২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

প্রেমময় শরৎ

-

ষড়ঋতুর চাদরে মোড়ানো বাংলাদেশের শরীর। ঋতুর ভিন্নতায় দেশের গায়ের রঙ পরিবর্তন হয়। প্রকৃতি, আবহ, রূপে লাগে নানা রকম ছবির চেহারা। ঋতুর মোহনীয় ঘ্রাণ আর সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। সুন্দর নীলাকাশ ও কোমল জমিনে আকীর্ণ থাকে ঋতুর আবেশ। ছয় ঋতুর তৃতীয় ঋতু শরৎ। ভাদ্র-আশি^ন দুই মাসÑ শরৎ ঋতুর সংসার। স্বচ্ছ নীলাকাশ, জলহারা সাদা মেঘের ভেলা, নদীর দু’ধারে শুভ্র কাশফুল, বিলে শাপলা, বাড়ির উঠোনে শিউলি, জ্যোৎ¯œা¯œাত রাত, মাঠে সবুজের বিস্তীর্ণ শামিয়ানা, মায়াবি পরিবেশ, আর প্রভাতে ঘাসের ডগায় সফেদ শিশির তো শরৎ ঋতুর দৃশ্য। শরতের দৃশ্য মনকে সুখে আর আনন্দে করে মাতোয়ারা। হৃদয়কে ভালো লাগার শিহরণে রোমন্থন করে। মনবিহঙ্গ শরৎ গগনে উড়ে বেড়ায় অবারিত। তাই তো শরৎ ঋতুর রানী। শরতের নামজুড়ে মিশে আছে সুন্দরেরা। শরৎ-সুন্দরের মোহনায় পুলকিত না হয়ে পারে না কোনো হৃদয়।
প্রিয় আকাশে নীল রঙের দেখা মেলে শরতে। আকাশে গাঢ় নীল, নীলের মাঝে পেজা তুলোর মতো শুভ্র মেঘের ওড়াউড়ি একমাত্র শরতের দৃশ্য। নীলের বুকে শুভ্র মেঘখণ্ডের উড়ে বেড়ানো যেন স্বচ্ছ নীল জলে সাদা হাঁস। দূর দিগন্তের প্রান্ত ছুঁঁয়ে থাকা সাদা মেঘ তো পাহাড়ে জমে থাকা বরফস্তূপ। নীলাকাশ আর শুভ্রমেঘ স্পর্শ করে ছুটে চলা চিল কিংবা নাম না জানা পাখিরা তনুমনে জাগিয়ে যায় ভালোবাসার অনাবিল ফোয়ারা।
কাশফুল শরৎকালের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রিয়তম আকর্ষণ। নদীর ধারে লম্বা সবুজ ডগায় ফোটে নরম কোমল কাশফুল। বাতাসের মৃদুমন্দ তালে দুলে ওঠে ফুলেরা। লকলকে বাড়ন্ত দোলায়িত কাশফুলের শুভ্রতা চোখকে ধাঁধিয়ে দেয়। কাশফুলের স্পর্শ শিহরণে জাগায় অপার্থিব সুখ। অমন নরম শরীর যেন খোসা ছেড়ে সদ্য জন্ম নেয়া শিমুল তুলো। ফুলের সৌন্দর্যের মোহনায় হারিয়ে যায় তরুণ-তরুণীর মন। নদীর পাড় ধরে ঘুরে বেড়ানো মাঝি জেলেরা কাশফুলে মোহগ্রস্ত হয়ে সুর তোলে ভাটিয়ালি গানের। গ্রামে দেখা যায়Ñ কাশফুলের তৈরী বালিশের খুব কদর। কাশফুলের নরম বালিশে মাথা রাখলেই যেন নেমে আসে স্বর্গের ঘুম।
শরৎকালে হৃদয় ক্যানভাসে ভেসে ওঠে শৈশবের স্মৃতি। পাড়ার বন্ধুরা মিলে ছোট ডিঙি নিয়ে দলবেঁধে শাপলা কুড়ানোর অতীত, গ্রামীণ ছেলেবেলার গল্পজুড়ে থাকে। বিলে ফুটে শাপলা। শান্ত জলের বুকে সতেজ তরতাজা ফুটন্ত শাপলা মনকে উতলা করে দেয়। ফুলে সজ্জিত বিল যেন স্বপ্নের ফুলের বাগান। শরতের এই দিনে বাড়ির উঠোনে ফুটে শিউলি বা শিফালি। শালুক, পদ্ম, জুঁই, কেয়া, কামিনী, মালতি, মল্লিকা, মাধবী, ছাতিম ফুল, দোলনচাঁপা, বেলি, জারুল, নয়নতারা, ধুতুরা, ঝিঙে, স্থলপদ্ম, বোগেনভেলিয়াসহ নানা রকমের ফুলে হেসে ওঠে গ্রামবাংলার রূপ।
হাসির রেশ লাগে কৃষাণীর ঠোঁঠেও।
শরতের সকাল; বিমুগ্ধতার নতুন জগৎ। সকালের আবহাওয়া নরম কোমল। হৃদয়জুড়ানো সমীরণ বইয়ে চলে পৃথিবীর সমস্ত শরীরে। শরৎপ্রাতে সবুজের আগায় ঝরে পড়ে শুভ্রশিশির। প্রথম সূর্যের ¯িœগ্ধ আলো যখন শিশিরভেজা সবুজে পড়ে, তখন শিশির বিন্দু লাগে মুক্তার মতো। মনে হয়, কোনো ফর্সা রমণী হিরার নাকফুল পরে হাসছে।
শরৎঋতুতে পাল তোলা ছোট ছোট নৌকা ঘুরে বেড়ায় নদীজুড়ে। জেলেরা নির্বিঘেœ মাছ ধরে। বাঁশঝাড়ে বাচ্চা তুলে কালো ডাহুক। বড় পুকুরে জারুলগাছে বসে মাছরাঙা। এই শান্ত নদী জেলেদের বেশ প্রিয়। পাল তোলা নৌকার হাল ছেড়ে পাটাতনে গা ভাসিয়ে মাঝি গায় অলস দিনের গান। সুর তোলে গলা ছেড়ে। মাঝির সুরে নদীর মাছেরা ছুটে। পানকৌড়ি উড়ে চলে। বকেরা শুভ্রতার পাল ছড়িয়ে ঘুরেফিরে এদিক ওদিক।
রাতের আকাশে শরৎ জ্যোৎ¯œা বিলায়। অমল ধবল জ্যোৎ¯œায় ভেসে ওঠে পৃথিবীর ছবি। সুন্দর চাঁদ-তারার নিñিদ্র কান্তি ঢলে পড়ে জগতের পাড়া-মহল্লায়। জগতের শরীর ¯œাত হয় কান্তির সফেদ আলোয়। জ্যোৎ¯œার নীলাকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা যখন ভেসে যায়, তখন জ্যোৎ¯œাবিলাসী মন আনন্দে পুলকে আত্মহারা হয়ে যায়। রাতের আঁধারের বুক চিরে উড়ে বেড়ায় জোনাকির দল। ঝিঁঝিরা টানা সুর করে ডেকে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙে।
শরতে গাছে তাল পাকে। গ্রামে চলে বাৎসরিক তালপিঠার উৎসব। যতেœ তালের রস নিংড়ায়ে বানানো হয় তালপিঠা। তালপিঠার গন্ধে ম-ম করে সারা বাড়ি। তালপিঠায় নতুন করে জামাতাকে নিমন্ত্রণের রেওয়াজ আছে গ্রামে।
শরৎ উৎসবেরও ঋতু।
শরতের অপার সৌন্দর্যের মোহনায় কবিতা লিখেছেন কবি-সাহিত্যিকেরা। তাদের চিন্তা-চেতনাকে গ্রাস করেছে শরতের প্রকৃতি। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের কবিদের থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের কবিরা এঁকেছেন শরতের কথা। কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ বলেছেনÑ ‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি/ছড়িয়ে গেল ছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি/শরৎ, তোমার শিশির-ধোয়া কুন্তলে/বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে/আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।’
শরৎ বন্দনায় এগিয়ে রয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। গেয়েছেন নিখুত শরতের রূপ। ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসা শিউলি বিছানো পথে/এসো ধুইয়া চরণ শিশির এসো অরুণ কিরণ রথে/দলি শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল/নীল লাল ঝরায়ে ঢলঢল এসো অরণ্য পর্বতে।’ শরতের উদারতায় ভেসেছেন কবি আল মাহমুদ। তার কাব্যে লিখেনÑ ‘বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে শরতের উদারতা, মেঘ ভেসে যায় মাথার ওপরে বৃষ্টির ছোঁয়া দিয়ে, ইচ্ছা হয় না ঘরের ভেতর বসে থাকি সারাদিন, কিন্তু বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা টান লাগে সারা বুকে, মনে হয় যেন আমার বক্ষে কান পেতে আছে কেউ, আজ সারা দিন হাওয়ার মাতম বইছে বাঁধন ছিঁড়ে।’
শরৎ বাঙালির প্রেমের ঋতু। ভালোবাসার ঋতু। উৎসবের ঋতু। সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ঋতু। প্রকৃতি পরিবেশকে মায়াময় আর ¯িœগ্ধ করার ঋতু। শরতের নীলাকাশের মতো স্বচ্ছ নীল আর কাশফুলের মতো শুভ্র এবং প্রকৃতির মতো শান্ত কোমল ও পবিত্র হোক আমাদের মন-মনন।


আরো সংবাদ