১৯ নভেম্বর ২০১৮

ত্যাগেই আনন্দ

-


তখন আমার বয়স ৯ কিংবা ১০ হবে। প্রতিবারের মতো আমাদের কোরবানির গরু কেনা হয়ে গেছে। এখন শুধু অপেক্ষা... আর মাত্র দুই দিন পরেই কোরবানির ঈদ। ঈদের আগের দিন গরু আনা হবে। ভাবতেই খুশিতে মনটা ভরে যায়। সময় কাটতে চায় না। শত অপেক্ষা-প্রতীক্ষার পর ঈদের আগের দিন দাদুন আর ছোট কাকা গেলেন গরু আনতে। তেজি ষাঁড় গরু হওয়ায় তারা দু’জনই ব্যর্থ হলেন। ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে ষাঁড়ওয়ালা নিজেই এলেন ষাঁড় দিতে। খুবই শান্তভাবেই বাড়ি এলেন। ওনাকে বলা হলো উঠানের বড় জাম্বুরা গাছটায় ষাঁড়কে বেঁধে দিতে। তিনি ষাঁড়কে বেঁধে দিতে দিতেই কয়েকবার চোখ মুছলেন। বাঁধা যত শেষপর্যায়ে চোখের পানির গতি ততই বাড়তে লাগল। তিনি সামলাতে পারলেন না নিজেকে। গরুর গলায় ধরে বসে পড়লেন এবং শেষবারের মতো ছেলেকে বিদায় দেয়ার মতো খানিকটা কান্না করলেন। ষাঁড়টাও নিস্তব্ধ। শুধু নিঃশ্বাস নিচ্ছে ভারী ভারী। আমি বোবার মতোই তাকিয়ে আছি। তিনি নিজেকে সামলে দ্রুত পায়ে বাড়ির পথ ধরলেন। তখনো ষাঁড়টা নির্বাকদৃষ্টিতে তাকানো।
তারপর বেশ কিছু কোরবানির ঈদ চলে গেল। এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি।
কিন্তু বাস্তবতা সত্যিই কঠিন...
কয়েক বছর পরেই ত্যাগের পরীক্ষা নিজের কাঁধে পড়ল। তার ওপর আবার যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি তাকে দিয়েই। আমাদের মা গরু সর্বপ্রথম যে ষাঁড় গরুটা জন্ম দিলো তাকে আদর করে, ভালোবেসে ‘কুটুম’ বলে ডাকতাম। কেননা সে অনেক বছর পর অতিথির মতো এসেছিল।
জন্মের পর থেকে আমি কুটুমের সাথে একা একা কথা বলতাম। ও মুগ্ধের মতোই শুনত আর মাথা নাড়াত। আমার কথা বুঝতে পারত কি না এটি নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে সেটা আমি জানি না। তবে আমি মনে করতাম, কুটুম সব বুঝতে পারত। আমি কুটুমের সাথে চমৎকার সময় কাটাতাম। কুটুম আমার কোলে মাথা রাখত যখন আমি খড়ে বসে ওর সাথে গল্প করতাম। আমি ওর কপালে হাত বুলালেও চুপচাপ শুয়ে থাকত সামান্য নড়তও না। এভাবে বন্ধুত্ব বাড়ার সাথে সাথে বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে কুটুমের দেহও বাড়তে লাগল। হঠাৎ এক দিন বড় ভাইয়া দেখল কুটুমের দাঁত উঠেছে। তার মানে কুটুম এখন সব কিছুরই যোগ্য। সামনে কোরবানির ঈদ...
কুটুমকে নিয়ে সবাই কিছু ভাবছে। ভাবনাগুলোর ইতি টানল কুটুমকে কোরবানি করবে এই সিদ্ধান্তেই। অনেকেই কুটুমকে দেখতে আসে। কুটুমের দাম লাখ পার হবে বলে সবাই বলাবলি করছিল। বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমার। যে কুটুম আমার কোলে মাথা রাখত সেই কুটুমের আজ হাতির মতো দেহ।
ঈদের বেশিদিন নেই! ঈদ আগামীকাল...
কুটুমের সামনে গেলেই চোখে পানি চলে আসে। কোরবানি মানেই তো ত্যাগ। এই সান্ত্বনায় ছেড়ে দিলাম মনকে। তবুও ঈদের সকালটা কাটতেই চাইছে না। সবাই ঈদের নামাজ পড়তে চলে গেছে। আসলেই কুটুমকে...
নামাজ শেষ করে এসে সবাই কুটুমকে মাঠে নিয়ে গেল। বুক ফাটা কান্নাটাকে কাঁথার চাপেও আটকে রাখতে পারলাম না।
সময় গড়িয়ে যায় বাতাসের গতিতে।
এবারো কুটুমের মতোই আরেক অতিথি একই রাস্তায় আছেন। দেহটা কুটুমের চেয়ে সামান্য কম হলেও মায়াগুলো বিন্দুমাত্রও কম নয়। ভাবতেই ভালো লাগে ওরা আল্লাহর রাস্তায়... চোখের সামনে তাকে রেখেই লেখাগুলো লিখছি। সত্যিই আনন্দ ত্যাগেই!
ধানীখোলা পলাশতলী, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 


আরো সংবাদ