১৯ নভেম্বর ২০১৮

জীবন পাতার অনেক খবর

চারাগল্প
-

শাজাহান সাহেবের আলিশান বাড়ির অভিজাত সোফায় বসে আছেন কাশেম। আজ তেরো বছর পর এই বাড়িতে এসেছেন তিনি। সেই যে তেরো বছর আগে এক চৈত্রের সন্ধ্যাবেলায় মেয়ে নাভানাকে এই বাড়িতে এনে শাজাহান সাহেবের কাছে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছেন, এত বছর পর আজ আবার এসেছেন। না জানি মেয়েটা এতদিনে কত বড় হয়েছে! মেয়ের কথা ভাবতেই চোখে পানি চলে এলো কাশেমের। টাকার লোভে একদিন তিনি পিতৃত্বকে পরোয়া না করে নিজের শিশু বয়সের মেয়েকে শাজাহান সাহেবের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে আজো নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না। একদিন তিনি কতই না অমানুষ ছিলেন। সেসব ভাবতে গেলে আজো নিজেকে ধিক্কার দেন। স্ত্রী নূর নাহারের কোল থেকে তিনি শিশু মেয়ে নাভানাকে কেড়ে এনে নিঃসন্তান শাজাহান সাহেবের কাছে বিক্রি করে নগদ দশ হাজার টাকা নিয়ে অভাবের সংসারের হাল ধরেছেন। অভাবে পড়লে মানুষকে কখনো কখনো অমানুষও হতে হয়।
চার মাস আগে নূর নাহার মারা গেছে। স্ত্রীর মৃত্যু বড় একা করে দিয়েছে কাশেমকে। অভাবে না হয় টাকার জন্য মেয়েকে বিক্রি করেছেন, কিন্তু মেয়ের জন্য যে মনটা সব সময় জ্বলতো। দিন দিন সংসার থেকে অভাব দূর হতে থাকে। ভালো কোম্পানিতে চাকরি পান কাশেম। মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা আসে। সেই মোটা অঙ্কের টাকা থেকে দশ হাজার টাকা তিনি আলাদা করে রেখেছেন। সে টাকা নিয়ে প্রায়ই কাশেম শাজাহান সাহেবের নাভানা গ্রুপ অব কম্পানিতে যেতেন টাকা ফিরিয়ে দিয়ে মেয়েকে আনার জন্য। কিন্তু নিঃসন্তান শাজাহান সাহেব কখনো কাশেমের প্রস্তাব মেনে নেননি।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর ঘরটা বড় খালি হয়ে গেল। মেয়েকে নিয়ে এ খালি ঘর পূর্ণ করতে আজ কাশেম সরাসরি চলে এসেছেন শাজাহান সাহেবের বাড়িতে। পকেটে তার দশ হাজার টাকা। নাভানাকে আজ তিনি নিয়েই যাবেন।
ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতলা থেকে নেমে এলেন শাজাহান সাহেব। পকেট থেকে দশ হাজার টাকা বের করে হাতে নিয়ে বসে থাকা কাশেমকে দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন কাশেমের এখানে আগমনের কারণ।
Ñনাভানাকে নিতে এসেছো, তাই না?
Ñজ্বি। আজ আর খালি হাতে যাবো না।
Ñখালি হাতেই যেতে হবে।
Ñনা। টাকার অভাবে একদিন মেয়েকে বিক্রি করেছি সত্য, আজ আমার টাকা হয়েছে। এই নিন আপনার দশ হাজার টাকা।
শাজাহান সাহেব উল্কার মতো তেড়ে এসে কাশেমের গালে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিয়ে ধাক্কাতে ধাক্কাতে কাশেমকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তেজী গলায় বললেন ‘এখানে আর কোনোদিন নাভানার আবদার নিয়ে এলে তোমাকে পুলিশে দেবো। পিতৃত্ব বোধ তোমার আছে? থাকলে তেরো বছর আগে নাভানাকে আমার কাছে বেচতে না।’ কাশেম কাঁদতে কাঁদতে চলে যাচ্ছেন আর ভারী গলায় বলছেন ‘আমার মেয়েকে আমি আজ হোক আর কাল হোক, এখান থেকে নিয়েই যাবো। আপনি দেখবেন সাহেব।’
সদর দরজা অতিক্রম করে কাশেম চলে গেলেন। কাশেমের কথাগুলো শুনে ভয় পেলেন শাজাহান সাহেব। কাশেম যদি সত্যি সত্যি নাভানাকে কোথাও থেকে তুলে নিয়ে যায়, তাহলে তিনি কাকে মেয়ের আদরে বড় করবেন! স্ত্রী জেসমিন তো আর জীবনে মা হতে পারলেন না। নাভানা আর জেসমিনকে ঘিরেই যে শাজাহান সাহেবের জীবন।
২.
নাভানাকে এখন আর শাজাহান সাহেব একা একা কোথাও বের হতে দেননা। স্কুলে মেয়েকে নিজেই দিয়ে আসেন আবার নিজেই নিয়ে আসেন। যতক্ষণ কাস চলে, শাজাহান সাহেব বাইরে বসে থাকেন। তার খুব ভয় হয়, কাশেম যদি সত্যি সত্যি নাভানাকে...!
নাভানা এখন সিক্সে পড়ে। সে জানে না কে তার আসল বাবা! জীবন পাতার অনেক খবর তো অগোচরেই থাকে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে নাভানা জেনে এসেছে জেসমিন আর শাজাহান সাহেব তার বাবা-মা।
কাল রাতে শাজাহান সাহেব স্বপ্নে দেখেন কাশেম নাভানাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি কাশেমের পিছু পিছু দৌড়াচ্ছেন। কাশেমের কোলে নাভানা। নাভানা ‘বাবা বাবা’ বলে কাঁদছে। কাশেম নাভানাকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। স্বপ্নের এ পর্যায়ে ঘুম ভেঙে যায় শাজাহান সাহেবের। মাঝ রাতে নাভানার ঘরে আসেন তিনি। নাভানা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এক গ্লাস পানি খেয়ে শাজাহান সাহেব আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আচ্ছা, কাশেম যদি স্বপ্নের মতো একদিন সত্যি সত্যি নাভানাকে নিয়ে পালিয়ে যায়! না, তাকে সে সুযোগ দেয়া হবে না। এর একটা মীমাংসা চাই।
৩.
অন্ধকারে কারা যেনো পথ আগলে দাঁড়ায় কাশেমের। কাশেম জানতে চায়Ñতোমরা কারা? মুখোশধারী যুবকগুলো বলেÑআমরা তোমার মৃত্যু দেবতা। শাজাহান সাহেব আমাদেরকে ভাড়া করেছেন তোমাকে মেরে ফেলার জন্য।
কাশেম দৌড়াচ্ছেন। পিছু পিছু মুখোশধারী যুবকগুলোও। তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র। দৌড়তে দৌড়তে কাশেম লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। তার শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যুবকগুলো। তারা এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে কাশেমকে। রক্তে মাখামাখি হয়ে যায় কাশেম।
পরদিন অজ্ঞাত এক লোকের লাশ রাস্তা থেকে তুলে নেয় পুলিশ। এই লোক কে বা কারা খুন করেছে, পুলিশ তার কিছুই জানে না। বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ দাফন করে ফেলে।
Ñআমিশাপাড়া, নোয়াখালী।


আরো সংবাদ