১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

প্রজাপতির মেলা

-

প্রজাপতির উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো এমন মনোমুদ্ধকর দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে। প্রকৃতিতে এমন দৃশ্য আজকাল খুব একটা চোখে পড়ে না। গ্রামাঞ্চলে ঝোপজঙ্গলে এমন দৃশ্য চোখে পড়লেও শহরে খুব একটা দেখা যায় না বললেই চলে। তাই নতুন প্রজন্মের সাথে প্রজাপতির পরিচয় করিয়ে দিতে ২০১০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে উদযাপিত হয়ে আসছে প্রজাপতি মেলা। এ মেলায় প্রজাপতি সম্পর্কে যেকোনো খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরেন আয়োজকরা। বাতাসে ডানা মেলে উড়ছে হরেকরকম প্রজাপতি। বিচিত্র ও মনোমুগ্ধকর এদের গায়ের রং। মেলায় গেলে দেখা যাবে একসাথে শত শত প্রজাপতির চঞ্চল ওড়াওড়ি। প্রজাপতি যে শুধুই সৌন্দর্য ছড়াই শুধু তাই নয়, এরা পরাগায়নের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উড়লে আকাশে প্রজাপতি প্রকৃতি পায় নতুন গতিÑ এ সেøাগানে গত ২ নভেম্বর শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান হলের সামনে অনুষ্ঠিত হয় প্রজাপতি মেলা। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতনতা ও প্রজাপতি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বাড়াতে দিনব্যাপী প্রজাপতি মেলার উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এ মেলা সবার জন্য উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। এ ক্যাম্পাসকে প্রজাপতির আবাস হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মেলার আহ্বায়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: মনোয়ার হোসেন বলেন, প্রকৃতি ভালো থাকলে প্রজাপতি ভালো থাকবে আর প্রজাপতি ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। দেশের প্রায় ৬০০ প্রজাতির প্রজাপ্রতি রয়েছে, আমরা ৩০৫ প্রজাতির প্রজাপতি চিহ্নিত করেছি। পৃথিবীতে ১৬ গোত্রের প্রজাপ্রতি রয়েছে। আমাদের দেশে আছে ১০ গোত্রের। যা নিয়েই আমরা গবেষণা করছি। এসব প্রজাপতি সংরক্ষণে মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে। তাই এ মেলার আয়োজন। রাজধানীর অদূর গাজীপুর থেকে আগত সাজ্জাদ করিম নামের এক দর্শনার্থী জানান, এ ধরনের মেলা আমাদের দেশে দ্বিতীয়টি আর নেই। যে কারণে উৎসুক জনতা প্রতি বছর প্রজাতির মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকে। সাভার থেকে আসা নাইমা ইসলাম জানান, প্রজাপতির মেলা থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। বিশেষ করে শিশু কিশোরদের জন্য শিক্ষণীয় একটি মেলা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় বছরে অন্তত একবার প্রজাপতির মেলার আয়োজন করতে পারলে অনেকেই প্রজাপতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। মানিকগঞ্জ থেকে আসা সোহান নামে এক ব্যক্তি জানান, অযতেœ অবহেলায় যেসব প্রাণী বেড়ে উঠছে তাদের সম্পর্কে আমরা খুব একটা বেশি জানার চেষ্টা করি না। কিন্তু তারাই পরিবেশের ভারভাস্য টিকিয়ে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ মেলায় এসে প্রজাতি সম্পর্কে জানা অজানা অনেক তথ্য জানতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। এবারের মেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আয়োজনে ৮০ থেকে ৮৫ প্রজাতির প্রজাপতি প্রদর্শিত হয় যা দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে দেখেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামের ভেতর ও বাইরে অসংখ্য প্রজাপ্রতির আলোকচিত্র প্রদর্শনী করা হয়। প্রকৃতির এ অপরূপ দেখতে ক্যাম্পাসে ভিড় করে হাজারো দর্শনার্থী। এবারের মেলায় শিশু কিশোরদের জন্য প্রজাপতিবিষয়ক ছবি আঁকা, প্রতিযোগিতা, প্রজাপ্রতির আলোকচিত্র প্রদর্শনী, প্রজাপ্রতির হাট দর্শন, প্রজাপতির আদলে ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতা, বারোয়ারি বিতর্ক, প্রজাপতির চেনা প্রতিযোগিতা ও প্রজাপতি বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া মেলায় অতিথিদের জন্য জালেঘেরা প্রজাপতি প্রদর্শিত হয়। ফুলের ওপর ভর করা এসব প্রজাপতি দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে যায়। লাল, নীল, হদুল, বেগুনিসহ নানা রঙের প্রজাপতি রঙিন পাখা মেলে ওড়াওড়ি করে রং ছড়ায় চারপাশে। এসব প্রজাপতির রঙের জাদুতে মোহিত হন দর্শনার্থীরা। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা ক্যাম্পাসের ভিতর অবস্থিত প্রজাপতির বিভিন্ন পার্ক ঘুরে ঘুরে দেখেন। প্রকৃতির সাথে প্রজাপতির যেন নিবিড় সম্পর্ক জড়িয়ে আছে, তাই প্রকৃতিতে প্রজাপতি নেই এমনটা কল্পনা করা অনেকটা দুরূহ। প্রজাপতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এ বছর প্রজাপতি গবেষণার বিশেষ অবদানের জন্য জীবন বিকাশ কার্যক্রমকে বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা সরকার বর্ষাকে ইয়াং বাটারফ্লাই ইনথুসিয়াস্ট ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের প্রথম শুক্রবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রজাতির মেলার আয়োজন করে আসছে। প্রজাপতির মেলার প্রবর্তক প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো: কবিরুল বাশার।

 

 


আরো সংবাদ