কিন্তু আজ তা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে মুছে যাচ্ছে। এই গ্রামবাংলার ঢেঁকি নিয়ে কবি-সাহিত্যিক রচনা করেছেন কবিতা গল্প। বাউলরা গেয়েছেন গান। গ্রামের প্রায় বাড়িতেই ঢেঁকিতে ধান ভানত। জীবিকা অর্জনের মাধ্যমও ছিল। এটি আগের চেয়ে তা আজ দেখা যায় না। অনেকই এ পেশায় জড়িত ছিল। বর্তমানে তারা পেশাচ্যুত। তাদের অনেকেই এখন কষ্টে দিনাতিপাত করছে। এ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের বলা হয় তারানি। আগে ঢেঁকিশিল্পে জড়িত ছিল অনেকে। এরা সবাই বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। কেউ কাঁথা সেলাই কেউবা দর্জির কাজ করেন, আবার কেউ কেউ ভিক্ষা বৃত্তি ও ঝির কাজ করছে। করছে হাঁস- মুরগি পালন। গ্রামের লোকেরা এখন আর আগের মতো ঢেঁকিতে ধান ছাঁটাই করে না। প্রায় গ্রামে মিনি রাইস মিল গড়ে উঠেছে। সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আবির্ভাব ঘটেছিল। আবার গতিময় সভ্যতার যাত্রা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেই ঢেঁকি বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে। একে না মেনে উপায় নেই। মহিলারা সংসারে শত অভাব অনটনের ভেতরেও নিজেদের ক্লান্তি ঢাকার জন্য ঢেঁকির তালে তালে গান গেয়ে ধান ছাঁটাইয়ের কাজ করত। এক দশক আগেও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি চোখে পড়ত। গৃহস্থের বাড়িতে একাধিক ঢেঁকি থাকত ঘরের পাশে বাড়তি একটি চাল দিয়ে তৈরি করা হতো ঢেঁকিঘর। গ্রামের মহিলাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত কে কত ভোরে উঠে ঢেঁকিতে পা দিতে পারবে এবং কে কত বেশি ধান ছাঁটাই করতে পারে। কৃষক বধূর ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভেঙে যেত কৃষকের। কৃষক লাঙল কাঁধে গরু নিয়ে ছুটতেন মাঠ পানে। গৃহিণী হাঁস-মুরগি ছেড়ে দিতেন। এগুলো ছুটে যেত ঢেঁকিশালার দিকে খাদ্যের সন্ধানে। ভারানিদের তারা খেয়ে কক শব্দ করতে করতে পালাত সেখান থেকে। ধান ভানার সময় মহিলাদের হাতের চুরির ঝনঝন শব্দ হতো। শব্দ হতো পায়ের নূপুরের। সব মিলিয়ে সৃষ্টি হতো এক সঙ্গীতমুখর পরিবেশ। ঢেঁকি কাঠের তৈরি। কুল, বাবলা, জান, গাব প্রভৃতি কাঠ দিয়ে ঢেঁকি তৈরি করা হতো। সাড়ে তিন থেকে চার হাত দৈর্ঘ্য এবং পৌনে এক হাত চওড়া। মাথার দিকে একটু পুরু ও অগ্রভাগ সরু এর মাথায় এক হাত লম্বা একটি কাঠের দস্তা থাকে। একে বলে রেনু বা ছিয়া। এর মাথায় লাগানো থাকে লোহার গোলা। গোলার মুখ যে স্থানটি মাটি স্পর্শ করে তাকে বলে গড়। এটা চার পাঁচ ইঞ্চি গর্ত। গর্তের ভেতরে স্থাপিত হয় কাঠের একটি অংশ। অনেক কাঠের পরিবর্তে পাথর খণ্ড ব্যবহার করেন। তবে যাই ব্যবহার করা হোক না কেন সেটি হয় খুব মসৃণ এই গর্তের ভেতর দেয়া হয় ধান। ঢেঁকির পেছনে ঢেঁকিতে ধান ভানতে সাধারণ দু’জন লোকের প্রয়োজন। একজন ঢেঁকিতে ধান দেয় গাড়ের (গর্তের) ভেতর ধান নাড়াচাড়া করে। একজন পাড় দেয়। অনেক সময় বেশি ধান হলে তা দু’জনের দ্বারা হয়ে ওঠে না, তখন তিনজন লাগে। দু’জন দু’জন একসাথে পাড় দেয়। একজনে ধান ওলটপালট করে দেয়। এভাবে কয়েকবার ধান পাড় দিয়ে খোসা আলাদা করার পর কুলো দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। তখন বের হয় চাল। এতে যথেষ্ট পরিশ্রমও বটে। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে ঢেঁকি হয়তো অপরিচিত। ঢেঁকির নাম শুনেছেন অনেকেই কিন্তু চোখে দেখেননি এমন লোকও আছে। আমাদের গানে ও প্রবাদে অনেকবার ঢেঁকির কথা এসেছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত গান রচনা করেছেন। পায়ের পরশে পেয়েছে কাঠের ঢেঁকির প্রাণ। তা ছাড়া ঢেঁকি নিয়ে যে প্রবাদ আছে তা আমরা অহরহ ব্যবহার করি। যেমন অনুরোধে ঢেঁকি গেলা। অসম্ভব কোনো কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার হয়। অপদার্থের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় আমরা কাঠের ঢেঁকি। ঢেঁকিশিল্পের শব্দের প্রতিধ্বনি গ্রামবাংলার চিহ্নিত হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে।

 


আরো সংবাদ