২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

হারানো কড়চা

-

সবাই তখন ছোট। বুঝতাম না তেমন কিছু। সবার মধ্যে দুরন্তপনা হইহুল্লোড় বেশ ছিল। বাড়ির চাতাল পেরিয়ে, মাঠ মারিয়ে, নদীর স্রোত ভেঙে হরদম ছুটে বেড়াতাম গ্রামের প্রতিটি বাঁকে। মফস্বলের বিন্দু বালুর সঙ্গেও আমাদের মিতালি ছিল ভীষণ গভীর। কিশোরদের খেলার মাঠে ছিলাম অধিনায়ক, কলেজের ভিপি, জিএসের মতো প্রাইমারিতে ছিলাম নেতা। তখন আনন্দ ছিল আমাদের জীবনের প্রধান উপজীব্য। সবাই চলতাম এক সঙ্গে, এক পথে, কাঁধে হাত দিয়ে, পাখির মতো গলায় গলায় ভাবে। শেষে একবার পোশাকেও দেখালাম আমাদের ঐক্যের সংহার।
কিন্তু আজ। সময়ের ভেলায় চেপে, জীবনের বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে আমরা এখন কে কোথায়? বছর ঘুরে বছর শুরু হয়, তবু কারো দেখা নেই। এই ইলেকট্র্রিকের যুগে কথা হয় না সপ্তাহ পেরিয়ে মাসেও। জীবন কত বৈচিত্র্যময়! ব্যস্ততায় ঘেরা। আমরাও কত অদ্ভুত!
অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বেদনার দগ্ধ ছুরিকাঘাতে ভেতর-বাহিরকে বহুখণ্ডিত করে কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে বহু দূরে বিবাগীর মতো জীবনযাপনের কথা তো আদৌ ছিল না। প্রাইমারি স্কুুলের শহীদ মিনারের মেঝেয় বসে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার যে সৌধ আমরা নির্মাণ করেছিলাম, কচিকাঁচা মনের নির্ভেজাল প্রণয় দিয়ে তাতে আজ বোধ হয় ছারপোকা-ঘুণে ধরেছে।
২০০৪ সাল। আমি সবে প্রাইমারিতে ঢুকালাম। ভর্তি হলাম তৃতীয় শ্রেণীতে। হাতেখড়ি হয়েছে বাসায়। স্কুুলে প্রথম প্রথম আমার খুব নিঃসঙ্গ সময় অতিবাহিত হতো। ভালো লাগত না কিছুই। বন্ধু ছিল না একটাও। কাস শেষে শীতে কাঁপা পাখির মতো জড়োসড়ো এবং সঙ্গীহারা বিহঙ্গের মতো উদাস দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে দূরের মেঘনা দেখতাম। তা ছাড়া আমার ভিন্ন কিছু করার উপকরণ ছিল না। এক মাস পর মডেল টেস্ট দেয়ার পর আমরা পাঁচজন বন্ধু হলাম। সম্পর্কের নাটাই বাঁধলাম। আমরা কী মজা করেই না সবার নাম শহীদ মিনারের পেছন দেয়ালে লিখলাম। একটা যুৎসই লাভের বৃত্ত এঁকে দিয়েছিল সুমন। আহা! কী মধুর প্রাণবন্ত ছিল সেই প্রহরগুলো!
চোখের পলকে গত হলো প্রথম বছর। গেল বছরই আমাদের জম্পেস ভাব জমেছিল। এক সঙ্গে স্কুুলে যাওয়া থেকে শুরু করে এক বেঞ্চে আঁটোসাঁটো করে আসন পাতা, ভাগ করে টিফিন খাওয়া, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, ক্রিকেট খেলায় জোট বাঁধা, মেঘনার খাল-বিলে ঝাঁপ দেয়া।
পরের বছর ঠিক দুপুরে ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিতে গিয়ে যেদিন সালামের হাত ভেঙে গিয়েছিল, সেদিনের কথা আজো স্পষ্ট মনে আছে। চোখের পানি নরম গাল বেয়ে বুক পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছে আমাদের। আমাদের যেন রাজ্যের চিন্তা পেয়ে বসেছিল ক’দিন। তারপর তো সালাম সুস্থ হওয়া নাগাদ আমরা কোনো খেলায় মন দেইনি।
প্রাইমারি শেষান্তে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলাম। দিন কারো যাচ্ছে না। সবাই উদ্বিগ্ন উদাস বিহ্বল। পড়তে চলতে খেতে অকেজো। নিঃসঙ্গতার কাঁটাতারে শরীর ক্ষতবিক্ষত হলে, বন্ধুহীনা অসহায়ত্ব অক্টোপাসের মতো গ্রাস করলে, ভয়াল উত্তাল তরঙ্গে বৈঠাহীন অক্ষম নাবিক হয়ে যখন আমরা কেউ আর সামনে চলতে পারছি না, তখন আমরা আবার আগের সেই আমরা হলাম। আপন আকাশে ঘুড়ি উড়ালাম। এক আত্মার মঞ্চ কায়েম করলাম। জড়ো হলাম এক স্কুলে। হাতে হাত রেখে ওয়াদাবদ্ধ হলাম, জীবনে প্রাণ যায় যাক, কভু এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে।
হায়! প্রেম। ভালোবাসা। বন্ধুত্ব। জীবনের কঠিন অপ্রিয় বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে আজ আমরা কে কোথায়? সবাই কত দূরে দূরে। সালাম আতাউর সৌদিতে, রবি কুয়েতে, সুমনটা কাতার ছেড়ে চলে এসে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য দিব্যি চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর আমি বাঙালি বাংলায় রয়ে গেলাম। সঙ্গে আলী বাবা। আলী বাবা এখন রাজনীতির বড় নেতা। ভালো পদ তার। আমাদের সাহস দেয়। কিন্তু ব্যস্ততা যেন কারো পিঠ আর ছাড়ছে না।
কত দিন হলো কারো সাক্ষাৎ নেই। মনে হয় কয়েক যুগ ধরে কেউ কাউকে দেখছি না। সেদিন একাকী অসহায় ভগ্নহৃদয়ে অকালবোধনে সেই ছেলেবেলার প্রাইমারি স্কুুলের শহীদ মিনারে দেখি সুমনের আঁকা লাভ বৃত্তের ওপর পলেস্তারা পড়েছে কয়েক দফা।
সেই ছেলেবেলার কথা মনে হলে যাতনার যাঁতাকল সর্বাঙ্গে চেপে ধরে বেলা-অবেলায়। বিরহ-বেদনা কুয়াশার মতো ধেয়ে আসে চারিধার থেকে। হাতির পদে দলিত গাছের শুকনো পাতার মতো ভেতরাত্মাটাও পিষে যায় কখনো। তখন আমাকে আমি হারিয়ে ফেলি।


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme